সাধারণত এ সময় মোসলেম উদ্দিনের মুখোনা শুকিয়ে যায়। এখন তা ততটা হল না। তবু কিছুটা শুকনো মুখে সে আলেকজানের দিকে চেয়ে হাসল। একই সঙ্গে বিষয়টা অন্যদিকেও নিয়ে যেতে চাইল, আজগর আছে না? বান্দর খেলা দেখায়, আজগরের ভোমা জ্বর। ছেমড়াডার যে কী হল, মজমা না মিলতি পারলি ওরে এট্টু দেইহে আসপো।
ওর তো শুনি কয়দিন বাদে বাদে শরীর খারাপ হয়।
হয়। কোহানে থাহে, কোহানে খায়, কোথায় ঘুমোয়, কোহানে কী করে, তার কোনও ঠিক আছে। বান্দর নাচাতি নাচাতি নিজেও এট্টা বান্দর হইয়ে গেইচে।
মোসলেম ঘরের সামনে থেকে একটু এগিয়েছে। ফিরে সে আলেকজানকে একথা বলে, তারপর হাঁটতে শুরু করে। ছাতা নিয়ে বেরুতে পারলে হত। বোঁচকটা তার বাম বোগলে। সামনের রাস্তায় রিকশা পেলে হয়। ছাতার কথা ভাবল মোসলেম, কিন্তু জানে না ছাতাটা ব্যবহার উপযোগী আছে কি না। এবার একদিনও মাথায় দেয়নি। তাছাড়া একহাতে লাঠি আর অন্য হাতে ছাতা নিয়ে মোসলেমের হাঁটতে কষ্ট হয়। তাই প্রায়ই সময় তার ছাতার কথা মনে থাকে না।
মোসলেম কোর্ট পর্যন্ত আসতে আসতে বাতাস বাড়ে। মেইন রোড ধরে দক্ষিণে তাকালে রাস্তার দু-পাশে নারকেল ও মেঘনিশ গাছের পাতায় বাতাসের দাপট। একটা রিকশা পেয়ে মোসলেম রিকশাঅলাকে বলে লঞ্চঘাটে আসতে। রিকশা কোর্টের পাশ থেকে আসার সময় সে দেখে, চারপাশ অপেক্ষাকৃত ফাঁকা! বৃষ্টি না-ধরলে ফাঁকাই থাকবে।
লঞ্চঘাটের কাছে নেমে মোসলেম ভাবে, আলতাফকে জিজ্ঞাসা করবে আজগর এখন কোথায় থাকে। কিন্তু আলতাফকে হোটেলের সামনে দেখে না। হয়তো বাজারে গেছে। এসময় কোত্থেকে সুকুমার এসে উদয় হয়। সুকুমার মোসলেমকে দেখেই বুঝেছে, সে আজগরকে দেখতে এসেছে।
একটু এগিয়ে, তারপর নদীর পাড় ধরে আজগরের ঝুপড়ি পর্যন্ত আসতে কতটুকুই-বা সময়। এর ভিতরে সুকুমারের কাছে মোসলেম জানতে চেয়েছে আজগরের অবস্থা কী? কোনও ওষুধ-পথ্য কি পেটে পড়েছে ছোঁকরার? সুকুমার যদিও সবকিছু জানে না। কাল সারাটা বিকেল ও সন্ধ্যা তার কেটেছে ঝিলিকের চিন্তায়। তবে আজগরকে কোনও ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়নি, তা সে জানে। মনে হয় রাত এক প্রহরের পর সামনের কোনও এক ফার্মেসিঅলার কাছে থেকে কী-একটা বড়ি এনে খাইয়েছিল, তাতে নাকি ভোর রাত্রের দিকে জ্বর খানিকটা ছেড়েছে, কিন্তু হুঁশ সেভাবে আসেনি। জরিনা বলেছে, সারাটা রাত্তির নাকি বিড়বিড় করে কী সমস্ত বলেছে।
সুকুমারের কাছে এসব শুনে আজগরের ঝুপড়ি পর্যন্ত আসতে আসতে মোসলেমের মেজাজ খিচে যায়। জরিনা ছেমড়ির দেখি কোনও বোধ-ভাষ্য নেই। খালি আছে কথায় যোগ্যতা। এমনিতেই আজগরের শরীরের ওই দশা। মাসের ভিতরে কয়দিনই তো কাশতে কাশতে প্রায় কাৎ হয়ে থাকে। তারপর এই প্রায় দিন তিনেকের জ্বর। আজ বেলা তো এতক্ষণে কম হয়নি, আজগররে নিয়ে তো হাসপাতালের দিকে যেতে পারত। সদর হাসপাতাল না-হয় দূরে, সেই মুনিগঞ্জ, পুরানো হাসপাতালে গেলেও তো সরকারি ডাক্তার দুটো ওষুধ লিখে দিত। মোসলেম সুকুমারেরও মুখের দিকে চায়। সুকুমার তো একটা বুঝমান মানুষ, সে এতক্ষণে তাহলে করেছে কী?
আজগরকে দেখে মোসলেম বোঝে, সুকুমারের মুখে শুনে অবস্থা যা ভেবেছিল, আজগরের অবস্থা তার চেয়ে খারাপ। গায়ে শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। চোখ বসে প্রায় গর্ত হয়ে গেছে। গালের হা-এর পাশে কেমন যেন ফেনার দাগ। এখনি হাসপাতালে অথবা ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এই দিকে কোনও ডাক্তার বসে না। যারা বসে সবই হোমিওপ্যাথি। এই সকালে এমবিবিএস ডাক্তাররা সবাই হাসপাতালে। একজন আছে রেল রোডে। সেই ডাক্তার এখনও চেম্বারে এসেছে কি না ঠিক নেই। তার চেয়ে পুরানো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ভালো। যদিও মোসলেম ইচ্ছে করেই জানতে চায়নি জরিনা কোনও ডাক্তারের কাছে যায়নি কেন? জরিনার মুখোনা দেখেই বুঝেছে, এদের কাছে পয়সাপাতি কিছু নেই। তবু, নীচু গলায় মোসলেম যখন বলেছে, জরিনা ছেমড়ি, আরও আগে আজগররে হাসপাতালে নেয়া লাগত, তয় আর এইরাম কাহিল হত না। তখন ঝিলিক একবার বলেছে, সেও তাই বলেছিল, কিন্তু জরিনার পাংশুটে মুখোনা দেখে মোসলেম যা বোঝার বুঝে যায়।
মোসলেমের তৎপরতায় সুকুমার একখানা ভ্যান ডেকে আনে। ভ্যানখানা আজগরের ঝুপড়ির সামনে পর্যন্ত আসতে আসতে দক্ষিণ থেকে তাদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার বাতাস আসে। তাতে ভ্যানঅলার ভ্যানখানা আজগরের ঝুপড়ি পর্যন্ত আনতে কোনও সমস্যা হয় না। শুধু ঝুপড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মোসলেম দেখে, এমন বাতাসে এই প্রায় দোমড়ানো ভেঙে পড়া ঘরখানার দক্ষিণের বেড়ার দিক থেকে কুলকুলিয়ে বাতাস ঢুকছে, সেই বাতাসে ওই দিকের পাতলা বেড়ার অনেকখানিক ফাঁকা হয়ে গেল।
সুকুমার পাঁজাকোলা করে আজগরকে নিয়ে ভ্যানে তুলল। মোসলেম উঠল ভ্যানের পিছনের দিকে, সুকুমার সামনে বসে আজগরকে শুইয়ে মাথাটা রাখল তার কোলে। মোসলেম বলল, জরি, ঘরদুয়ার এট্টু ঠিকঠাক কর, যা বাতাস আসতিছে! ভ্যান ছাড়তে ছাড়তে মোসলেম আর একবার আজগরের ঘরের দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই আজগর বান্দরঅলার ঘরদুয়ার। এই কইরে আজগর এট্টা জীবন কাটাইয়ে দেল।
জরিনা মোসলেমের কাছে জানতে চেয়েছিল, সে যাবে না? মোসলেম বলেছে, তারা যাবে আর আসবে। কিন্তু সঙ্গে মোসলেম যে তাকে এই ঘরদোর গোছাতে বলেছে, এতে যেন তার আপত্তি। জরিনা কখনও আজগরের ঘরকে নিজের ঘর ভাবেনি। কেন ভাবেনি তার কোনও ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। মোসলেম বলে যাওয়ার পরও তার ইচ্ছে করল না। যদিও ঝিলিক তাকে বলেছে, ও জরিনাদি, চলো, এপাশ ওপাশ এট্টু ঠিক করি। আইজকে বাতাস ঢালবে। পুরোন হাসপাতার যদি ধারে হয়, তালি ডাক্তার দেখাইয়ে আনতি আর কোতোক্ষণ?
