ঝিলিক বলে, আমি, আর কেডা।
সুকুমার এই প্রায় সন্ধ্যার আধা অন্ধকারে ঝিলিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুই জানতে চায় না। পথক্লান্তি তার চোখজুড়ে। একদিনেই প্রায় বিধ্বস্ত। কোথায় যেন যে মানুষটা গেছে, সেই মানুষটা ফিরে আসেনি। চুল আলুথালু না, খোঁপা বাঁধা, মুখে ঘাম নেই; কিন্তু চোখে রাজ্যের উদ্বেগ। চোখ বসে গেছে যেন একটু, সেখানে দুনিয়াদারির সমস্ত দুঃখ ভর করে আছে! ওদিকে ঝিলিকও জরিনার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝে, কিছু একটা ঘটে গেছে। নয়তো এই সন্ধ্যায় এভাবে, এখানে। এমন অসহায়ভাবে জরিনাদি বসে আছে কেন?
জরিনা জানতে চাইল, চলে আসলা যে? সে মেলা কথা।
সুকুমার আর কিছু জানতে চাইল না। বুঝল এই মেলা কথার পিছনে কত কথা আছে। বরং, অন্য কথা বলল, সারাদিন পেটে কিছু পড়িছে তোমার?
হয়। গুড়মুড়ি আর গাঙের জল, এইসব তো দক্ষিণ দেশেও পাওয়া যায়!
সুকুমার মরে উদ্বেগে, আর তার ভিতরেও এমন ঠ্যাস মারা কথা। এর দিকে অবাক হয়ে তাকানো ছাড়া আর কী করার আছে? কোনও ভাবনা আছে? হাতে পয়সাপাতি নেই। আসল এই, এখন তো থাকতে হবে আলতাফের হোটেলের দোতলায়। সেখানে কোনার দিকে তক্তাঘেরা রুমে, আর নয় সে চলে যেত দড়াটানা ঘাটের দিকে। অথবা, আলতাফের হোটেলের দোতলায় ঢালাই চাচের উপর শুয়ে শুয়ে গরমের রাত্তির কাবার।
ঝিলিকের যেন সেসব কোনও চিন্তা নেই। তার দিকে সুকুমার তাকিয়ে থাকতে থাকতে, ঝিলিক জরিনার কাছে জানতে চাইল, আজগর ভাইরে দেকতিচি না। শরীর ভালো হইছে?
নারে। জ্বর আরও বাড়িচে। কতবার জলপট্টি পালটাইয়ে দিচি। ওই মোসলেম কাকা এক ফার্মেসির দে ওষুধ কিনে দিয়ে গেইচে, তাও কুমিনি।
ও ভগবান, এইরাম জ্বর! ডাক্তারের ধারে নেওনি? ডাক্তারের বিষয়টা ঝিলিক সুকুমারের দিকে জানতে চাইল?
হাতে মন্টু থাহা লাগে মন্টু! সুকুমার ডান হাতের আঙুলে টাকা গোনার ভঙ্গি করল, আমাগো কেউর ধারে পয়সা কড়ি নেই। আইজকেও ট্রেন আন্দোলনে কোর্টে মানুষ আইচে, পাবলিক আসিনি—
০৭. দিন চারেক আগের আশঙ্কা
মোসলেম উদ্দিনের দিন চারেক আগের আশঙ্কা আজ সকালে ফলে।
খুব সকালে দক্ষিণ থেকে ধীরে ধীরে বাতাস আসে। তখনও বোঝা যায়নি এই বাতাস মাত্র ঘণ্টা তিনেকের ভিতরে এমন রূপ ধারণ করবে। ধীরে আসা সেই বাতাসে নারকেল গাছের পাতা কাপে। নারকেলই সবচেয়ে উঁচু গাছ। তাছাড়া মেঘনিশ বা শিরীষ গাছের একেবারে উপরের দিকে জোরে হাওয়া লাগছে, যদিও গাছ কতটা কাঁপছে তা এমনিতে ঠিকঠাক বোঝা যায় না, শুধু নারকেল গাছ দেখেই ভালো বোঝা যায়। পাতায় পাতায় দোল, ঝুলে-পড়া পাতার ঘষা লাগে গাছের শরীরে সেই ঘর্ষণে শিরশির শব্দ হয়! বাতাস ধীরে ধীরে বাড়ে, ওই শব্দও বাড়ে। উপরের দিকে পাতা পরস্পরের গায়ে বাড়ি খায়।
সকালে তার মুনিগঞ্জের টিনের চালের বাসায় খুবই পাতলা যেন এক দুই ফোঁটা বৃষ্টির শব্দ টের পেয়েছে মোসলেম। তখনও ভাবেনি, রোদ একেবারেই উঠবে না। তা রোদ না উঠুক, এই বৃষ্টি যে বাড়বে তার এমন কোনও আলামত পাওয়া যায়নি। কিন্তু মনে মনে তার সেই আশঙ্কা তবু ছিল। হয়তো হাওয়া বাড়তেও পারে। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের ভিতরে বাতাস বাড়ল, যদিও তখন আর বৃষ্টি নেই। মোসলেম উদ্দিন আলেকজানকে বলেছিল, আইজ মনে হয় আর কোনও উপায় নেই। এই জ্যৈষ্ঠের শেষ দিক এইভাবে দাবাড় আসতিচে!
আলেকজান বলেছে, দাবাড় কোতায় দেকতিচো, বৃষ্টি আসপো, বৃষ্টি আসার সময় হইয়ে গেইচে। দাবাড় যা আইল সেয়া বৈশাখ মাসে, এ মাসেও হইছে, কিন্তুক তাকাইয়ে বোঝে না, এই যে আসতিচে এহেবারে বৃষ্টি আইনে ছাড়বে।
মোসলেম জানে না, কী ভেবে কথাটা বলেছিল, কেন বলেছিল। ঝড়-বাদল বৃষ্টি দাবাড়ের হিসেব তার তো ভালোই জানা আছে। তবু তার কেন যেন মনে হয়েছিল, বৃষ্টি হয়তো এখনও আসার সময় হয়নি, আসবে দাবাড়! সে আলেকজানকে বলল, যাই কোর্টের দিকে। আইজকে বেলা বোঝা যাবে না। কিন্তু বেলা হইয়ে যাতিচে।
এই বলে মোসলেম উদ্দিন হাতঘড়ি পরতে পরতে তাতে দম দেয়। ঘড়িটার ডায়াল ছোটো ও পুরনো। ডায়ালের রঙ বেশ কালো হয়ে গেছে। এখনও ভালো সময় দেয়। কীভাবে একদিন তার হাতে এসেছিল এই ঘড়ি, তা এখনও সে মনে করতে পারে। ঘড়িটার দিকে চাইলে কখনও কখনও তার তা মনেও আসে। কিন্তু এখন আকাশের মুখ ভার, মোসলেম সেকথা মনে আসতে আসতে আর মনে এল না। অথবা, হতে পারে সেই কথার খানিকটা তার মনে এসেছিল, পর মুহূর্তেই ঘড়িটা হাতে পরতে পরতে সে সেখান থেকে সরে এল। তার মনে হয়েছিল, আলেকজানকে এখনও একটা কথা বলতে বাকি। সেকথাটা বলবে। তাই ঘরের দরজায় পা দিয়ে মোসলেম জানতে চাইল, পাউডারের মালপত্তর তো আছে? আপাতত আর মনে হয় আনা লাগবে না।
আলেকজান মোসলেম উদ্দিনের হাতে পান দিতে দরজায় দাঁড়িয়েছিল, কিছু বলল না। গাঢ় চোখে দেখল তাকে। দুই দিকে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, লাগবে না। তাছাড়া বহুদিনের অভিজ্ঞতায় আলেকজান জানে, এই আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে মানুষের জামা-কাপড় ময়লা হয় বেশি কিন্তু পাউডার চলে কম। মনে হয় এই সময় মোসলেম উদ্দিন তার আসরও তেমনি মিলাতে পারে না। বর্ষাকালে মানুষজনও ফাও কাজে কোর্টের ধারে কাছে তেমন আসে না।
