কিন্তু জরিনা যাই বলুক, মিথ্যা কিছু বলেনি। মেয়েমানুষের জীবন যেন তাই। অমন একটা ছাপড়ায় রেখে, স-মিলে কাজ করা ভক্তদার সঙ্গে ঝিলিক তো খারাপ ছিল না। কয় বাসায় কাজ করত। একটা ছেলে হল, নাম ভরত। ছেলেটার নাম যে ভরত, তাও আজও মনে আছে জরিনার। কবে কোন একদিন নাকি ঝিলিকের সঙ্গে তার মূলঘর স্টেশনে দেখা হয়েছিল, তারা যাবে যাত্রাপুর লাউফলা রথের মেলায়। সেই সংসার সেই সব কিছু ভক্তদা ওইভাবে ভেঙে দিতে পারল।
সুকুমার ঘটনাটা আগেই জেনেছিল, যতই পথে পথে ঘুরুক, বাড়িঘরের খবর কিছু কিছু তো পায়। এমনিতে মামার গুষ্টির মানুষজন কেমন তা তাদের তিন ভাই আর বোন দুটোর ভালোই জানা ছিল। সুকুমার সবার ছোটো বলে দাদাদের বউদিদের আর দিদিদের কতাবার্তায় কখনও কখনও জানতে পারত। তাই বলে ভক্তদা এই কাজ করবে। হায়রে খুলনা শহর। সুকুমারের মনে হয়, ও জায়গায় না গেলে কোনওভাবেই ওই কাণ্ড ঘটত না। আবার কত মানুষই তো যায়, তারা সবাই অমন কাণ্ড ঘটায় নাকি? সুকুমার ভাবে, জরিনা কি এসব কথা জানে, তাকে বলেছে মেজো বউ?
সুকুমার তখন যশোর, বাড়ির কাছের একজনের কাছে শুনেছিল, তার ছোটদা বলেছে, ভক্তদা এক মহিলাকে নিয়ে নিরুদ্দেশ। সঙ্গে ছেলেটাকেও নিয়ে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। ঝিলিক তাদের বাড়ি গিয়ে বলে চলে গেছে। সে এখন কোথায় থাকে ওই বাড়ির লোকজন জানে না। তবে সবার ধারণা ঝিলিক বাপ-ভাইর কাছে মোড়েলগঞ্জ চলে গেছে। সুকুমার যদি কোনওভাবে জানতে পারে তাহলে যেন বাড়িতে জানায়।
সত্যি, আজও জানা যায়নি ভক্ত কোথায়? তবে সবার ধারণা সেই মহিলাকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। গোপালগঞ্জের একজন বলেছিল, তাদের কিছু আত্মীয়স্বজন আছে ঠাকুরপুকুর, সেখানে। দেখেছে ভক্তকে। যে মহিলাকে নিয়ে গিয়েছিল সে নাকি উড়ে। তাই ভক্ত হয়তো উড়িষ্যাও চলে যেতে পারে। সবই শোনা কথা। সুকুমার এইসব ঘটনার কোনও নিশানা পায়নি। তাছাড়া সে বাড়িঘরে যেতই-বা কত, যদি কোনও খবর আসত তাহলে কিছু হয়তো জানতে পারত।
তারপরে সুকুমারের সঙ্গে এই নিয়ে আর কারও কোনওদিন কথা হয়নি। গুছাইত বাড়ির মেজদা ভক্ত, আর তার বউ ঝিলিকের কথা সে যে ভুলে যাবে তাই স্বাভাবিক। কিন্তু জীবনে একদিন তাদের আশ্রয়ে ছিল, সেখান থেকে এক সার্কাসের দলে। সেই যে খুলনা শহরে রূপসা নদীর কূলের কিছুদিন, সেই সময়ে সেই যে ঝিলিকের সঙ্গে তার দিনমান, ঝিলিকই বলতে গেলে তাকে শিখিয়েছে শরীর কাকে বলে–এসব ঘুরে ফিরে কখনও কখনও মনে পড়ত সুকুমারের। আর ঝিলিকের আন্তরিকতা। মানুষটার মন বড়ো ভালো। সেই যে সুকুমার প্রায় বসে বসে ভাত গিলত, এই নিয়ে কোনওদিন কোনও কথা কয়নি। হয়তো ভক্ত, ভিতরে ভিতরে কিছু বলে থাকতে পারে, ঝিলিক কিছু বলেনি। শুধু খুলনা ছেড়ে ফরিদপুরের দিকে দলের সঙ্গে যাওয়ার আগে ঝিলিককে
একখানা শাড়ি আর ভক্তকে একখানা লুঙ্গি কিনে দিয়েছিল। তারপর আর দেখা নেই।
সেই ঝিলিক পরশু এসে হাজির। কোত্থেকে কীভাবে, কার কাছে শুনে, কত দরজায় ঘুরে কে জানে। যেন সেকথা এইমাত্র আবার জরিনা মনে করিয়ে দিল, দেহ, সেই মানুষ তোমারে খুঁজদি খুঁজদি কোথাদে আইসে হাজির, সুকুমার ভাই!
সুকুমার শুধু করল। যেন একথা জরিনাকেও জানানো যায়, এহেন তো গেল নিজের বাড়ির দিক, ভাইগো পালি হয়।
পাইয়ে যাবে। সব উপরঅলার ইচ্ছা। তোমারে যহোন পাইচে, সে জায়গায়ও পাইয়ে যাবে মনে কয়।
পালিই তো হবে না জরিনাদি, ভাইরা ঘরে উঠতি দিলি হয়। এট্টা মানুষ বসাইয়ে বসাইয়ে টানা। আর যে মাইয়ে একদিন বাড়িদে বাইরোইয়ে গেইচে।
হয়। তাও খারাপ কও নি।
সুকুমার কেন এই আশঙ্কা করে, সে জানে না। তার মনে হয়েছে তাই বলেছে। কিন্তু এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
একটু দক্ষিণে, প্রায় নাগের বাজারের কাছে নদীতে মোড়েলগঞ্জের লঞ্চখানা দেখা যায়। সুকুমার উলটো মুখো, সে দেখেনি, জরিনা দেখেছে। অন্য লঞ্চগুলোর তুলনায় মোড়েলগঞ্জগামী লঞ্চখানা আয়তনে কিছুটা বড়ো। অথবা, এটাই লঞ্চ, বাকিগুলো ট্রলার। আর ঢাকায় যেখানা যায়, তা প্রায় জাহাজ। জরিনা কিছুটা উচ্ছাসের সঙ্গে বলে, ওই যে দক্ষিণে লঞ্চখান আসতিচে। সুকুমার ভাই একেবারে চিন্তেয় বাঁচে না, লঞ্চখান গেল তো গেল আর ফেরল না, ঠিকঠিক জায়গা মতন গেইচে কি না?
সুকুমার হাসে, কোতায় চিন্তা? দক্ষিণে এট্টা কিছু হলি এতক্ষণ টাউনে খবর হইয়ে যাত। আর মাইজে বউর কিছু হবে না। তার জীবনের উপরদে এত কিছু গেইচে, তাও যখন কিছু হইনি, এইতে আর কী হবে। আমি চিন্তে করিচি, সের বাড়িঘরে উটতি পারিচে কি না। সে সমস্ত ঠিক। আছে কি না–সেইয়ে।
অথচ, তাদের অথবা শুধু সুকুমারের সকল উদ্বেগ কাটিয়ে সেই লঞ্চ থেকেই নামল কি না ঝিলিক!
লঞ্চঘাটের পন্টুন থেকে রাস্তায় উঠেই, একটু দক্ষিণে এগোলে আজগরের ঝুপড়ি। ঝিলিক আর যাবে কোথায়? সে সেখানেই আসবে। সেখানেই জরিনাকে পাওয়া যাবে। জরিনাকে পাওয়া গেলে অবশ্যই আজগরের কাছে খোঁজ মিলবে সুকুমারের।
এখন জরিনার কাছেই বসে আছে সুকুমার। আজগর নেই। জরিনার মুখোনা উদ্বেগ-মাখানো। আর, ঝিলিককে দেখে জরিনা আর সুকুমার দুজনই অবাক।
জরিনা বিস্ময়ে জানতে চায়, এ কেডা?
