হয়তো সুকুমার তাতে আরও একটু উসকায়, পিঠের কোন জায়গায়? এই বলে রোদে তার উদোম পিঠটা মেলে ধরে। নিজেই পিঠে হাত দিয়ে ঝিলিককে দেখায়, কও ও মাইজে বউ, কোন জায়গায়?
ঝিলিক সুকুমারের পিঠে আঙুল দিয়ে টিপেটিপে দেখায় এই জায়গায় এই জায়গায় এই জায়গায়। কিছুদিন আগেও দেড় ঘণ্টা ফুটবল মাঠে দৌড়ানো সুকুমারের পিঠের মাংস পেশিগুলো তাতে অদ্ভুত আসকারা পায়। সে ঘুরে ঝিলিককে দেখে। কিন্তু এর ভিতরেও সুকুমারের মনে থাকে এভাবে বসে খেলে, এই হাতও পিঠে কর্কশ হয়ে উঠবে। সুকুমার বলে, বইসে থাকতি থাকতি গায়ে একেবারে জড়ো হইয়ে গেলাম। কই এই কয়দিনেও একজনও ছাত্র পাইলাম না। জানো না তো, আমার ধারে পড়বে কেডা?
হবে। আসপে। এই জায়গায় মানুষজনরে তুমি কইচো, তোমার দাদা কইচে, আমি কইচি। আর নয় নাইট ইস্কুলে যাইয়ে পড়াবা। দেহা যাক।
যদিও ঝিলিকের এই কথার তুলনায় সুকুমার চালু। চোখ কান তুলনায় ভালোই খোলা। খুলনা শহরে বি-ডিবিশনে আগেও ফুটবল খেলে গেছে। রূপসা ঘাটের কাছে এই জায়গায় বসে বসে হাওয়া খাওয়ার মানুষ সে না। শহর পশ্চিম দিকে আরও কত কত দূর। সেখানে কোর্ট-কাছারি বড়ো বাজার স্টেডিয়াম, ভৈরব নদীর কূল, বড়ো মাঠ, কত কিছু। গায়ে জামা দিয়ে সেই দিকে ঘুরতে যায় নদীর কূলের বাঁধের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে। কাস্টমসঘাট হয়ে চলে যায় বড়ো মাঠ। পাশেই খুলনা স্টেডিয়াম। এই মাঠেও একসময় খেলেছে সে। এখন অকেজো। মাঠের দিকে তাকিয়ে সুকুমারের শ্বাস গভীর থেকে গম্ভীর হয়।
একদিন রেল স্টেশনের কাছে সার্কাসের প্যান্ডেল দেখে সুকুমারের মনে হয়, যদি সার্কাসের দলে কিছুক্ষণের জন্যে ফুটবলের ওই খেলাটা দেখাতে পারত সে। দৌড়তে হবে না। কেউ তার দিকে বলটা ছুঁড়ে দেবে অথবা গড়িয়ে দেবে তার পায়ের দিকে। তারপর সেই বল সে এক পা থেকে অন্য পা, তারপর হাঁটুতে, উরুতে উরুতে ঘাড়ে কি মাথায় নিয়ে খেলা দেখাত। এই একটা খেলাই পারে সে। এইটুকু দেখাত। যদি সুযোগ হয়।
ঘরে ফিরে এই কথা সে ঝিলিককে বলে। ঝিলিক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বলে, নেবে তোমারে?”
কী জানি। ওই এক খেলা দেখানোর জন্যি কেউরে দলে নে?
আর কোথাও খেলা জানো না?” বলেই ঝিলিক হাসে। অদ্ভুত রহস্যপূর্ণ হাসি! সুকুমার তাকিয়ে থাকে। আজকাল হঠাৎ হঠাৎ এই হাসিটা ঝিলিক তার দিকে চেয়ে হাসে।
আমি তোমার মতো খেলোয়াড় নাকি? ছাপড়ার ভিতরে ঢুকে সুকুমার গামছা খুঁজতে খুঁজতে বলে।
আমি আবার কবে খেলোয়াড় হইলাম, শুনচি তুমি খেলা দেখাও বল দিয়ে।
সুকুমার হাসে। ঝিলিক হাসতে হাসতে ছাপড়ায় ঢুকে একই হাসি মুখে সুকুমারের দিকে তাকায়। সুকুমার বলে, তুমি খেলা দেখাও ভক্তদারে। আমি মানুষেরে দেখাই এক বল দিয়ে তুমি দেখাও দুই বল দিয়ে!
আইজ পিঠে সত্যি সত্যি গরানের চলা ভাঙব, দেওরা!
সুকুমারের পিঠ উদলা। সে স্নান করতে যাবে। নীচু দরজার দিকের আলোতে সে পিঠখানা এগিয়ে দিয়ে বলে, কোন জায়গায় কোন জায়গায় ভাঙবা দেখাও?
ঝিলিক এবার আর পিছনে আসে না। তবে সুকুমারের কাছে আসে। সুকুমার হঠাৎ ঝিলিকের দিকে পিঠ দেয় বলে, দেখাও? আরও বলে, তুমি হইলা দুই বলের খেলোয়াড়, যা বল তোমার!
ঝিলিক আর গরানের চেলা কাঠ পিঠে ভাঙার কথা বলে না। একটু থমকে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করে। সুকুমার তা বুঝতে পারে। তারপর ঘুরে ঝিলিককে পিছন থেকে আঁকড়ে ব্লাউজহীন স্তনে হাত দেয়। একসঙ্গে দুটো, দুই হাতে ধরে বলে, এই যে দুই বল, তুমি দুই বলের খেলোয়াড়।
ঝিলিক শুধু একবারই ফিসফিসায়, দরজা খোলা। দরজা খোলা, দেওরা।
সুকুমার আরও অস্ফুট বলে, কেউ আসপে না। এই সময় কেউ আসে না।
ঝিলিক সুকুমারের শরীরে লেপ্টে যায়। অথবা সুকুমার তাকে লেপ্টে ফেলে, এমনকি এই স্মৃতি আরও বহু বহুদিন মনে থাকে ঝিলিকের। অমন নিঃস্ব তাকে কোনওদিনও করেনি ভক্ত।
এর কিছুই এখন সুকুমারের মনে পড়েনি। পড়ার কোনও কারণ নেই। ঝিলিক যে সমস্ত দুর্বিপাক কাটিয়ে এসেছে, তাতে তার কোনওভাবে ও কথা মনে পড়ার কথাও না। তবে, কিছুক্ষণ আগে জরিনা যখন ঝিলিকের ফিরতি লঞ্চটা ফিরে এসেছে কি না, তখন ভিতরে চোরা টান সে টের পেয়েছে। অজ্ঞাত সেই টান। কোনওদিন সেভাবে ভাবেওনি। আজ ভাবল।
জরিনা আজগরের কাছে থেকে ফিরে আবার সুকুমারের কাছে বসে। আবার ওই একই কথা আবার বলে, সব কয়খান লঞ্চ চইলে আসল, খালি মোড়েলগঞ্জের খান এখনও আসল না।
আসপে।
দক্ষিণে কিছু হইচে নিকি? বাতাস আছে আইজকে।
হলি তো এহোন হইচে। সে তো গেল সকালে, সকালে তো আর কিছু হইনি।
সুকুমার ভাই, তোমার যা কতা। তোমার কতা কী? তোমাগো পুরুষ মানুষের আসলে অন্তরে কোনও দরদ নেই। এটা মানুষ কোন পথে ঘাটে কোথায় কোথায় টাক খাতি খাতি আবার তোমারে খুইজে, তোমার ধারে আইচে। নালি যাতে কোতায়, জানো না জাতো কোডায়? ওই মাগি বাড়ি। বিটি মানষির তো শেষমেশ যাওয়ার জায়গা ওই এট্টা
হঠাৎ এসব বলছে কেন জরিনা? সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে। এই সময়ে চোখের ভাষা ঠিক ঠাক পড়া যায় তো? সে জরিনাকে বুঝতে পারছে? থাকে ওই আজগর বান্দরঅলার সাথে, সেও দেখো কি বুঝমানের মতন কথা কয়! নাকি ঝিলিক এই এক দেড় দিনে তার জীবনের সব কথা বলে দিয়েছে? কী বলেছে, এই খেলাঅলা দেওরারে তার ভালো লাগে, তাই এসেছে তার কাছে?
