একদিন তার মামাতো ভাই ভক্ত বউ নিয়ে এসে হাজির। এখন বউ নিয়ে নিজেদের বাড়ি যেতে পারেনি। সে সাহস নেই। গিয়েছিল মোড়েলগঞ্জের হোগলাবুনিয়ার ধান কাটার কাজে, সেখান থেকে নিয়ে এসেছে এই বউ, নাম ঝিলিক। সুকুমারের বড়ো ভাইরা ভক্তকে তাড়িয়ে দিল না, কিছুই বলল না বলতে গেলে। শত হলেও মামাতো ভাই, কোন দূর দেশ থেকে পছন্দ করে কনে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। ওদিকে ভক্তর হাত একেবারে খালি। এখানে ভক্তর হাতে কোনও কাজ নেই। ফলে, সুকুমার বুঝতে পারল কেন তারা দাদারা ভক্তদার এখানে আসা নিয়ে কোনও উচ্ছাস প্রকাশ করছে না। সুকুমারের মামা বাড়ির গ্রামও এ জায়গা থেকে কাছে, কিন্তু ভক্ত এখনই সেখানে যাবে না। প্রায় দিনই সুকুমারের দাদাদের বলে, তারা কেউ একজন যেন গিয়ে ভক্তর বাড়িতে বলে। কিন্তু প্রত্যেকেই তার মামাকে চেনে, তাদের ধারণা মামা ভক্তর এই বিয়ে মেনে নেবে না।
ঝিলিক দেখতে শুনতে ভালো। লক্ষ্মীপনা আছে মুখোনায়। এমন বউকে তাদের মামা কেন মেনে নেবে না, সুকুমার তাও বুঝে পায় না। সে তার বড়ো বউদিকে জিজ্ঞাসা করে, তারা তাকেই এ নিয়ে কিছুই বলে না। বরং বলে, দিন কয়েক থাক, তারপর মামা এক সময় মেনে নেবে। কিন্তু এই দিন কয়েক থাকাটাও তো সমস্যা। দুই ভাইয়ের মাথার ওপর সুকুমার, তারপর আরও এই দুইজন মানুষ। সুকুমার বুঝতে পারে ভাইদের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সুকুমার অসহায়।
তখন ঝিলিককে রেখে ভক্ত খুলনা শহরে চলে যায়। সেখানে তাদের এ দিকের পরিচিত একজন আছে, তার কাছে থেকে যদি কোনও কাজ জোটাতে পারে। কিন্তু কী কাজ জোটাবে তাও তো তার জানা নেই। এর ওপর গোয়ার্তুমি আছে ষোলো আনা। খুলনা যাওয়ার আগেও ঝিলিককে শুনিয়ে বলেছিল, তার জীবনটা এই ঝিলিকই বরবাদ করে দিয়েছে। কতবার নাকি বলেছে, ভালোমতো একটা কাজ জুটিয়ে একদিন তাকে নিয়ে আসবে। তা না। ঝিলিকের তখন খালি এক কথা, এই ফাল্গুনেই তার বাপ তাকে বিয়ে দিয়ে দেবে। তখন ফিরে এসে আর তাকে পাবে না। অগত্যা, ঝিলিকের পিড়েপিড়েতেই নাকি এই দশা, এভাবে প্রায় এক কাপড়ে তাকে নিয়ে আসতে হয়েছে।
একদিন সন্ধ্যায় সুকুমারের বউদিরা ঝিলিককে স্থানীয় কালীখোলায় নিয়ে যায়। সঙ্গে ভক্ত আর সুকুমার। মা কালীর সামনে ঝিলিকের সিঁথিতে ভক্ত সিঁদুর পরিয়ে দেয়। বউদিরা ঝিলিকের হাতে পরায় শাখা। ব্যস, সুকুমারের ভক্তদার বউ ঝিলিক। এর দিন কয়েক বাদে ভক্ত খুলনায় যায়। ঝিলিক তাদের বাড়িতে। সুকুমারের বউদের সঙ্গে গৃহস্থালি কাজ করে। কাজে গুরুপনা আছে। একটু মোটা গলায় বরিশালের মানুষের মতন কথা কয় বলে তারা মাঝেমধ্যে হাসাহাসি করে। সুকুমার দেওর হিসেবে এই নিয়ে খেপায়। আর কখনও কখনও দুই জা বাদে ঝিলিকের মনের কথা বলার একমাত্র লোকই হয় এই সুকুমার। কখনও হয়তো ঝিলিক বলত, বোঝলা, তোমার দাদা এট্টা গোঁয়ার!
সুকুমার সেকথা শুনে মজা করত, গোঁয়ার না-হলি এইরম সুন্দরী নিয়ে ভাগা যায়!
হয়, হইচে, তুই যে আমারে কোতায় সুন্দরী দেহে! বউদি কী সুন্দর!
সুকুমারের বড়দার বউ দেখতে বেশ। সুকুমার তা জানে। কিন্তু ঝিলিকের রূপে কোথায় যেন একটা চটক আছে, সেকথা জানাতে ভোলে না সে, বড়ো বউদি হল শাবানা, তুমি সুচরিতা
হইছে। থাকতা শুনচি সারাদিন ফুটবল লইয়া, এয়ার মদ্যে এত বই দেকলা কহোন আর নায়িকাগো চেনো কী কইরে? আমি তো বই-ই দেখি নাই জীবনে। এক বাড়ি পোস্টার দেকচি।
যহোন খুলনায় খেলতি যাতাম, তখন কত বই দেহিচি–তারপর ঝিলিকের কাছে জানতে চায়, দেহোনি বউদি, তুমি কোনওদিন বই? তালি মেজদার সাতে এরপর খুলনা যাইয়ে দেইহো।
সে আসুক। খুলনায় কোনও কাজ জোটাতি পারে না পারে সেইয়া জানে কোড? তুই আছো বই দেহারা তালে।
এসব বলতে বলতে ঝিলিক কখনও দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, এইরম বইসে থাইছে মাইনষের ঘাড়ের উপর আর কতদিন। আমারে সাথে কইরগা লইয়া গেলে আমি নয় এডা ওডা কাজ করতে পারতাম।
আমারও তো একই অবস্থা। দাদাগো ঘাড়ে বইসে খাই। আগে ফুটবল খেইলে, খেপে খোপে দুই পয়সা পাতাম, সেয়াও গেইচে–
চলো তয়, আমি আর তুমি খুলনা চইলগা যাই তোমার দাদার ধারে।
গেলিই কাজ দেবে কেডা?
তুমি না মেট্রিক পাস। ছোটো ছোটো ছেলেপেলেরে পড়াতা।
ওইয়ে মনে আছে নিকি? আমি হলাম যা পড়ি সেইয়ে একদিন মনে থাহে, পরদিন ভুইলে যাই। সব গোল গোল দেখি। ফুটবল ছাড়া জীবনে আর কিছু দেখিছি নিকি? পায়ে আমার একদিন কী হইয়ে গেল আর ফুটবলই খেলতি পারলাম না। ওই পড়ালেহা করিছি সেয়াও তো কত বছর। তার কোনও কিছু মনে নেই।
তবু কয়দিন দেকলি আবার পারবা। আমি তো প্রাইমারি ইস্কুলে কয়দিন গেচি, আমাগো যারা পড়াত সবাই মেট্রিক পাসও না, এলাকার দাদারা। ওইরম খুলনা যাইয়ে নয় তুমি কিছু বাচ্চাকাচ্চারে প্রাইভেট পড়াইলা। কী যাবা?
একদিন ভক্ত আসলে ঝিলিক তার কাছে কথাটা পাড়ে। তারপর সিদ্ধান্ত হয়, যদি আর মাস দুই মাসে সে ভালো কোনও কাজ জোটাতে না পারে তাহলে ঝিলিকের সঙ্গে সুকুমারও যাবে। এখনও মাথা গোঁজার কোনও ঠাই হয়নি। ধান কাটা মানুষ ভক্ত, এখন রূপসার কূলে এক গোলায় কাঠ ফাড়ার কাজ করে। সেখানেই রাতে ঘুমায়।
তারপর একদিন সুকুমারকে নিয়ে ঝিলিক খুলনা যায়। রূপসা ঘাটের কাছে এক ছাপড়ায় থাকে। ছাপড়াটা ছোটো। বাইরে একটা এক চালায় ঘুমায় সুকুমার। ভিতরে ভক্ত আর ঝিলিক। রাতে তাদের শরীর বিনিময়ের শব্দ সুকুমারের কানে যায়। সুকুমার তখন এপাশ ওপাশ করে। কোনও কোনও সকালে সেকথা ঝিলিককে একলা পেয়ে মনেও করিয়ে দেয় সুকুমার। ঝিলিক। হাসতে হাসতে বলে, গরানের চলা পিঠে ভাঙব!
