ভিতরে এত ঘটনা আছে, পরশু তার কিছু কিছু জরিনা ঝিলিকের কাছে শুনেছে, হয়তো। কিন্তু সে কথার কিছু আজ সারাদিনে একবারও জরিনা সুকুমারের কাছে জানতে চায়নি। মেয়েদের আলাদা কোনও হিসেব থাকে। অনুমানে তারা অনেক কিছুই বুঝতে পারে। তবে সুকুমার লক্ষ করেছে, ঝিলিকের সঙ্গে এবার দেখা হওয়ার পরে, আলাপের পরে জরিনার তার প্রতি আচরণ বদলে গেছে।
যেন, এইমাত্র সে কথাই বলল, দেখলা, সব লঞ্চ আসল, এহোনও মোড়েলগঞ্জের লঞ্চখান আসল না?
কী যে কও?
না, সেই লঞ্চখান আসলি বুঝদি পারতা সে ভালোমতো পৌঁছইছে নাকি, ও সুকুমার ভাই! সুকুমার হাসল, তোমার কতায় ভালোই রস আছে।
রস না রস, কথা এহেবারে রসগোল্লা। আর ফাও কতা কইয়ে না। কতায় রস থাকলি আর এই জায়গায় থাকতাম না।
আর ওইয়ে কইয়ে লাভ নেই। আইজ মরলি কাইল দুই দিন। আইজ এই জায়গায়, কাইল কোন জায়গায়, তার কোনও ঠিক আছে? এই যে টাউনের ছলপলরা কয় না, কী আছে জীবনে, আধসের আটার দাম নেই। ঠিকই কয়।
তা তো ঠিকই। দেখো, তুমি যার জন্যি লঞ্চের জন্যি বইসে আছে। দুই তিনদিন বাদে আবার আসপে, তার জীবনডা, গিরস্ত ঘরের বউ আইজকে তোমার সাথে পথে পথে!
এ সময় আজগর যেন ডাকল অথবা ডাকেনি। জরিনার মনে হল। হয়তো জরিনা ঝিলিকের হঠাৎ আসা নিয়ে এমন আরও কিছু বলত। উঠে গেল। হয়তো, এখনই আসবে। তবে ঝিলিকের হঠাৎ এখানে এইভাবে আসা সুকুমারের কাছেও বিস্ময়।
সুকুমার বলল, তা তো ঠিকই, জরিনাদি—
জীবন এইরাম, এই দেহো আইজ আমি কোতায়? কাইল কোতায় থাকপো জানে কেডা?
জরিনা আজগরের কাছে যেতে লাগলে সুকুমারও একটু যেন বিড়বিড় করে, ঠিকই কইচো–
সুকুমারের ঝিলিকের স্বামী ভক্তর মুখোনা চোখে ভাসে। বড়ো গোঁয়ার ভক্তদা। এই কাজ করতে পারল। ও মানুষ না। কিন্তু সুকুমার কেন, তার আত্মীয়স্বজন জ্ঞাতিগুষ্টির কেউ কি কোনওভাবে ভাবতে পেরেছে ভক্ত এই কাজ করবে? নিরীহ কিন্তু গোঁয়ার মানুষের পেটে তলায় তলায় কতপদের ধান্দা থাকে, তা যদি মানুষ বুঝত? কিন্তু মানুষ যে বুঝতে সেই সাধ্য কার? কবে কোন দিন কোন কাজে মোল্লারহাট থেকে ভক্ত গিয়েছিল মোড়েলগঞ্জের হোগলাবুনিয়ায়। সম্ভবত গোপালগঞ্জের পরবাসীদের সঙ্গে ধান কাটতে। আজ আর ভালো মনে নেই সুকুমারের। তখন সে এ জায়গায় ও জায়গায় ফুটবল খেলে বেড়ায়। কালেভদ্রে বাড়ি আসে। ফরিহাটের এক বাড়িতে থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন প্রাইভেট। ফুটবলই তার জীবনটা শেষ করবে, বলত সবাই। কিন্তু তার ফাঁকে যে একদিন সুকুমার মেট্রিকটা পাশ করতে পারবে তাও কেউ ভাবেনি। সুকুমারের চোখে তখন অন্য স্বপ্ন। এসব লেখাপড়া দিয়ে তার হবেটা কী? যদি খুলনায় এ-ডিবিশনে খেলতে পারে, তারপর সামনে ঢাকা লিগ। খুলনায় না-হলে ঢাকায় বি-ডিবিশনে এক দুই বছর খেলে তারপর নয় এ-ডিবিশনে কোনও ছোটো ক্লাবে খেলবে। ধীরে ধীরে বড়ো ক্লাবে। যদি সুযোগ হয়, তার ভাগ্য ফেরে।
যদিও তার ভাগ্য উলটো দিকে গেল। যা কোনওদিনও ভাবেনি সে, তাই ঘটল। প্র্যাকটিস ম্যাচে হাঁটুতে দারুণ চোট পেল। সুকুমার আজও বুঝে পায় না, বল নিয়ে ডিবলিং করতে করতে ওই ঘটনা কী করে ঘটল! একা একাই তো। পায়ে তার চমৎকার জাদু। সবাই বলত, বল সুকুমারের কথা শোনে। এক পায়ে একবার বল তুলতে পারলেই হত, আর তা কোনওভাবে নীচে পড়ত। ডান পা থেকে বাঁ পা, আবার ডান-বাম। সেখান থেকে হাঁটু ও ঊরু। এক উরু থেকে অন্য উরু। আবার পা। পা থেকে সোজা মাথায়। মাথার ওপর কিছুক্ষণ বল নাচানো। সেখান থেকে কখনও কখনও ঘাড়েও নিতে পারত, তবে ঘাড়ে নিলেই বল পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বেশিক্ষণ ঘাড়ে রাখত না। এমনকি কখনও কখনও ঘাড়ে নিতই না। মাথা থেকে আবার উরুতে। উরু থেকে পায়ে।
সেদিন মাঠে এ খেলা দেখাচ্ছিল না সুকুমার। এটা কখনও কখনও করে। তখন বল ডান পায়ের নীচে নিয়ে বুটের একটু চাপ দিয়ে বলটার নীচে বাম পায়ের একটা খোঁচা দিতে চেয়েছিল মাত্র। তাতেই জীবনে এত বড়ো সর্বনাশ! সুকুমার টান সামলাতে না পেরে ডান দিকে হাঁটু মুড়ে পড়ে যায়। পড়ে থাকে। আশেপাশের সবাই মনে করেছে পড়ে আছে। কোনও ব্যথাও পায়নি সে। হাঁটুর ভিতরে কোথাও কোনও জ্বালাও করে ওঠেনি। কিন্তু ওই পড়া থেকে তখন সুকুমার আর কোনওভাবেই উঠে দাঁড়াতে পারে না। সহখেলোয়াড়রা তোলে তাকে। তাদের ধরে দাঁড়ায়। ডান পায়ে কোনও জোর পায় না। পা-টা মাটিতে দিতে পারে না। এভাবে মাঠের কিনারায় আসে। সবাই ভাবে, এমন তো কতই হয়। রেস্ট নিলে ঠিক হবে। ব্যথা না কমলে ডাক্তার ওষুধ দেবে। কিন্তুসেই রেস্ট নেয়া যেন হয়ে গেল একেবারে সারাটা জীবনের জন্যে। বল পায়ে সুকুমার আর মাঠে দৌড়ায়নি। ডাক্তার দেখিয়ে কিছু পরীক্ষা এক্সরে এসবও করেছে, ডাক্তাররা বলেছিল, কোনও একটা জয়েন্টে একটা সমস্যা। এটা নাকি তার অনেক দিনের, এতদিন বোঝা যায়নি, এদেশে এসবের কোনও অপারেশন নেই, বিদেশে আছে। তবে তাতেও যে সে খেলতে পারবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
নিশ্চয়তা থাকলেই-বা কী হত? সুকুমারের মতন প্লেয়ারকে বিদেশে পাঠাবে কে? তখন সুকুমার বাড়ি ফেরে। কিন্তু সেখানে বসে কে খাওয়ায়। বাপ নেই। ভাইয়েরা যার যার সংসারে। এক ভাই ভাগের ভিটার জমি বেচে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। বাকি দুজন কষ্টে থাকে। ভিটার ওইটুকু জমি ছাড়া বাপ আর কিছু রেখে যায়নি। স্থানীয় স্কুলের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলে, সুকুমার দেখে। একদিন পায়ের কাছে বল আসলে, সে লুঙ্গিটা গুটিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বলটা পায়ে নিয়ে আবার আগের মতই নাচায়। বাঁ-পায়েই রাখে বেশি ভর। তখন সবাই তাকে খেলতে ডাকে। সুকুমার তাদের জানায়, মাঠে দৌড়ানোর মতো শক্তি তার ডান পায়ে নেই। ডান পায়ে এদিকে ওদিকে বল ডিবলিং করতে পারবে না। সেদিন গেছে। তবে সুকুমার এই ঘটনায় বুঝতে পারে, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার পা এখনও আগেরই সেই করসত দেখাতে পারে। ও কৌশল সে ভোলেনি।
