এদিকে ঝিলিকের ভাগ্যটাও ভালো। সুকুমার তখন লঞ্চঘাটের কাছেই ছিল, তাকে খুঁজতে হয়নি তার। আজগরের শরীরটা খারাপ। গায়ে গতকাল রাত থেকেই জ্বর জ্বর। আজ একবারই কোর্টের কাছে গিয়েছিল, বাঁদর দুটোকে নেয়নি। সে দুটো তার ঝুপড়ির উলটো পাশে যেখানে বাঁধা থাকে সেখানেই বাঁধা ছিল সারা দিন। দুপুরে রোদ চড়লে জরিনা ছায়ায় নিয়ে বেঁধেছে। বার দুয়েক খেতে দিয়েছে। পয়সা নেই, কলা মুড়ি আর একখানা দুই খানা আধ পোড়া রুটির বেশি কিছু দেয়ার উপায় জরিনার নেই। তাছাড়া জরিনা আজগরকে নিয়েই পারে না। কোত্থেকে একটা বালতি জোগাড় করে নদী থেকে পানি এনে আজগরের গা মাথা ধুইয়ে দিয়েছে। এক উড়ে মালিকে বলেছে, যদি পারে জেলখানার পুকুর থেকে যেন এক ভাড় পানি এনে দেয়। নদীর পানি নোনা। এই নোনা পানিতে জ্বরের রুগিরে থোয়ালে গায়ে সাদা খড়ি ওঠে। যদিও সে বলেছিল, নদীর পানিই ভালো। জরিনা যেন ভরা জোয়ারের পানি দিয়ে আজগরকে কাল নাইয়ে দেয়। কিন্তু প্রায় রাস্তার মেয়ে এই জরিনা, ঠিক ভরা জোয়ারের সময় কার বালতি কাল খালি পাবে, একটা বালতি জোটাতে পারবে কি না, তা সে নিজেই জানে না। তাছাড়া এই জায়গায় বাসাবাড়িও তেমন নেই। থাকলে আজগরের জন্যে এট্টু গরম ফেন আনতে পারত। ওই গরম গরম ফেন লবণ দিয়ে খাইয়ে দিলে আজগর একবেলায় চাঙা। তবে আলতাফকে বলে রেখেছে, আলতাফ দেবে। কিন্তু আলতাফ শালা আচ্ছা হারামি। ফেন আনার সময়ও সুযোগ পেলে দুটো খবিশ কথা বলবে।
এই সব প্রায় বিড়বিড়িয়ে সুকুমারকে জানিয়েছে জরিনা। দিন তিনে আগে এই লোকটার সঙ্গে আজগরের তর্কাতর্কি হয়েছে। তা নিয়ে কিছুক্ষণ দুজন দুই দিক, কিন্তু ঝিলিকের সঙ্গে সুকুমারকে দেখার পর জরিনার মনে হয়েছে, এই মানুষ খারাপ হতে পারে না।
ঝুপড়ির বাইরের দিকে মাথা দিয়ে আজগর তক্তপোশে শোয়া। সেখান থেকে বড়োজোর হাত আষ্টেক তফাতে নদীর পাড়ে বসেছিল জরিনা আর সুকুমার। কিছু আগে এসেছে সন্ন্যাসীর লঞ্চ, তারপর এসেছে ভাসার ওদিকের লঞ্চখানা। সকালে মোড়েলগঞ্জের লঞ্চে হোগলাবুনিয়া গিয়েছিল ঝিলিক। সে লঞ্চখানা তখনও ফিরে আসেনি। এমনকি সেই লঞ্চখানার জন্যে সুকুমার আর জরিনা এখানে বসেও নেই। সুকুমারের অবশ্যি একবার মনে হয়েছিল, ওই লঞ্চখানা তো এখনও ফিরল না। ফিরতি লঞ্চটা দেখলে সে মনে মনে ভেবে নিতে পারত, ঝিলিক ঠিকঠাক পৌঁছেছে।
আজগরের কপালের জলপট্টি বদলে দিয়ে এসে জরিনা সুকুমারকে বলে, জ্বর নামতিচে না, সুকুমার ভাই!
ঝিলিক আসার পর থেকে জরিনা সুকুমারকে সুকুমার ভাই ডাকে, এর আগে ডাকত সুকুমারদা। ঝিলিক জরিনার চেয়ে বয়েসে ছোটো, সুকুমারও ছোটো, তবে সুকুমার ঝিলিকের চেয়ে বয়েসে খুব ছোটো হবে না। সম্পর্কে সুকুমার ঝিলিকের দেবর, কিন্তু তারা সমবয়েসি। তাই, জরিনা সুকুমারকে এইভাবে ডাকে। কিন্তু সুকুমার জরিনাকে সাধারণত কিছুই ডাকে না। তবে কখনও কখনও ডাকে। জরিনাদি। আর ঝিলিক আসার পরে, এই দুইদিনে জরিনা খেয়াল করেছে, সুকুমার ঝিলিককে প্রায় কখনওই কিছুই ডাকে না। বউদি তো নাই, নাম ধরেও ডাকে না। কখনও কখনও ডাকে মেজো বউ, এর বেশি কিছু ডাকতে শোনেনি।
সুকুমার বলল, রাতটা দেখা যাক। নাকি সকালে একবার পুরনো হাসপাতালে নিয়ে গেলি হবেনে।
হয়। তয় মোসলেম কাকা সামনের ফার্মেসির দে ওষুধ কিনে দিচে।
খাইচে সে ওষুধ?
হু, ওই ওষুধ খালি এট্টু সমায়ের জন্যি জ্বর নামে, তারপর আবার ওঠে।
এই গরম দিয়ে ঠান্ডা লাগা জ্বর। তাছাড়া আজগর ভাইর গায়ে আছে কিছু নিয়ম কানুন কোনোতা কোনওদিনও মানিছে বলে মনে হয় না।
আরে নিয়ম মানলি কোনও মানষির শরীরের এই দশা হয়!
এ নিয়ে কথা এক সময় থামে। বিকেল সন্ধ্যার দিকে এগোয়। আজও তার কোনও ব্যতিক্রম নেই কোথাও। শুধু গাছের পাতায় বাতাসের দোলা একটু বেশি। নারকেল গাছের পাতায় বাতাস খেলছে শব্দ করে। সেই বাতাসে হঠাৎ একটু দূরে কোথাও একটা নারকেল পড়ে। কিন্তু এই বাতাস এমন নয় যে, কোনও গাছের ডাল তাতে ভাঙবে। কিন্তু এইটুকু বাতাসেও এখন জরিনার বুক কাঁপে। যদি বাতাস আসে জোরে, যদি তার সঙ্গে বৃষ্টি হয়, তাহলে মানুষটার জ্বর ছাড়বে না। হাতে টাকা নেই একটাও। আজ নয় মোসলেম কাকা ওষুধ কিনে দিয়ে গেছে, কিন্তু কাল সকালে যদি আজগরকে ডাক্তারের কাছে নিতে হয়, তাহলে রিকশা ভাড়া লাগবে, হাসপাতালে স্লিপ কাটতে হবে আর ডাক্তার সাহেব যে ওষুধপত্তর লিখবে, তাই কিনতে হবে। জরিনা জানে না, সে পয়সা পাবে কোথায়? এখন মানুষটার এই অবস্থা, সে তাকে ছেড়ে চলে যাবে? যাবে কোথায়? গেলে মানুষ কবে কী? এই কয়মাসে তো তারে এই লোকটাই টানছে। ভালো পাড়ক মন্দ পাডুক খাওয়াছে। আজ এই অবস্থা!
সুকুমারের সঙ্গে কথা শেষ হলে এইসমস্ত কথা জরিনাকে ঘিরে ধরে। ওদিকে সুকুমারের ঘটনাটা তার উলটো। ঝিলিক খুঁজে খুঁজে তার কাছে এসেছে। তাই যেন স্বাভাবিক। যাবে কোথায়? কিন্তু কেন এসেছে, কোত্থেকে এসেছে, সেকথা সুকুমারই-বা জনে জনে বলে বেড়ায় কী করে? ঝিলিক কি জানত, এই জায়গায় একদিন পথে দেখা হওয়া জরিনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। যদি জরিনার সঙ্গে দেখা না হত, তাহলে কীভাবে কেউ জানত সে সুকুমারের মামাতো ভাইয়ের বউ।
