সুকুমার সরে যায়। ইব্রাহিম তার পাশের বাক্সটায় হাত দিয়েছে, তাই দেখে সুকুমারের মনে পড়ে, ইব্রাহিম বারিকের গাছতলায় আর-একটা বাক্স রেখে এসেছিল। সুকুমার সেখানে যায়। ইব্রাহিম এখন তার গুরুর নাম বলছে, এই ওষুধ কোথায় সপ্তাহের কোন কোন বারে বানানো হয় তা জানাচ্ছে।
সুকুমার অশঙ্খতলায় গেলে বারিক বলে, কেমন শোনলা?
জব্বর!
ওইরাম, আমারে সেদিন এই জায়গায় দিলদার আসে সে কচ্ছিল, এই ছেমড়ার কোনও তুলনা হয় না।
হয়।
কিন্তু এর কিছুক্ষণের ভিতরে ইব্রাহিম চলে আসে। সুকুমার জানতে চায়, এত তাড়াতাড়ি!
কই নেই, মানুষ আছে পাবলিক নেই।
তাও তো মন্দ কলা না!
কই আর কলাম। আগে এট্টু সাপে কাটলি কী করতি হয়, তাই দেহাতাম, যাতে গাছগাছড়ার গুণাগুণ মানুষ বুঝতি পারে। সে সব কিছুই তো দেহালাম না।
তাও তুমি যা সুন্দর কও–ওই জঙ্গলে গাও গানডা!
ওডা ফকিরি গান, একবার যশোর স্টেশনে শুনিলাম, কুষ্টিয়ার এক ফকির গাইল। এই জায়গায় লাগাইয়ে দেলাম।
সেয়া তো দেখলাম—
চলো, লঞ্চঘাটের দিক যাই।
তুমি থাহো কোতায়?
ওই দড়াটানা ঘাট–ওই জায়গায় এক ছাপড়ায়। আমার মালপত্তর তো ট্রেনে আসে। ওই দিক থাকলিই সুবিধা। তুমি?
আপাতত লঞ্চঘাটে আলতাফের হোটেলে।
সুকুমার ইব্রাহিমের সঙ্গে এগোয় অপার মুগ্ধতা নিয়ে। কোর্ট চত্বর ছাড়তে ছাড়তে সে ইব্রাহিমকে বলে, চলো এবার তোমারে আমি চা-পান খাওয়াব–
ইব্রাহিমের আসরের পরে হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যাওয়া কোর্ট চত্বর থেকে লঞ্চঘাটের দিকে তারা এগিয়ে গেল।
বারিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাই দেখে। তারপর আবার ঝিমায়।
০৬. শেষ বিকেলে ঝিলিক
শেষ বিকেলে ঝিলিক এসে হাজির। সুকুমার জানে আসতই,কিন্তু তা আরও দিন দুয়েক বাদে। আজই কেন? সুকুমার একই সঙ্গে অবাক ও বিরক্ত। গত তিন দিনে একবারও খেলা দেখাতে পারেনি। পরশু দিন গেছে আজগরের সঙ্গে রাগারাগিতে গতকাল কোর্টে তেমন কোনও লোকই ছিল না। লোক ছিল, ওই যে ইব্রাহিম মোসলেম উদ্দিনকে বলেছে একেবারে খাঁটি কথা। কোর্টে মানুষ আছে, পাবলিক নেই। সেই পাবলিক না-থাকা দশায়, ইব্রাহিম শেখের মতন ক্যানভাসারের আসরেই মানুষ হয় না, সেখানে সুকুমার খেলা দেখালে কে দেখে। খেলা তো দেখতে হয়, পাবলিক খেলা দেখে, পয়সা ফেকে। ইব্রাহিমের ওষুধ কিনে কল্পনা করতে করতে মনের সুখে বাড়ি যায়। এই ওষুধে কাজ হবে। এবার আর কোনও সমস্যা থাকবে না। গায়ে হাজার ঘোড়ার শক্তি কি ওই জিনিসটা এবার ঘোড়ার জিনিসের মতন বড়োসড়ো আর কার্যকর হবে। সেই ইব্রাহিমই ক্যানভাস থেকে ফিরে মুখোনা আমচুর করে রাখল। বলেছিল, এই ট্রেনের তুলে নেয়ার সমস্যাটা না গেলে কোর্টের পরিস্থিতি কোনওভাবেই ঠিক হবে। এমনকি দিলদারকে তার যন্ত্রটা নিয়ে বারিক কাকার দোকানের পাশে বসতে দেখেনি। এই কোনার দাঁত তোলার ডাক্তার সোলায়মান খান তার টেবিল নিয়ে শুধু বসেই ছিল। আজগর তার সামনে থেকে ঘুরে যেতে যেতে বলেছিল, কী দাঁতের ডাক্তার! সরকার টাউনের বড়ো বড়ো কুতুবগুলোর মাড়ির দাঁত যেভাবে ধইরগা টানতেচে, তোমার আর কষ্ট কইরগা দাঁত ফেলান লাগবে না। কে বলে আজগরের কথায় রস নেই। রস আছে ঠিকই, কিন্তু আজগর রসের কথাটাও এমন কাটখোট্টাভাবে বলে যে, সেই রসে আর কিছুই ভেজে না। এমনকি এসময় কান পরিষ্কার করা গোলাপ মিয়াকে তার ওই বাক্সটা সমেতও তেমন ঘুরতে দেখা যায়নি।
ফলে, এই পরিস্থিতিতে ঝিলিককে দেখে সুকুমারের চোখ একটু আকাশে উঠতেই পারে। কিন্তু ঝিলিক কি সে জন্যে দায়ী? সে কি এত কিছু জানে? যদিও ঝিলিকের আসার কথা ছিল আরও দুদিন বাদে, কিন্তু যে কাজে গেছে সেই কাজ যদি না হয়, তাহলে খালি খালি সেখানে আরও দিন দুয়েক থাকার দরকার কী? এই সবই হোগলাবুনিয়া থেকে লঞ্চে উঠতে উঠতে ঝিলিক যে ভাবেনি তা তো না। অত অবিবেচক মানুষ যেন তাকে সুকুমার না মনে করে। যদিও মনে করলেই-বা কী? সুকুমার মানুষটাও তো নিরুপায়। এই তিনদিন গেছে, তারও আগে যে আয় রোজগার তাও তো কম। এই শুকনার সময়ে যদি আয় রোজগার নাহয় তাহলে সামনে চলবে কেমনে। যদিও বর্ষাকালে রথের মেলার সময় দিন কয়েক তার যাবে ভালো। কিন্তু অমন ভরা বর্ষায়, পিচ্ছিল মাঠে তার খেলা দেখাতে কী কষ্ট হয়, তা যারা খেলে দেখে তাদের জানার কথা না। মানুষ খেলা দেখে আনন্দ পায়, কিন্তু খেলাঅলার কষ্ট কেউ দেখে না। আর সে সালাউদ্দিন না সালাম না আসলাম–বড়ো খেলোয়াড়, তাদের খেলা দেখতে হাজির লাখ লাখ মানুষ। টিকিট কাটো খেলা দেখে। আর সে কোন জায়গার কোনও দড়াবাজা, বাজিকর, তিন ফলকের খেলা দেখানো সুকুমার। যদি জয়দেব ছেলেটা থাকত, তা হলে হয়তো ঝকার তলে চাকু মারার খেলাটা দেখাতে পারত। ওই খেলাটা দেখলেই না পাবলিক কিছু পয়সা দেয়।
সুকুমার এসব ভাবত না, যদি তেঁকে কিছু থাকত। ঝিলিক কাল গেছে পরই ভেবেছিল, আজ চলে যাবে দড়টানা ঘাটের দিকে কোনও ছাপড়া হোটেলে। হোগলার বেড়া, গোলপাতার চাল, ভাড়া কম। খেলা দেখানোর ওই কিছু মালামাল মাথার কাছে রেখে রাত্তিরটা কাটিয়ে দিত। সকালে নদীতে স্নান করে পোটলা-পুটলি বোচকা-বুচকি নিয়ে রওনা দিত কোর্টের দিকে। শরীরের জুত থাকলে, ভেবে রেখেছিল সকালে রেল স্টেশনে কিছুক্ষণ খেলা দেখিয়ে, একটু বেলা উঠলেই চলে আসবে কোর্ট চত্বরে। কিন্তু সে সবই ভেস্তে গেল। ঝিলিককে নিয়ে তো ওই দড়াটানা ঘাটের দিকে যাওয়া যাবে না। ওদিকে বেশির ভাগই থাকে মাছের আড়তের খালাসিরা। সেখানে সুকুমারের সঙ্গে একটা মেয়ে। মেয়েমানুষ নিয়ে এই এক ঝামেলা, যে জায়গায় রাত সে জায়গায় কাতের কোনও উপায় নেই।
