ইব্রাহিম তাও জানায়। মানুষকে কথা দিয়ে মুগ্ধ করার অসাধারণ ক্ষমতা তার, সুকুমার শুনতে শুনতে বুঝতে পারে। ইব্রাহিম এখন জীবনকে কোন কাজে অর্থপূর্ণ করা যায়, সেই দিকে যাবে। কিন্তু সেদিকে গেল না। আবার হাসানোর জন্যে কথা সহসা অন্য দিকে নিল। তখন সুকুমার চারপাশে তাকাল। তার মানে এখন জমায়েত তেমন ভালো হয়নি। আসল কথায় যাওয়ার আগে তার আরও মানুষ দরকার।
মানুষ আমরা, বাঁচার জন্যে খাই। খায় না এমন মানুষ আছে? রিগান খায়, রাজীব গান্ধি খায়, এরশাদ খায়, এই কোর্টের জজ সাহেব খায়, ডিসি সাহেব খায়, এসপি সাহেব খায়, এমপি মিনিস্টাররা খায়–আমি খাই আপনি খায়, মা-জননীরা খান! জন্মাইয়া খাই মায়ের দুধ। সবাই খাইয়া খাইয়া জীবনটা কাটায়। যে খায় না, সে বাঁচে না। সবাই জানেন। খাইলে পেটে খাবার জমে। খাবার হজম হয়। সেই খাবার আমাদের মল দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। আর যার ঠিকমতো বের হয় না, খারাপ খাবার খায় তার পেটে হয় গুড়ো কৃমি। ফিতা কৃমি। লতা কৃমি। গরুর পেটে হয় হাতখানেক বড়ো কৃমি। দেখেছেন, যদি না দেখেন তাহইলে পশু হাসপাতালে যাইয়া দেখপেন। দেখেন তো খালি গরুর ওই একটা জিনিস, ষাড়ের এত বড়ো এক জোড়া হোল! আর কী! ওই বড় বাড়া দেইখইে জীবন কাটাই আমরা।
ইব্রাহিমের আসর জমে গেছে। চারদিকে নীরবতা। কোর্ট চত্বরে যত কোলাহলই থাক, এই হাত দশ-পনেরোর একটা গোল জায়গায় এখন সবার চোখ ইব্রাহিমের দিকে। সুকুমারেরও বিস্ময় বাড়ে।
গরুর পেটে যেমন বড়ো কৃমি। আপনার পেটেও কৃমি। সেই কৃমি আপনাকে বসতে দেয় না, হাঁটতে দেয় না, শুইতে দেয় না, খাইতে দেয় না, নাইতে দেয় না। আর বলব? আরও বলার দরকার নেই। আর কী কী করতে দেয় না, আপনারা ভালো জানেন। এমন ভাবে আপনার পাছায় খোঁটায়, আপনি পাছায় খোঁচান আর ড্যান্স দেন। যেন আপনি মিঠুন চক্রবর্তী, আই অ্যাম এ ডিসকো ড্যান্সার, জিন্দেগি মেরা গানা। হাতে মাইক্রোফোন ধরার ভঙ্গি করে ইব্রাহিম মিঠুনের ভঙ্গিতে গানটা গেয়ে দেখাল। পুরো আসর জুড়ে হাসি। সুকুমার আরও বিস্মিত! আর, এবার যে আসল কথায় যাবে ইব্রাহিম, তা বোঝা গেল, বলল, ছোটো বাচ্চা ছেলে যারা আছে তারা চলে যাও। দুই একটিকে দাবড়ানি দিল। কারও কোমরের একটু উপরে যাদের মাথা দেখা যাচ্ছিল, তাদের চলে যেতে বলল। তারপর, যাদের গোঁফের রেখা এখনও ওঠেনি, উঠবে উঠবে তাদের কয়েকজনকে।
এবার শুরু হল, ওই ডিসকো ড্যান্সারের জীবনেও নারী আছে। নারীর জীবনেও পুরুষ আছে। আপনি সম্রাট আকবর, আপনার নানা আলিবর্দি খান আর আপনি বড়োলাট কি জমিদার শিশির রায়চৌধুরী যাই হোন, আর হোন পথের ভিখিরি। যদি রাতের বেলা, আমার মা আপনার স্ত্রী–সেই মায়ের কাছে গিয়ে নিজেকে পুরুষ প্রমাণ করতে না-পারেন, তাহলে এই জীবনের কোনও দাম নেই। একেবারে পরাজিত মানুষ। আলেকজান্ডার মারা গেছিলেন মশার কামড়ে অথচ সারা দুনিয়ার অর্ধেক তার ততদিন জয় করা সারা। এই রকম এই জিনিস পুরুষ মানুষ আপনি আপনার সঙ্গে আছে। সেটা যদি আপনার ক্ষমতা থাকে তাহলে তরবারি, ক্ষমতা না-থাকলে কিছুই না, ফুস একেবারে বেলুন। কিছুদিন আগে পত্রিকায় খবর বের হয়েছে, জার্মানিতে এক মহিলা তার স্বামীর ওই জিনিস কেটে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। কোর্টে কেস গেলে সে বলেছে, ইওর অনার যে জিনিস কাজে লাগে না, এই যেমন আপনার হাতের ওই কলমটা কাজ না-করলে তো আপনি ফেলে দেবেন, তাই তার ওই জিনিস আমার কোনও কাজে লাগত না, তাই ফেলে দিয়েছি। আদালত সেই মহিলাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।
সমবেত মানুষের চোখে এবার বিস্ময়। ইব্রাহিম তাদের এক ধন্দে ফেলে দিয়েছে। এখন ইব্রাহিম তাদের যা বলবে, তাই তারা বিশ্বাস করবে ও শুনবে। এতক্ষণে সে যা বলার বলে জায়গামতন চলে এসেছে, কিন্তু একটি কথাও ফাজলামি করে বলছে না। এসব যারা বিক্রি করে, তাদের বেশির ভাগই কথা বলে অনেটাই ফাজলামি করে। ইব্রাহিম শেখ আসলেই মানুষটা একটু আলাদা। সুকুমার এই রোদের ভিতরে ইব্রাহিমকে মুখের একপাশের ঘাম মুছতে দেখে। তারপর খুবই ঠান্ডা গলায় ইব্রাহিম আবার আসরে ফেরে।
কেন হয় এই সব রোগ, আপনারা জানেন? মানুষ এসব রোগ নিয়ে জন্মায় না। বড়ো হওয়ার আগে এসব রোগ হওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। মানুষ বড়ো হয় আর অসৎ সঙ্গে কুসঙ্গে পড়ে বাধায় বিভিন্ন যৌন রোগ। কেউ কেউ আবার লজ্জা পায়। রোগ হলে ডাক্তার কবিরাজের কাছে যায় না। আরে ভাই, শরীর আপনার, রোগ আপনার হবেই আর তার সমাধানও আপনাকে করতে হবে। লজ্জা পেলে চলে না। সাধু সেজে কোনও লাভ নেই। বাউল হবেন সঙ্গে বাউলানি, ফকির হবেন। সঙ্গে ফকিরানি, বৈষ্ণব হবেন সঙ্গে বৈষ্ণবী। যাবেন কোথায়, শরীরকে তো লাগবেই।
এই পর্যন্ত বলেই ইব্রাহিম একখানা বাউল গান গায় :
কত লোক জঙ্গলেতে যায়
স্বপ্নদোষ কি নেইকো তথায়?
নিজের মনের বাঘ যারে খায়
কে ঠেকায় তারে?
একটু আগের ডিসকো ড্যান্সারের গায়কের গলায় এ গান, এই ভর দুপুরবেলা! বিস্ময়ে সুকুমারের যেমন শেষ নেই। শেষ নেই যেন শ্রোতাদেরও। অথচ লোকটা অনেকেই মঘা বলে ডাকে। সুকুমারও তাই ভাবত।
কোথায় যাবেন, জঙ্গলে? সেখানেও আপনার সঙ্গে যাবে আপনার এই শরীর। ফলে, জঙ্গলে যাওয়ার দরকার নেই। যারা অতিরিক্ত হস্তমৈথুন, ঘন ঘন স্বপ্নদোষ, পতিতালয়ে গমন ও খারাপ মেয়েদের সঙ্গে অবৈধ মেলামেশার ফলে সিফিলিস, গনোরিয়া বাধিয়েছেন, বিয়ে করতে ভয় পাচ্ছেন, তারা আর ভয় পাবেন না। এমনকি যাদের ধ্বজভঙ্গ অর্থাৎ আগামোটা গোড়া চিকন, পুরুষাঙ্গ ছোট ও নিস্তেজ, স্ত্রী মিলনে অক্ষমতা, অল্পেই বীর্যপাত হয়, আমার মা আপনার স্ত্রীর কাছে যেতে ভয় পান, তাদের জন্যে এই ওষুধ। মাত্র এক বোতল খেয়ে দেখুন, এক বোতল। যদি কোনও কাজ না-হয় তাহলে এই কোর্ট চত্বরে আমি জুতোর মালা পরে ঘুরে বেড়াব।
