মোসলেমের শেষ। সে চলে আসবে। লাঠিটায় ভর দিয়ে সে যতটা পারে ঘাড় উঁচু করে। তার একটু পিছনেই দাঁড়ানো ইব্রাহিম। ইব্রাহিম বুঝেছে মোসলেম তাকেই খুঁজছে। মোসলেম তাকে দেখে, তারপর অশত্থ গাছটার নীচে চলে আসে। ইব্রাহিম ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে ঢুকে পড়ে।
মোসলেম লাঠিতে ভর দিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে একটু মাথা নীচু করে আসে। ডানে বামে মাথা নাড়ায়। বোঝা গেল, জমেনি। সুকুমারকে দেখে অবাক, ছেলেটা এখানে দাঁড়িয়ে! জানতে চায়, তুমি যাওনি? সুকুমার উত্তর দেয়ার আগেই আরও বলে, অবস্থা ভালো না। ইব্রাহিমের কথাই ঠিক–আইজকে মানুষ আছে পাবলিক নেই।
সুকুমার বলতে যাচ্ছিল কেন সে যায়নি। তার আগে অশত্থ গাছের পাশের রাস্তার এক দল ছেলের ভিতর থেকে একজন মোসলেমের উদ্দেশে একজন বলে, ও কা, একা নাকি?”
মোসলেম ভ্যাবাচেকা খায়। তাকে এই কথা বলে কে খেপাচ্ছে। সে দেখতে পারেনি। কথাটা বলে ওই ভিড় থেকে তাকায়নি কেউ। এমন ভাব তাদের ভিতর থেকে কেউ কিছু বলেনি। মোসলেম তাকিয়ে থাকল। তারপর বিড়বিড় করল, জাউড়ো ছওয়াল পয়াল যতো!
বারিকের কানা ঠিক খাড়া। সে বলে, উত্তর দিয়ে দেতা, না একা না, তোর মাও আছে সাথে।
বলে, বারিক আর মোসলেম দুজনই হাসে। যদিও সে হাসিতে সুকুমার যোগ দিতে পারে না। সে বিষয়টা বোঝেইনি। শহুরে ছেলেদের কাণ্ড। কিন্তু ভিতরে নিশ্চয়ই কোনও একটা বিষয় আছে। সেই বিষয়টা সুকুমার বুঝল না। এমনকি তখনই, মোসলেম আবার জানতে চাইল, কী-ই গেলা না?
সুকুমার বলল, না। দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে এট্টু ইব্রাহিমের মজমা দেখি।
এই জায়গায় দাঁড়াইয়ে? এ জায়গায় দাঁড়ায়ে কিছু শোনাও যাবে নানে, দেখাও যাবে নানে।
কী যে রোদ্দুর!
তালি এট্টু আগোয়ে দাঁড়াও। আর নয় আমার সাতে চা খাতি চলো।
না, চা খাইচি এট্টু আগে। আমি আর ইব্রাহিম।
আচ্ছা। তালি সামনে আগাইয়ে যাইয়ে দেহে। গাছের ছায়া তো ওই যে, পেরায় ইব্রাহিমের মজমা পর্যন্ত ছায়া চইলে গেইচে।
মোসলেম চলে যায়। আজ আর সে হয়তো আসবে না। কেননা, যাইরে বারিকও বলল এই সঙ্গে। গরমে লোকটা ক্লান্ত হয়ে গেছে। বোচকা হাতে ল্যাংচে হাঁটতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে বোঝা যায়। সুকুমারের মনে হয়, মোসলেম কাকার সঙ্গে গেলে হত, রিকশায় ওঠার আগ পর্যন্ত টেনে দিতে পারত বোচকাটা। কিন্তু গেল না।
এদিকে ইব্রাহিম ডুগডুগি বাজিয়ে কী সমস্ত বলেছে। মোসলেমের সঙ্গে কথা বলায়, আর গাছের প্রায় গোড়ায় থাকায় কিছু শুনতে পায়নি সুকুমার। কিন্তু একটু এগিয়ে এসে সব শুনতে পারছে। ইব্রাহিম বেশ ফাজিল আছে। একটা গান গাইল। সেই গানের সঙ্গে বেলবটম প্যান্টের কোমর দুলিয়ে বৃত্তের এমাথা ওমাথা নৃত্য করে দেখাল। এ ভুবনে যাকে আমি চেয়েছি, আঁখি বলে তার দেখা পেয়েছি এই পর্যন্ত গেয়ে এপাশ থেকে গেল ওপাশে। তারপর সে-পাশ থেকে, এবার সুকুমার আরও স্পষ্ট দেখতে পেল, কালো জুতো জোড়ায় মাটি ঠুকতে ঠুকতে, ও একই সঙ্গে কোমর দোলাতে দোলাতে গাইল বাকি অংশ, সে আমায় আজ কথা দিয়েছে, সে আমায় সে আমায় সে আমায়–
দারুণ! সুকুমারের হাসি পায়। এখানে আসার পর থেকে সে একদিনও ইব্রাহিমের ক্যানভাস দেখেনি। সুযোগ হয়নি। শুনেছে যেমন কথা বলে, একই সঙ্গে ক্যানভাসও করে দারুণ। ইব্রাহিম শেখের আসর। সুকুমারের তো আর কথা দিয়ে মানুষ তেমন ভিড়াতে হয় না, সে দেখায় খেলা। কিন্তু ইব্রাহিমের কাজ কথা নিয়ে। শুনেছে কথায় চিড়ে ভেজে, ইব্রাহিমের কথায় তা ভিজতে বাধ্য।
এরপর ইব্রাহিম বসে পড়ল। সুকুমার ইব্রাহিমকে দেখতে পায় না। আবার ইব্রাহিমের বসা জায়গার কাছে মানুষ একটু ফাঁকা হলে দেখতে পায়। সুকুমারের মনে হয়, কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যে রোদ! তার ইচ্ছে করছে না। এই দোটানায় একটু বাদে সুকুমার ইব্রাহিম শেখের আসরের শ্রোতাদের একজন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ইব্রাহিম দেখে তাকে। সুকুমার দাঁড়িয়েছে সূর্যের দিকে পিঠ দিয়ে। তাকে দেখে কথার ছরবার ভিতরে ইব্রাহিম একটু হাসল। তারপরই, আবার যেন আগের মানুষ।
ডুগডুগি বাজাল। বলল, পকেট সাবধান। একথা শুনতে শুনতে নিজেকে নিয়ে ভাববেন। ভাববেন এই জীবনের কোনও দাম আপনার কাছে আছে কি না। এর ভিতরে পকেটটা রাখবেন সাবধানে। আমার কথা শোনতে শোনতে গাল এমন হা করে রাখলেন যেন, সেই গালে মাছি ঢুকে গলার ভিতরে গিয়ে পৌঁছলে আপনি টের পাবেন। সেই ফাঁকে পকেটমার আপনার পকেট থেকে নিয়ে যাবে টাকা। আপনি এক অর্থশূন্য মানুষ। বলেন আপনারা অর্থশূন্য মানুষের জীবনের কোনও দাম আছে?
সমবেত জনতা ইব্রাহিমের মজমায় জুড়ে গেছে। তারা না বলল! সুকুমারের মনে হল, এদের মুখ দিয়ে মাছি ঢুকে গেলেও টের পাবে না। এমনকি কেউ কেউ ওই না এর সঙ্গে ইব্রাহিমের কথায় যে হেসেছিল, সেই হাসির মুখও আর যেন বন্ধ করল না!
ইব্রাহিম আবার কথা ধরে। সেই অর্থশূন্যতা দিয়েই শুরু। এই জীবনে রাজাধিরাজ হোক, বাদশা-সম্রাট হোক, জজ ব্যারিস্টার উকিল মোক্তার পেশকার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সওদাগর মহাজন যেই হোন না কেন, যদি অর্থ না থাকে তাহলে সে পথের ভিখিরি। ওসব মানুষ তখন তার মতো এই ক্যানভাসও হতে পারবে না। আজ সে সব মানুষের সামনে এসেছে, এই তাদের সামনে এসেছে, এই জীবনে টাকা পয়সা সব হাতের ময়লা, জীবনটাকে যদি তার অর্থহীন করে না তুলতে চায়, তাহলে আসতে হবে এই এখানে, এই ইব্রাহিমের কাছে। সেটা কেন?
