সেয়া জানবে কোহানদে। কাইলকের ছলপল। খালি শিখিছে খেইল দেহাতি। আর এক একজন নিয়ে ঘুইরে বেড়াতি।
হয়। একেবারে।
তাদের কথায় ইব্রাহিম আর সুকুমার যেন একটু পাশে পড়ে গেল। যাক, এই দুজন মানুষের কথা শুনতে তাদের খারাপ লাগছে না। যদিও বারিকের জন্য সেকথা আর এগোয় না। বারিক মোসলেমকে বলে, আইজকে এই জায়গায় বইসে কাটাইয়ে দেবা? নাকি মজমাটা মিলোব?
মিলোব তো বারিক। মজমা মিলোনোর জন্যিই তো আইচি। থলির ডুগডুগি না বাজালি পেটও চলে না, কানেও ভালো লাগে না, কিন্তু আইজকে মানুষজনের কায়দা দেখিচো? ওই ইব্রাহিমের কথাই ঠিক, মানুষ আছে, পাবলিক নেই।
হয়। তয় তোমাগো চোখ আছে। বারিক বলে, দেইহে বুঝদি পারো, কী অবস্থা চলতিচে। আমি এই জায়গায় তালগাছের মতন বইসে থাইহে থাইহে অত বুঝদিও পারি না। কিন্তু আইজকে বুঝদিচি, মানুষের এদিকে কোনও খেয়াল নেই।
কিন্তু কিছু করারও নেই। রেল উইঠে যাবে। ছাত্ররা আন্দোলন করতিচে। কয়জনের অ্যারেস্ট করিচে। আইজ মনে হয় জামিনের তারিখ পড়বে।
শোনলাম হক আর মোজাম্মেল উকিল সাহেবগোও অ্যারেস্ট করতি পারে।
আমিও শুনিচি।
তা কী আইজ এই জায়গায় বইসে থাকপা তোমরা?”
হয়, সেইয়ে থাহি।
মোসলেম উদ্দিন পায়ের কাছে রাখা লাঠিটা হাতে নেয়। কিন্তু উঠে দাঁড়ায় না। ঘাড় ঘুরিয়ে ইব্রাহিম আর পিছনে সুকুমারের উদ্দেশে বলে, কী তোমরা যাবা এহোন, না আমি যাব?
ইব্রাহিম বলে, বেলা বাইরে গেইচে! আজগর ভাই যাবে না? তারে তো দেকতিচি না।
বারিক তাদের কথায় ঢোকে, হয়, আইজকে মাইনষে দেকপেনে বান্দর খেলা? খাইয়ে তো কোনও কাজ নেই।
ভুল বলেনি বারিক। মোসলেম তাকে সমর্থন দিল, তুমি দেহি এইসবও বোঝে। ঠিকই কইচো। আজগর সেইয়ে বুঝদি পাইরে দিছে ডুব।
না না, ডুব দিনি, ডুব দিনি শরীর খারাপ। আর নয় ওই জরিনার সাথে লঞ্চঘাটে বইসে রইচে। বারিক অনুমান জানায়।
ইব্রাহিম বলে, তালি কী করবেন?
এরপর সিদ্ধান্ত হল, আগে মোসলেম যাবে। তারপর ইব্রাহিম। সুকুমার খেলা দেখাবে না। তার মন ভালো নেই। সে আলতাফের হোটেলের দিকে যাবে। অথবা, একবার দেখে আসবে আজগরকে। আবার তার যেতেও ইচ্ছে করছে না। আজগরকে দেখতে গেলেই জরিনা জিগগেশ করবে, ঝিলিক কেন চলে গেল? কারণ বললে জানতে চাবে, সে কেন চলে যেতে দিল? কিন্তু ও বিষয়ে কথা বলতে সত্যি ভালো লাগে না সুকুমারের। সুকুমার সে-কথা ভেবে এখনই গেল না।
এদিকে এইসমস্ত বলতে বলতে বেলা গড়িয়েছে। মোসলেম তার ঝোলাটা নিয়ে চত্বরের মাঝখানে গিয়ে বসল। তখন ইব্রাহিমের মনে হয়, আজও রোদ উঠেছে ভালোই। সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে গেছে তাও অনেকক্ষণ, কিন্তু আজ মানুষের ঢলের কারণে বেলা যে এতটা হয়েছে তা বুঝতে পারেনি, নাকি তারা বসে আছে অশত্থ গাছটার নীচে। এই গাছের ছায়ায় রোদ বোঝা যায় না, তাপ বোঝা যায় না, সেই জন্যেই হয়তো সারাটা বেলা ওখানে বসে বসে বারিক ওভাবে ঝিমায়। এই গাছের তলে সত্যি চোখ জুড়িয়ে আসে। এমনভাবে জুড়িয়ে আসে যে উঠে আর কাজে যেতে মন চায় না। চত্বরে যে রোদ, বুঝবে মোসলেমকা! কিন্তু সে-কথা ভাবতে ভাবতে ইব্রাহিমের মনে হয়, একটু বাদেই তো তাকেও যেতে হবে ওখানে। তখন সূর্য থাকবে একেবারে চান্দির ওপর। তখন কি ইব্রাহিমের গলা দিয়ে স্বর বের হবে।
মোসলেম উদ্দিন তার ঝোলা থেকে ডুগডুগি বের করে বাজাতে শুরু করে। গলা থেকে বের করে এক অদ্ভুত স্বর। তাতে তার কাছে কিছু মানুষ ঘিরে দাঁড়ায়। দেখে ইব্রাহিমের মনে হয়, ট্রেন নিয়ে যাই হোক, কোর্টে তা নিয়ে যতই উত্তেজনা থাক, কিছু মানুষ এই চত্বরে আসে ঘুরতে, তাদের কোনও কাজ নেই। তাদের কয়েকজন তো মোসলেম কাকার আসরে আসবে। কিন্তু সেটুকু ভেবেই তার মনে হয়, তারা আসলেই-বা কী? তারা কি আর ওই পাউডার কিনবে। যারা কেনার পাবলিক, তারা যদি না আসে। ইব্রাহিমও উঠে সুকুমারের পাশে দাঁড়ায়। তারপর গলা নামিয়ে, একটু যেন বিষণ্ণ সুকুমারের কাছে জানতে চাইল, ভাইতি যাবা নাকি এট্টু চা খাতি?
সুকুমার হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না, তবে ডানে-বামে মাথা ঝকাল। একটু অন্যমনস্ক ভঙ্গি। মাথা নাড়ানোটাও স্পষ্ট নয়। ইব্রাহিম বুঝল না। ইব্রাহিম যে বোঝেনি, সেটা বুঝেই সুকুমার বলল, যাওয়া যায়। কিন্তু আইজকে সব দোকানে যেরাম ভিড়!
চলো, যাইয়ে দেখি। এই সোজা এট্টা দোকান আছে নদীর পাড়ে।
এই সোজা দোকানটায় যেতে হবে লঞ্চঘাটের আগের গলি দিয়ে। মেইন রোডে সেখানে দুই পাশে বড়ো বড়ো ফার্মেসি। মাঝখানে গলিটা। গলি ধরে এগোলে মাথায় নদীর পাড়। তার আগে একটা ছোটো চায়ের দোকান আছে। পাশে একটা পানের দোকানও। ইব্রাহিম পান খায়, সুকুমার খায় না। ওই দোকানের পান ইব্রাহিমের পছন্দ। সুকুমার অবশ্য তা জানে না।
রওনা দেবে ঠিক সেই সময়ে সুকুমার বলল, আপনি যান, আমার যাতি ইচ্ছে করতিছে না।
ইব্রাহিম বিস্ময়ের সঙ্গে সুকুমারের মুখের দিকে তাকায়। এই মানুষটাকে বোঝাই যায় না। তবু সে বলল, চলো, চলো, তাড়াতাড়ি চইলে আসপো। এই দেহো না কী রোদ্দুর! এক গ্লাস পানি খাইয়ে, এক কাপ চা খাইয়ে, এট্টা পান মুখে না-দিয়ে আমি আইজ আসর জমাতি পারব না।
সুকুমার আর কোনও কথা না-বলে ইব্রাহিমের সঙ্গে যায়। পাশ থেকে বারিক বলে, পান আমার জন্যি এটা আনিস। অবাক করা ঘটনা এই, একটু পরে, সুকুমার ইব্রাহিমের সঙ্গে ফিরেও আসে এই অশখতলায়। পানটা সেই-ই বারিককে দেয়। ততক্ষণে মোসলেমের আসর প্রায় শেষ। সে প্যাকেট দিচ্ছে সবার হাতে। এদের কেউ নেবে, কেউ নেবে না। যারা নেবে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মোসলেম আসর গোটাবে। ইব্রাহিমের ঢুকতে হবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। আজকের এই অল্প জমায়েত, মোসলেমেরটা ভাঙতে ভাঙতে যদি মানুষ চলে যায়। সে তার পোটলা পাশে রাখা বাক্সটা নিয়ে মোসলেমের জমায়েতের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আবার ফিরে আসে। গাছতলায় আর-একটা বাকসো দেখিয়ে সুকুমারকে বলে, এইডে থাকল, লাগবে নানে। লাগলি পরে নেবানে।
