এতেই অবশ্য বারিক বুঝে যায়, এই দুজন কী বই খুঁজছে। হয়তো তারা একখানা শাপমোচন কি এরপরে নৌকাডুবি বা অগ্নিবীণা উলটাতে উলটাতে এইসমস্ত বইয়ের তলা থেকে তার একখানা আবিষ্কার করে নেয়। সেখানে অবশ্য একসঙ্গে একখানা দুইখানাই থাকে। এমনকি প্রচ্ছদে তেমন রগরগে ছবিও থাকে না। প্রত্যেকটাই পিনমারা। চাইলে এই জায়গায় বসে পড়াও যায় না। যদি পিনমারা না-থাকত, তাহলে বারিক জানে এ জায়গাতেই চলত ওই বই পড়া। এক একজন পড়তে পড়তে প্রায় সাবাড় করে ফেলত। এখানে বসে পড়তে পড়তে উত্তেজিত হত। লুঙ্গির মাঝখানে উঁচু হয়ে যেত। ওই গ্রাহকের চোখ মুখ কিছুটা লালচে, মুখ থমথমে আর কিছুটা ভারি বারিকের এ সবই জানা আছে। তারপর পড়তে থাকা তাদের কারও কারও লুঙ্গি হয়তো কিছুটা ভিজেও যেত। কেউ বা উঠে আশেপাশে কোনও গলি খুঁজে নিত, যেখাতে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের এই উত্তেজনার ভার দমন করা যায়।
সে সুযোগ রাখেনি বারিক। কেউই রাখে না। এখানে বারিক বয়স্ক, তাও কখনও কখনও এসব বইয়ের কিছুটা উলটে পালটে দেখেছে। তখন তারই ভিতরে ভিতরে কেমন করে, আর এসব নওজোয়ান ছেলেদের। তারা উপরের ছবি দেখতে দেখতে, কখনও কখনও পিনের পাশ যে প্রায় ছুটিয়ে ফেলে, তাও তার জানা আছে। তাই ওই বই কেউ হাতে নিলে বারিকের আধ বোঝা চোখখানা স্পষ্ট হয়। এমনকি স্কুলেপড়া ছেলেরা কখনও ওই বইয়ে হাত দিলে চোখটা আরও বড়ো করে খুলে সে ডানে-বামে মাথা নাড়ে।
কিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞতায় বারিক জানে, কারা এই বই কিনবে আর কারা শুধু ওই বই হাতাবে। সে দেখেই ভাবভঙ্গি বুঝতে পারে। ওই যে যেমন, যারা শাপমোচন হাতিয়েছে, কিন্তু কিনবে না। নাড়তে নাড়তে নিজেদের ভিতরে কথা বলার ভঙ্গিতে বারিক বুঝত পারে, এরা নেবে। সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দাম বলল, দশ টাকা। দশ টাকা একটু বেশি যদিও। বারিক জানে, এই বইয়ের পাইকার তারে এগুলো আড়াই টাকা দরে দিয়ে গেছে। বইয়ের গায়ে দাম লেখা আছে, বারো টাকা মাত্র। কিন্তু বারিক পাঁচ টাকা কি ছয় টাকায় ছেড়ে দেবে। সে জানে এরা কিনবে। এখনই দরদাম করতে শুরু করবে। কী বলবে, আরও আছে? থাকলি দেখান। বারিক তখন একজনকে তার কাছে আসতে বলবে। তারপর উপরে রাতের রজনীগন্ধা, তারপর মায়ামৃগ তারপর হয়তো আনোয়ারার তলে এই রকম বইয়ের আরও দুটো কপি তাদের দিকে দেবে। এইটুকু সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কোর্ট চত্বরে পুলিশ, পুলিশের সেপাই আর টিকটিকির অভাব নেই। কেউ কেউ বলে, ওই রহম পাগলও পুলিশের লোক। যদিও তা কোনওভাবে সত্যি নয়। রহম কোনও গোয়েন্দা হতে পারে না। তবে, রহম একদিন তাকে আর মোসলেমকে বলেছিল, তার সঙ্গে এইখানে বছর খানেকের জন্যে যে আর একজন পাগল এসে জুটেছিল, সে গোয়েন্দা। রহম দেখেছে, সেই লোক একা একা রাতের অন্ধকারে কোর্ট বিল্ডিংয়ের ওই টেমি বারে আলোয় কী সব লিখত। তারপর রাত থাকতেই ফেলে দিয়ে আসত পোস্টাফিসের লাল বাক্সে। রহমকে পুলিশরা কখনও কখনও ফাও কথা বলেছে, কিন্তু সেই লোককে কখনওই কিছু বলেনি। যদিও বারিক-মোসলেম মনে করে, এই সবই রহমের বানানো গল্প। সেই সময়ে রহমের মাথা একটু সুস্থ। এতদিনের পরে নিজের কল্পনার কিছু কিছু সবাইকে বলতে শুরু করেছে। সে মনে করেছে, সেই পাগল গোয়েন্দা, সরকারের লোক–এইসব বললে সবাই রহমকে কিছুটা হলেও পাত্তা দেবে।
লুকিয়ে বই দেখানো, তারপর সেই বই পুরনো খবরের কাগজে মুড়িয়ে গ্রাহকের হাতে গছিয়ে দিয়ে বারিক আবার চোখ বোজে। মনে মনে ভাবে, এসব বইয়ের গ্রাহকই তার ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখবে, পেটে ভাত দেবে। ওইসব নোভেল তো শহরের বইয়ের দোকানেও পাওয়া যায়। তাই, বেলা একটু গুটিয়ে আসলে, বারিকের আধবোজা চোখ জোড়া একটু যেন খোলে। সে জানে, এখন যারা আজকের মতো কোর্টের কাজ সারল, কিন্তু সব কাজ সারা হয় নি, কোনো হোটেলে থেকে যাবে, তাদের কেউ কেউ তার দোকানে আসবে। কোনও কোনও দিন বেশ কজন আসে। তখন দোকান প্রায় গোটানোর সময়। বারিক জানে, তারা কিনবে। সে দাম একটু কমিয়ে বলে। যদিও বারিক এরপর আরও কল্পনা করে, ভাবির সঙ্গে মধুর রাত পড়তে পড়তে সেই লোকটি নির্জন হোটেল রুমে কোন কল্পনায় তলিয়ে যাবে। সেখানে কী ঘটতে পারে, তাও যেন তার জানা আছে।
কিন্তু এখন যখন সুকুমার ছোঁকরা তার সহজ জাদু শিক্ষার বইখানা নিয়ে ওই কথা বলল, তাতে হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ল মোসলেম আর ইব্রাহিম, সেই হাসি বারিককেও একটু ছুঁয়ে গেল। বারিক জানে কথাটা কিছু ভুল বলেনি সুকুমার। ও ছোঁকরা খেলাঅলা, জাদু কিছু জানে, এইসমস্ত বই কম বেশি হাতিয়ে দেখেছে।
ওই হাসির দমকের ভিতরে ইব্রাহিম জানতে চায় এই বই কেনে কারা?
বারিক নীচু গলায় মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলে, ওগুলো বেশির ভাগ স্কুল কলেজের ছেলেপেলেরাই কেনে? আর কেনবে কারা?
বড়ো মানুষরা কেউ কেনে না?
কেনে, কেউ কেউ কিনে বাড়িঘরে যাইয়ে কোনও কোনও সময় মনে হয় বেয়াই-বেয়ানগো খেলা দেখায়!
ও কা, সে খবর আপনি জানলেন কোয়ানদে? তারপর সুকুমারের উদ্দেশ্যে বলে, দেখিচো, কাকারে যেরাম ভাবিলাম সেরম না। রস আছে কতায়।
মোসলেম উদ্দিন তার সমবয়েসি বারিকের উদ্দেশ্যে একটা হাঁকমতন দিল, এ বারিক, পোলাপান কী কতিচে? ওরা জানে তোমার রস? বলে, বারিকের দিকে তাকিয়ে হাসল। হাসলে মোসলেমকে সুন্দর দেখায়। দাঁতগুলো তার খুব সুন্দর। চকচকে। সাধারণ লোকটা হাসে না, কিন্তু এই যে হাসল, হেসে বারিককে আরও জিজ্ঞেস করল, ওরা জানে খেড় কারে কয়? মানুষের কথা দিয়ে কী কইরে হাসাতি হয়?
