বারিকের নীল পলিথিন লাছা বইয়ের দোকানের ছাউনিও নীল, সূর্যের আলোয় নীচে নীলচে ছায়া পড়েছে। মোসলেম বারিকের দোকানের পাশে বসে একটা বিড়ি ধরাতেই ইব্রাহিম বলল, বড়দা, আইজকে মানুষজন আছে, কিন্তু পাবলিক নেই।
সুকুমার হাসল, আপনি কথা জানেন ভালোই, ইব্রাহিম ভাই!
কথা বেচেই খাই। কিন্তু তোমার মতন কলেজে যাওয়ার সুযোগ হলি আর এট্টু কথা জানতাম–
মোসলেম বারিকের কাছে কিছু-একটা জানতে চাইলে, সে সময় ইব্রাহিম ওই কথাটা বলে। এবার মোসলেম তার কাছে জানতে চায়, পাবলিক নেই, মানুষ আছে? তোমার কথা তো কিছু বুঝদি পারি না!
কী যে কন, মানুষ মানে মানুষ, এই যে গিজগিজ করতিচে মানুষ কিন্তু আমাগো মজমা শোনার কোনও পাবলিক নেই।
ও-ও, কথাটা যেন মোসলেমের জন্যে একটু দূরবর্তী। বুঝেছেও, কিন্তু একটু সরু চোখে সে ইব্রাহিমের দিকে তাকাল, আরে ট্রেন নিয়ে শহরে কত কিছু হইয়ে যাতিচে। ছাত্ররা কহোন মিছিল নিয়ে আসে। আমলিগ-বিএমপির কতজন নেতার নামে নাকি অ্যারেস্টের অর্ডার হবে। ছাত্রগো কারে কারে আটকাইচে–
সে তো জানি।
তালি? কোর্টে মানুষ আসে, কিন্তু এই সব মানুষের কেস নিয়ে ভিড়, তার মদ্যি আমাগো এইয়ে শুনতি আসতিচে কেডা। তিনদিন আগে তোমার ভাবিরে পাউডারের প্যাকেট বানানোর মাল মশলা কিনে দিচি। চলে কোনও মাল? নতুন মাল আনাই লাগে না।
সুকুমার বারিককে বলে, ও বড়ো ভাই, নাকি কাকা, কী যে ডাকিলাম ঠিক নেই? তার এই ডাকে বারিক তার প্রায় সব সময় মুদে থাকা চোখটা একটু মেলে সুকুমারসহ সবাইকে দেখে। সুকুমার সেই সুযোগে বলে, আপনার এই বই মানষি কেনে?
ইব্রাহিম বলে, কেন কেনবে না? কত মানষি কেনে। এই জায়গায় দাঁড়ালে দেখা যায়। তাছাড়া না কিনলি কাকা এইরাম বই সাজাইয়ে রাখে?
সুকুমার একে একে বইগুলো দেখে। নাম পড়ে। একটার উপর একটা থাকে থাকে সাজানো বই। প্রায় সবগুলোই পাতলা পাতলা। এই ধরনের বই সে বাড়িতে দেখেছে। উপরে লেখকের ছবি। শরৎচন্দ্রের চন্দ্রনাথ, দেবদাস, দত্তা। তারপর ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের চিতা বহ্নিমান, শাপমোচন, আছে বিষাদ সিন্ধু। আর চাষাবাদ নিয়ে কিছু বই। এইসব বইয়ের পাশে ও নীচে আছে। একটু অন্য ধরনের বই, সুকুমার জানে। তবে, এরপাশে বশীকরণ বিদ্যা আর জাদু শিক্ষার বই দেখে সে হাসে।
সুকুমার বলে, এই দেখি বশীকরণ করার বই। এই বই কিনলি আর মাইয়ে মানুষ পটাতি কোনও সমস্যা হবে না।
সুকুমারের একথা শুনে ইব্রাহিম তার দিকে তাকায়। তারপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঘুরিয়ে দেয়। মোসলেম উদ্দিনের দিকে। যেন ইব্রাহিম চায়, সুকুমারের এই কথা শুনে মোসলেম কিছু বলুক। মোসলেম তাই বললও, ও বই তোমার দেকতি হবে না। ও বিদ্যা তুমি এমনিতেই খারাপ জানো না।
কথাটা সুকুমার গায়ে মাখল না। মুহূর্তে ঝিলিককে মনে পড়ল তার। ঝিলিক কাল চলে গেছে মোড়েলগঞ্জ। বলে গেছে, দুই-তিন দিন বাদে আবার আসবে। দুই দিন তার সঙ্গে ছিল। তাই মোসলেম উদ্দিন এখন ওই কথা বলল। কিন্তু যদি জানত, ঝিলিক কেন এসেছিল, আবার কোথায় গেছে, আবার কেন আসবে, আর তার কী হয়? এটা সত্যি ঝিলিককে সুকুমারের সঙ্গে দেখা গেছে, কিন্তু সুকুমার কারও সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়নি। এখানে ওই পরিচয় টরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনও বালাই নেই, তবু একটা মেয়ে মানুষ তার সঙ্গে, কিছু একটা তো তার হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু তাও না, সুকুমার কারও সঙ্গে ঝিলিকের কোনও যোগাযোগ যেন হতে দেয়নি। শুধু জরিনা আগেই চিনত ঝিলিককে, একদিন তার দেখা হয়েছিল, সে-ই ঝিলিককে দেখে কথা বলেছিল, তারা দুজন দীর্ঘক্ষণ বসেছিল নদীর কূলে। কাছেপিঠে তখন আজগর আর সুকুমারও ছিল, কিন্তু সেকথা এখন। এখানে জানানোর কী দরকার। যদি জরিনার কাছে থেকে তারা কিছু জানতে পারে তো জানবে। যদি আবার আসে তো দেখবে। সুকুমার এখন ওকথা মনে করতে চায় না। তবে, ঝিলিকের মুখোনা তার মনে পড়ল আবার। সে অবশ্য অনেক কারণে।
ইব্রাহিম বলল, এই যে জাদু শিক্ষা, সুকুমার তোমার লাগবে? বারিক কাকার কাছে কী সমস্ত বই আছে দেখিচো!
সুকুমার বলল, ওই বইয়ে কী আছে তাও আমার জানা আছে, কন আপনারা?
মোসলেম আবার বলে, জানা তো আছেই। জানা না-থাকলি তুমি জাদু দেখাও কী কইরে!
সুকুমার হা-হা শব্দে হাসে। হাসলে ছেলেটা বেশ দেখায়। বারিক তার তন্দ্রা ভেঙে সুকুমারের মুখোনা দেখল।
ইব্রাহিম তার হাসির কারণ জানতে চাইল, কেন কী হইছে?
এত লেখা, একখানা ছুরি দিয়ে জবা ফুল কাটার পরে, তারপর সেই ছুরি দিয়ে লেবু কাটলি লাল রং বের হয়!
কেন খাটে না? বের হয় না?
আরে অল্প এট্টু লাল হয় লেবুর রসে! ওই বই পইড়ে জাদু দেখলি আর মাইর মাটিতে পড়বে নানে।
এসব বলতে বলতে তারা লক্ষ করে দোকানে তখন কোনও খদ্দের আছে কি না? খদ্দের থাকলে তারা অবশ্য এমন কথা বলত না। এখন এই তিন জন বাদে বারিকে দোকানের সামনে কেউ নেই। থাকতে পারত, সাধারণত কোনও মজমা না-থাকলে দুই চারজন বই হাতানো খদ্দের বারিকের দোকানে থাকে। তাদের কেউ কেউ কখনও কখনও দুই-একখানা বই কেনে। এমনকি একসঙ্গে চার পাঁচখানা বইও কেউ কেনে। তবে বারিকের সহযোগীরা যেমন জানে, বারিক তো তেমন জানেই, কেউ কেউ আছে বারিকের দোকানের আশেপাশ দিয়ে ঘুর ঘুর করে। সামনে বসে। বই হাতায়। শরৎচন্দ্রের দেবদাস হাতে নেয়, সঙ্গীকে বলে, এর কাহিনি। বুলবুলের দেবদাসে অভিনয় দেখেছে। পাশের জন হয়তো জানায়, সেও দেখেছে, তবে তার কোন আত্মীয় আছে ইন্ডিয়ায়, সেই আত্মীয় বলেছে, দেবদাস দিলীপকুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছে, সেটি হিন্দি। প্রথমজন তখন বলে, কখনও ইন্ডিয়ায় গেলে সে দেখবে। দ্বিতীয়জন জানায়, সে বহুত পুরোনো বই। এখানে বই অর্থাৎ ছায়াছবি। তাদের হাতে দেবদাস, সেটাও বই, আবার বুলবুল আহমেদ ও কবরী আর দিলীপকুমার ও সুচিত্রা কেন অভিনীত দেবদাস ছায়াছবিও বই। অন্যজন তখন ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের শাপমোচন বইখানার উপরের পাতলা কাগজের প্রচ্ছদে দুই রঙা সুচিত্র-উত্তমের ছবি দেখিয়ে বলে ওই যে সুচিত্রা সেন। কিনবি নাকি শাপমোচন? প্রথমজন ডাইনে-বামে মাথা নাড়ে। কিনবে না।
