জমবে কীভাবে? এই কোর্টের উকিলদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বড়ো উকিলদের কেউই সরকারি দল করেন না। ট্রেন নিয়ে ছাত্রদের এই আন্দোলন খুবই যৌক্তিক। কলেজে একটা স্টেশন আছে, সেই সামন্তসেনা-বাহিরদিয়া-মূলঘর-ফকিরহাট থেকে ছাত্ররা যে পড়তে আসে তা তো এই ট্রেন লাইন ধরেই। মূলঘরের এদিকে পরে খানজাহানপুর-যাত্রাপুর-ষাটগম্বুজ এলাকার মানুষজন আর ছাত্রছাত্রী সবাই শহরে আসে এই রেললাইন ধরে। আর, ইব্রাহিম হোক আর আজগর হোক, হোক সুকুমার কি মোসলেম উদ্দিন, এমনকি দিলদার–কে আছে যে জীবনে একবার আধবার রেল স্টেশনে মজমা মিলায়নি। তাছাড়া রেলগাড়ি চলে সারাটা বছর, কোন দিন কামাই নেই, বিরতি নেই, কিন্তু কোর্টও তো বন্ধ থাকে। তখন তাদের একমাত্র সহায় রেল লাইন, রেল স্টেশন। ওই জায়গায় গিজগিজে মানুষ, এই আসে এই যায়, কারও তাড়া আছে কারও নেই। একটু খোলা জায়গা পেলে তখন হাউশ মিটিয়ে ক্যানভাস করা যায়।
কিন্তু এর ভিতরে তো এই কথাও শোনা যায়, এই রেল লাইন তুলে দেয়ার পিছনে বাস মালিকদের একটা ভূমিকা আছে। তারা চায় না এই রূপসা-বাগেরহাট লাইনে আর ট্রেন চলুক। ট্রেনে বেশির ভাগ মানুষ মাগনা যায়। টিকিট কাটা লাগে না। ফলে বাসে কোনও মানুষ ওঠে না।
বাসের রাস্তা আগে ট্রেন লাইনের প্রায় পাশ দিয়েই ছিল। এখন পিরোজপুর মোংলা রোডের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন রাস্তা হয়েছে। এই রাস্তার নাম মানুষের মুখে, সিএন্ডবি রোড। সে-রাস্তা অনেক বড়ো। এদিকে দড়াটানা ঘাটে ফেরি, পার হয়ে পিরোজপুর যেতে হয়, ওদিকে রাস্তা মিলেছে মোংলা-খুলনা অথবা মোংলা রূপসা রোডের কাটা খালিতে। মোংলা-খুলনার রাস্তা আরও সুন্দর।
এসব কথা যেমন শহরবাসীর জানা আছে, জানা আছে এই কোর্টের এলাকার মানুষজনদের। এও জানা আছে, এই ট্রেনের পিছনে সরকার আর ভর্তুকি দিতে পারছে না, তখন কলেজের ছাত্ররা এক-দুই দিন ট্রেনের টাকা তুলে দেখিয়েছে, সরকার চাইলে কত টাকা তুলতে পারে।
কিন্তু তারপরও সবার মনে হচ্ছে, ট্রেনটা থাকবে না। এরশাদের এবার ট্রেনটা উঠিয়েই নিয়ে যাবে। এ প্রায় একশ বছরের এই রেলপথ তখন একলা একলা শুয়ে থাকবে। যতদূর চোখ যায়, শুধু তখন সমান্তরাল এক জোড়া রেল লাইন শুয়ে আছে। আর এ-ও শোনা যায়, একদিন এই কোর্ট চত্বরও এখানে থাকবে না। তাও চলে যাবে ওই সিএন্ডবি রাস্তার কাছে, চলে যাবে কোর্টের পাশের এই জেলখানাও। তখন এই কোর্ট চত্বর আর ওই জেলখানা তখন শুধুই দালান, এই এলাকা তখন সারাটা দিনমান খা খা করবে।
এই খা খা করার কথাটা অবশ্য মোসলেম উদ্দিন বলে। সঙ্গে এও যোগ করে, সেদিন এমন দিন আসবে, কোর্টের সামনে এই ক্যানভাস শোনার লোকই থাকবে না। আর, ওই যে জায়গায় কোর্ট হবে সেখানে তো ধানক্ষেত, এত সুন্দর মানুষ চলাচল বাজার, লঞ্চঘাট, এইসমস্তর জায়গা সেখানে কী করে হবে।
এসব বলতে বলতে মোসলেম উদ্দিন তার হালকা দাড়িঅলা মুখোনা বিষণ্ণ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে, ভালোই হবে, ততদিন সে বাঁচবে না, বাঁচলেও ক্যানভাস করার বয়েস থাকবে না, তাই ওইসব কোনও কিছুই তাকে দেখতে হবে না।
কিন্তু এ কথায় ইব্রাহিম হোক আর সুকুমার হোক তারা দমকে কেন? এখনও তাদের কাছে জীবিকা মানে কোর্টের সামনে এই ক্যানভাস। যদিও সুকুমার জানে, সে যে সব খেলা দেখাতে জানে, কোনও সার্কাসের দল তাকে ডাকলে চলে যাবে। যেতে সে চায়, কিন্তু সার্কাস চলে সেই শীতকালের দিকে। বাকি সময় হাতে কাজ না থাকলে সে খাবে কী? তারে সারা বছরের খোরাকি দিয়ে কোনো সার্কাস পার্টি রাখবে না। ফলে, এইরকম কোর্টের সামনে খেলা দেখিয়েই তাকে চলতে হবে। তবে, খুলনায় থাকতে সুকুমারের আয় রোজগার আরও ভালো ছিল, সঙ্গে একটা ছেলে ছিল, তাকে আঁকার ভিতরে ভরে খেলা দেখাতে পারত, এমনকি মজমা ভালো হলে কখনও কখনও দেখাত ছুরি মারার একটা খেলা। চত্বরে রক্ত, মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকত। একটু পরে অক্ষত ছেলেটি বের হয়ে আসত ঝাঁকার নীচ থেকে। পয়সা ঢালত পাবলিক। এখন সুকুমারকে দেখাতে হয়, হাতের কারসাজি, সে একজনেরই খেলা; কখনও কখনও ভিড়ের থেকে সে কাউকে ডেকে নেয়।
মোসলেম উদ্দিন ইব্রাহিম আর সুকুমারের সঙ্গে বসেছিল বারিকের বইয়ের দোকানের পাশে, বড়ো অশত্থ গাছটার নীচে। এখানে একপ্রকার আড্ডা জমেই। বারিকের বেচাকেনা কম, তার আশেপাশে প্রায় সবাই ক্যানভাসের পোটলা-পুটলি মালপত্তর রাখে। কেউ রাখে একটু তফাতে, এমন জায়গায় যেন তাও বারিকের চোখের আয়ত্তে। চোখের আয়ত্তে না-রাখলেও তো কোনও সমস্যা নেই, ওগুলো এমন না যে কেউ নিয়ে যাবে। নিলে যারা চেনা জানা, তাদের মতন এখানকারই মানুষ, তারাই নেবে। বাইরে লোক, যারা এই আসছে যাচ্ছে–এগুলোয় কোনও ভাবেই হাত দেবে না। তাদের প্রয়োজন যেমন নেই। তাছাড়া, একটু দূরত্ব থাকলেও এইসব ক্যানভাসারের প্রতি তাদের প্রত্যেকেরই একপ্রকার জড়তা আছে। কেউ কেউ কাছেপিঠের গ্রাম-গাঁ থেকে আসে। শোনে এই কোর্টের সামনে পকেটমার টাউট বাটপার বেশ্যার দালাল থেকে শুরু করে জমির দালালসহ উকিল মুহুরি কি জজর সঙ্গে যোগাযোগ করারও লোকজন থাকে। কেউ জানে, এইখানে আসলেই পকেট উজাড় হয়। কেউ জানে, এইখানে আসলে পকেট কাটাও যায়। মজমা-আসরে ক্যানভাসের সময় ক্যানভাসাররা তা বলেও। হঠাৎ হঠাৎ আসরে সবাইকে সাবধান করে দিতে তারা বলে, পকেট সাবধান। শুধু আজগর একটু কায়ন্দা করে বলে, পাকেট সাবধান। আজগর কেন পাকেট বলে, সেই জানে। যদিও মোসলেম আজগরের এই পার্কেট বলা নিয়ে সবাইকে জানায়, কোন এক উড়ে মালি নাকি আজগরকে বলেছিল, পাকেটে নেই টাকা কেমনে যাব ঢাকা। তারপর থেকে আজগর বলে, পাকেট! অথচ তারা জানে, তারা এটা বলে মানুষকে সাবধান করে দেয়ার জন্যে। ওদিকে, আসরে উপস্থিত গ্রাম-গার মানুষজন মনে করে, আসলে পকেটমারদের সঙ্গে এই ক্যানভাসারদের যোগাযোগ আছে, তাদের এই আসরে সবাই যখন মশগুল তখন তাদের পকেট থেকে পয়সা হাতায় পকেটমাররা। কিন্তু এতই যদি যোগাযোগ থাকবে, তাহলে মোসলেম এই কয়দিন আগে এক পকেটমারকে ধরে থানায় নিয়ে গেল কেন?
