আজগর নীচু গলায় বলল, তুমি নাবা না?
রুটি কিনে আইনে। তুমি তালি ওঠো। যাও, নাইয়ে আসো–দেইহেহানে তারপর শরীলডা ভালো লাগবে। আর কাশপা নানে-
কথাটা মন্দ বলেনি জরিনা। তা যাবে। হাঁটু মোড়া থেকে কাতরানো শব্দ করে আজগর উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে কোথায় গামছা, কোথায় কী? লম্ফে নেই কেরোসিন। আনার দরকারও নেই। জরিনা দাঁড়িয়ে থাকে। আজগর জানে, সে নাইতে ডাকবাংলো ঘাটের দিকে না যাওয়া পর্যন্ত জরিনা দাঁড়িয়ে থাকবে। ঝুপড়িতে হাতাতে হাতাতে আজগর গামছা পায়। জামাটা খুলে দরজায় ঝুলিয়ে রাখে। তারপর খালি গায়ে ডাকবাংলো ঘাটের দিকে রওনা দেয়। যাবার সময় গলায় বেশ দরদ দিয়ে বলে, যাও তয়। এই দেহো আমি নাইতে যাইতেচি।
জরিনা বলে, যাও। বলে জরিনার বেশ ভালো লাগল। যতই কোক, গালমন্দ করুক, লোকটা কথাও শোনে। তা শোনে। মনে কত দুঃখ নিয়ে আজ এই বান্দর নাচাইয়ে খায়। সেই দুঃখের কথা কেউরে কয় না। কখনও কখনও জরিনাকেও না। শুধু পেটে শালসার বোতলের পানি পড়লেই মুখ খুলে যায়।
হাফেজের রুটির দোকান একটু এগোলেই। সেখানে পৌঁছে জরিনা দেখে নদীর কূলে দাঁড়িয়ে আছে সুকুর আর ঝিলিক!
আজগর ফিরে এসে দেখে জরিনার সঙ্গে বসে আছে তারা।
০৫. কোর্টের সামনের ক্যানভাসার
এই কোর্টের সামনের ক্যানভাসারদের ভিতরে একটু উলটো ধাঁচের মানুষ ইব্রাহিম শেখ। জামা কাপড়ে আলাদা, আচরণেও। এমনকি চেহারা সুরতেও একটু ভিন্ন কিসিমের। যদিও মানুষটা বেচে ধ্বজভঙ্গের তেল আর মানুষ আটকে রাখার জন্যে শেখায় সাপে কাটলে সেই রোগীকে কীভাবে সুস্থ করতে হবে।
ইব্রাহিম শেখের পরনে থাকে বেলবটম প্যান্ট, ফুলহাতার এক রঙা শার্ট, পায়ে কালো চকচকে অক্সফোর্ড জুতো। সেই শার্ট সাধারণত সাদা অথবা একটু নীলচে। এখন অবশ্য বেলবটম প্যান্টের যুগ বা হুজুগ দুটোই গেছে। রাজ্জাক পরে না, আলমগীর পরে না, সোহেল রানাও পরে না, জাফর ইকবালের তো পরার প্রশ্নই ওঠে না। ইব্রাহিম উচ্চতায় বেশ, প্রায় ছ-ফুটের কাছাকাছি, তাই তার পোশাকে অনুকরণ একটু নায়ক আলমগীরের দিকে। যদিও, এখন নয়া আর পুরোনো ভদ্দরলোকরা সবাই প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাফারিতেই অনুসরণ করে। কিন্তু ইব্রাহিম তলে তলে এরশাদকে দেখতে পারে না। কেন পারে না, কেউ জানে না। তার সহযাত্রী ক্যানভাসারদের কারও এরশাদই হোক আর জিয়াই হোক কিছুই আসে যায় না। এ বিষয়ে তারা কিছু তেমন বোঝেও না। একমাত্র ব্যতিক্রম মোসলেম উদ্দিন। মোসলেম জিয়া-এরশাদের নামই শুনতে পারে না। তাদের এক জন প্রেসিডেন্ট ছিলেন অন্য জন প্রেসিডেন্ট আছেন, এসব কথা বললে সে বলে, শেখসাব বাইচে থাকলি এইসব চৌকিদার-দফাদার-লাঠিয়ালগো কোনও খোঁজ থাকত না। তার ডাকে মানুষ যুদ্ধে গেইচে। এই কথায় অবশ্য ইব্রাহিমই সমর্থন জানায়। যদিও ইব্রাহিম কি সুকুমার সবই তার হাঁটুর বয়েসি, শেখসাবের রাজনীতির কিছুই তাদের জানা নেই। জানার যদি কিছু জানে আজগর। আর বারিক, সারাটা জীবন সে ওই চোখ জোড়া অমন তন্দ্রায় তালিয়ে দিয়ে কাটিয়ে দিল। এর মাঝে বছর সতের আগে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তার ওই তন্দ্রায় মনে হয়, তখন সারাটা সময় সে এই বটগাছের নীচে বসেই কাটিয়ে দিয়েছে।
ইব্রাহিম অবশ্য এসব কথা একমাত্র মোসলেম ছাড়া কখনও কাউকে বলেনি। একটু নিজের মতো থাকা মানুষ। আয় রোজগার ভালো। সেটা যে ভালো তা তার পোশাক দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তুইব্রাহিম শেখ মানুষটা একটু আলাদা বটে। সেটা আজগর জানে, জানে অন্যরাও।
যদিও ইব্রাহিম মজমা মেলায় মঘা ওষুধের। কোর্ট চত্বরে কি এখানে আগত মানুষজন। যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধকে মঘা ওষুধ বলে। এমনকি ইব্রাহিম যত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ভাব নিয়ে চলুক না কেন, একটু দূর থেকে হেঁটে যেতে লাগলে, তাকে কেউ কেউ হাত তুলে দেখায় : ওই যে মঘা যায়। ইব্রাহিম কখনও কখনও তা শোনে, মাথার বাবড়ি দুলিয়ে পারলে চকিতে সেদিকে তাকায়, বুঝলে পারলে যে বলছে তাকে দেখে, না চিনতে পারলে একটু মচকি হাসে। লম্বা একাহারা মানুষের ভিতরে হয়তো একটা বিনয়ী ভাব থাকে, ইব্রাহিমের ভিতরে সেটা আছে। কোনওপ্রকার অসন্তোষ নেই তার আচরণে, এমনকি নেই স্বভাবে কোনও খিটিমিটি ভাব। এমনিতে গলা উঁচু করে প্রায় কথাই বলে না, সাধারণ গলার স্বরও একটু চাপা, কিন্তু আসরে দাঁড়ালে কে বলবে এই ইব্রাহিমের গলায় এত জোর। কোত্থেকে সে গলা কাঁপিয়ে এইভাবে কথা বলতে পারছে। তার তেল দেওয়া বাবড়ি চুলের এই দোলানিতে চটক যে কোত্থেকে আসে!
গতকাল, গত পরশু আর তারও আগের দিন, এই চত্বরে মজমা মিলেছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কারওই লাভের লাভ তেমন হয়নি। অথচ লোক সমাগমে কোনও কমতি নেই। ট্রেন নিয়ে একটা ঝামেলা চলছে, তাতে গোটা শহর উত্তাল। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাগেরহাট-রূপসা রেল লাইনের ট্রেন তুলে নেবে। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে দেন দরবার করবেটা কে? শহরের অনেকেই সরকারি দল করে। তারা তো এ নিয়ে কোনও কথা বলবে না। ওদিকে যারা এখনকার বিরোধী দল, তারাই শহরের রাজনীতিতে ভারি, কিন্তু ট্রেন নিয়ে আন্দোলনে তাদের অনেকের নামেই কেস হয়েছে। ওদিকে কলেজের ছেলেরা কোনওভাবেই এই ট্রেন তুলে নিতে দেবে না। ট্রেন উঠে গেলে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে। এই নিয়ে আন্দোলন। কোর্ট চত্বরে বারবার ছাত্ররা আসে মিছিল নিয়ে, ডিসির কাছে স্মারকলিপি দেয়। ফলে, চত্বরে লোক সমাগম হয়, কিন্তু ক্যানভাসারদের আসর কোনওভাবেই জমে না।
