জরিনা একটু খেঁকিয়ে জানতে চায়, কী হইচে তোমার, কাশো কী জন্যি?
আজগর কোনও উত্তর দিল না। মাথাটা নীচের দিকে ঝুঁকিয়ে যেভাবে বসেছিল, সেভাবেই বসে থাকল। জরিনা যে কিছু জিজ্ঞাসা করেছে, তাও যেন এখন তার কাছে যেন পাত্তা দেওয়ার মতো নয়। তাকে কাশতে দেখলে জরিনা গলা অমন কর্কশ করে, আজগরের জানা আছে।
আজগর উত্তর না-দিলেও উঠে গেল। জরিনা নদীর কূলের কাঁচা রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে। আজগর যেন জরিনাকে দেখেইনি। সোজা হেঁটে একটা দোকান থেকে এক ঠোঙা মুড়ি আর চারটে কলা কিনে নিয়ে এল। ঝুপড়ির সামনে আসার আগে দুটো কলা দিয়ে এল বাঁদর দুটোকে। পাশে ঢালল কিছু মুড়ি। তারপর ঝুপড়ির সামনে আসতে আসতে জরিনাকে বলল, খাবা? খাইলে নেও। বসে পড়ে একটা কলা ছালতে লাগল, বাকিটা পাশে রাখল। ঠোঙা থেকে মুড়ি তুলে মুখে দিয়ে, কলায় কামড় দিয়ে আবার জরিনাকে বলল, কী কই, কতা গায় লাগে না?
জরিনা একটু অবাক হল। একটু আগে তাহলে লোকটাকে গালমন্দ করছিল কেন? তার জানা আছে, মাতালের স্বভাব তো কোনওকালে যায় না। সব সময়ই বলে এসেছে, কাশির দমক থামানোয় ওই জিনিস হল একেবারে ওষুধ! আইজ ওই ওষুধ খাবে না। নাকি এখন এই কলা-মুড়ি খেয়ে একটু বাদে হেলে দুলে যাবে কর্মকার পট্টির দিকে?
নিজের কলাটা ছুলতে ছুলতে জরিনা আজগরকে বলে, জানো, ওই যে সুকুমারের সাথে যে বিটিরে দেকলাম, তারে আমি চিনি!
সে তো তোর চোখ দেইকা তখন বুজজি!
কিন্তু সে সুকুমারের চেনে কী কইরে?
তোগো মতন মাইয়েগো মানুষ চিনতি সময় লাগে নাকি?
সব সময় এক কতা। আমাগো মতন মাইয়ে মানুষ। কী আমাগো এট্টা দুধ বেশি গজাইচে নিকি?
সেয়া গজাইলেও মন্দ হইত না। বাইর কইরগা মাইনষেরা দেহাইয়া বেড়াইতে পারতি!
খালি ফাও কতা যত। তোমার তা খাতিও আমার ঘেন্না করে!
তাইলে খাইস না।
এবার জরিনা একটু এগিয়ে এল। গলাও একটু নামিয়েছে, কেন, খালি ফাও কতা কও কেন?
অন্ধকারে আজগর জরিনার দিকে চায়। এই খোটা দেয়া কথা বলার পরও তো ঢঙ করা কমে। কত রঙ্গ জানে যে জরিনা।
জরিনা বলে, কীভাবে চিনি সেয়া শোনবা না?
শোনবানে। তুই কি তারে খুঁজদি গেচেলি? পাইচো?
না, পাই নেই।
তালি চুপচাপ বইসে থাক। সুকুমারের পাইলে সব জানতি পারবি–
তা পারব। তয়, একবার ফকিরহাট স্টেশনদে একসাথে ভ্যানে আইলাম। সাতে ঝিলিকের স্বামী আর ছল। ঝিলিক হিন্দু, মাথায় এই জায়গায় সিন্দুর দেয়া, হাতে শাখা। কী বৃষ্টি সেদিন! কোন জায়গায় জানি টেরেন পইড়ে গেইল লাইনেদ-
বোঝলাম তো। সুকুমারের পাইলে সব জানতে পারবি!
জরিনা যতই উৎসাহের সঙ্গে বলুক, কোনওভাবেই বুঝতে পারছে না, কেন আজগর তার কথার গুরুত্ব দিচ্ছে না। এতদিন পরে দেখা। কী সমাচার। গেরস্ত ঘরের বউ, কেন এই জায়গায়?
তা অবশ্য এর কিছুক্ষণ বাদেই জানতে পারে জরিনা। ততক্ষণে আজগরের কাশির দমক কমেছে। আজগর ঝুপড়ির দরজায় বসে ঝিমায় যেন। জরিনার দিকে খেয়াল নেই, এমনকি রাতে কী খাবে, কোথায় খাবে তা নিয়েও ভাবনা নেই। আজগর এ রকম ঝিম মেরে থাকার বিষয়টা জরিনা কিছুটা হলেও বোঝে। আসলে, তলে তলে ধান্দা, ভাবছে যাবে নাকি একবার কর্মকারপট্টির দিকে। যদিও আজ আজগর সেই দিকে যেতে পা বাড়ালে জরিনা ঠিক করে রেখেছে, সে বাধা দেবে। কিন্তু আজগর কিছুই বলছে না। ঢাকার লঞ্চটায় আলো জ্বলে গেছে। আর হয়তো কিছুক্ষণ বাদে ছাড়বে। লঞ্চঘাট কিছুটা আলোকিত। জরিনা আর আজগর বসে আছে অন্ধকারে। জরিনা ভাবে, লোকটার কাছে জানতে চাবে নাকি তার ধান্দা কী? এমন মেরে বসে আছে কেন? যদিও সে জানে, আজগর কখনও কখনও এ রকম ঝিম মেরে বসে থাকে। এখনও তাই বসে আছে। নাকি সে এখান থেকে সরলেই যাবে ওই শালসার বোতলের খোঁজে।
জরিনা এবার জানতে চায়, কী? রাত্তিরে খাওয়া-টাওয়া লাগবে না? নাকি সারা রাত্তির এই জায়গায় বইসে মশা মারবা?
আজগর পয়লা চুপ করে থাকে। আবার কাশে। সে বোঝাতে পারছে না, কোনওভাবেই শরীরটা ভালো লাগছে না তার। অন্ধকারে একবার জরিনার দিকে মুখ তুলে চেয়ে হাসল। তারপর জরিনার কথা ঘুরিয়ে দিতেই যেন বলল, আইজ আমারে এহেবারে কাবু বানাইয়ে দেলা।
হইচে–বুড়ো হাড়ে কত সাধ তোমার! কিন্তু এহোন ওই কতা কলি পেট ভরবে না। খাইয়ে ঘুম দেও আবার!
যাও তয়। ওই লালির দোকানদে রুটি নিয়ে আসো। সাতে লাচড়া আইগো।
আনবানে। তুমিও চলো।
আমি যাইতে পারলে তোরে যাইতে কই?
আমি রুটি আনতি গেলিই তুমি শালসা টানতি যাবা!
না, যাব নানে।
আজগর জরিনাকে রুটি আনতে টাকা দেয়। জরিনার তাও কেন যেন মনে হয়, সে নদীর কূল ধরে নাগের বাজারের দিকে এগোলেই আজগর এ জায়গা থেকে উঠে যাবে। অন্যদিন আজগর গেছে যাক, আজগর ওইসমস্ত খেয়ে কাঁদে, তাও সে জানে। কিন্তু আজ যেন না যায়। ও জিনিস জীবনে বেশ কবার জরিনাও খেয়েছে। খেতে মন্দ লাগে না। আজগরের সঙ্গেও খেয়েছে। মনটা খুলে যায়। একলা একলা তখন জীবনের কত কথা কইতে সাধ জাগে। কিন্তু এই গরমে? এই গরমে খাইলে আর উপায় থাকবে না। কাপড়-চোপড় খুলে বসে থাকতে হবে। পুরুষ মানুষ তবু খালি গায়ে নদীর কূলে হাওয়া খেতে পারে। তার মতন মেয়েছেলে?
আজগর রুটি আনতে উঠবে না বুঝে জরিনা বলে, তালি নদীতে এটা ডুব দিয়ে আসো। সেই সহালে নাইচো, তারপর আর নাওনি–সারাদিন যে গরম গেল!
