তবে লোকটা এবার একটু গা-ঝাড়া দিল। ছেলেটাকে ঝিলিকের কোলে দিয়ে নেমে গেল প্ল্যাটফর্ম থেকে। নেমে যেতে যেতে একবার তাকাল ফিরে ঝিলিকের দিকে। ঝিলিক তাতে হাসল, কেন জানি মনডা খারাপ!
জরিনা জানতে চাইল, কেন, হইচে কী?
যে নন্দেজামাইর বাড়ি যাচ্ছি, তারে মেটে চোখে দেকতি পারে না। কবে জানি আমার ছোটো ননদের হাত ধইরে টান দিল, তখন আমার বিয়ে হইনি, সেইর পরদে ওই লোকের বাড়িঘরে আর যায় না। এবার আমার ননদ আইসে কইয়ে গেইচে। কন সেই মোল্লাহাট পর্যন্ত গেইচে নিমতন্ন। করতি, ছেলের মুখেভাত, না গেলি দেখি হয়? উনি এই দেশে বড়ো মামা!
মুখেভাত বিষয়টা জরিনা বোঝে, কিন্তু তার সঙ্গে বড়ো মামার যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়টা তার জানা নেই। কিন্তু তার কথায় বুঝল, এই অনুষ্ঠানে তার স্বামীকে ঝিলিকই নিয়ে যাচ্ছে।
ঝিলিক এবার বিড়বিড় করল, এহোন ভ্যান কি পাবেনে? জানে কেডা!
পাবে। এহোনও তো রাত্তির হইনেই। তাছাড়া ভ্যানঅলারও জাইনে গেইচে—
হয়, পালি হয়।
আপনাগো পাইয়ে আমার খুব উপকার হল। কী উপকার তা কইয়ে বুঝোতি পারব না।
কী হল, আবার? আপনি একলা মানুষ, একভাবে না একভাবে কইলে যাতি পারতেন। ভিজদি ভিজদি গেলি তো এতক্ষণ ভ্যানে উইঠে প্রায় পৌঁছোইয়ে যাতেন।
তা যাতাম। কিন্তু কী কব–আমার ধারে আছে মোটে দুই টাকা–এইয়ে দিয়ে ভ্যানে নেত নাকি আমারে! যদিও জরিনা জানে, কথাটা সে ঠিক বলেনি। তার কাছে আরও চার টাকা, মোট ছয় টাকা আছে। সব এক টাকার নোট। ট্রেনে সে টিকেট কাটেনি। কখনওই কাটে না।
মোটে দুই টাকা নিয়ে বাড়িদে বাইরোইচেন? ঝিলিক একটু সন্দেহের চোখে জরিনার দিকে তাকায়। এমনিক তার জিজ্ঞাসার ভিতরে আছে অবিশ্বাস।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জরিনা কথাটা অন্য দিকে নিয়ে গেল, আমার আবার বাড়িঘর আছে নিকি?
এবার ওই আধো অন্ধকারে ঝিলিকের তার দিকে তাকানোটা বদলে গেল। সেখানে জরিনা কোথার মানুষ কেমন মানুষ তা যেমন, একইসঙ্গে যেন কিছু করুণাও। হয়তো একই সময়ে জানতেও চাইত কোথায় তার বাড়িঘর অথবা বাপের বাড়ি, আর বিয়ে-থা এইসমস্ত কিছু হয়েছে কি না। তখনই ঝিলিকের স্বামী তাদের ডাকে। দুই থাক সিঁড়ি ঝিলিক ছেলেটাকে কোলে নিয়ে নামে, তারপর তার স্বামী এসে ছেলেটাকে কোলে নেয়। নীচের দিকে বাকি আরও দুটো সিঁড়ি নামতে নামতে ঝিলিক জরিনাকে বলে, চলেন–
ঝিলিক খেয়াল করেছে, সে নামার সময় জরিনা দাঁড়িয়েছিল। তার স্বামী হয়তো শুধুই ঝিলিককে ডেকেছে। জরিনা তখনও নিজের সংকট কাটাতে পারেনি। জানে না, তারা তাকে সঙ্গে নেবে কি না?
তারপর ঝিরিঝির বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জরিনা ঝিলিক ও তার স্বামীর সঙ্গে ভ্যানে ওঠে।
তাহলে, জরিনা কখন জেনেছিল তার নাম ঝিলিক। ক্লাবের কাছে থেকে প্রায় একইরকম আধো অন্ধকারে, লঞ্চঘাটের নদীর পাড় পর্যন্ত হেঁটে আসতে আসতে জরিনা মনে করতে পারে না, সে কখন জেনেছিল তার নাম ঝিলিক। আজ মোসলেমের সঙ্গে কোর্ট চত্বরে ঢুকতেই দেখেছিল, মোসলেমকে বলেও ছিল, তারপর ওই যে সুকুমারের সঙ্গে এসে যখন ওদিকে চলে গেল, তখন তো তার দেখার কোনও ভুল ছিল না। তাহলে, নামটা জানল কখন?
সেটা এখন মনে না করলেও চলবে। এই জীবনে কত পদের মানুষের সঙ্গে দেখা, কত মানুষের সঙ্গে কত পদের রঙ্গ তামাশা, এক ঘণ্টা আধ ঘণ্টায়ও দেখা, সেখানে ভ্যানে প্রায় ঘণ্টাখানেকের রাস্তায় সে একজনের সঙ্গে আলাপে তার নামটা কখন জেনেছিল, তাই মনে রাখতে হবে? নামটা যে মনে আছে এই বেশি। না, নামটা মনে থাকবে। ওই বাদলার দিনে তার কত উপকার করেছিল। যাত্রাপুর পর্যন্ত আসতে আসতে প্রায় রাত। তারপর স্টেশনের কাছে নেমে প্রায় পৌনে এক মাইল পথ হেঁটে লাউফলা।
লঞ্চঘাটের গলিতে ঢুকতে ঢুকতে জরিনার মনে পড়ে, না সে কখনও নাম বলেনি। বার দুই তার নাম ধরে ডেকেছিল তার স্বামী, তাই নামটা এখনও তার মনে আছে। এমনকি সেই ঘুম ঘুম বাচ্চা ছেলেটাকে দুইবার মাথায় হাত বুলিয়ে ডেকেছিল, ভরত; তাও আরও কিছুক্ষণ ভেবে জরিনা মনে করতে পারে। গোলমতো মুখ ছেলেটার, মুখোনায় কত মায়া! কোলে নিয়ে চুমু খেতে মন চায়। ভ্যানে ওই বাচ্চা ছেলের পা তার গায়ে লাগলে, সে পায়ে হাত বুলিয়েছিল।
আজ এখানে, হঠাৎ সেই ঝিলিক! একলা, সুকুমারের সঙ্গে কী! কোনও কেসের জন্যে মোল্লারহাট থেকে এসেছে? সুকুমারের বাড়ি মোল্লারহাট? জরিনা জানে না কিছুই। চলে গেছে নাকি দুপুরের পরের ট্রেনে?
নদীর পাড়ে আজগরের ঝুপড়ির কাছে এসে জরিনা দেখে, আজগর দরজার সামনে একখানা ভাঙা টুলে বসে অনবরত কাশছে! লোকটার গলায় সমস্যা হল না তো। এই কাশির দমকটা কয়দিন বাদে বাদেই পেয়ে বসে। আজও বসেছে। পকেটে পয়সা আছে, নাকি? থাকলে এই কাশির দমক কমাতে যাবে কামারপট্টির পিছনে। সেখান থেকে শালসার বোতল ভরে এনে নদীর কূলে অথবা পন্টুনে বসে গলায় ঢালবে। তাতে নাকি কাশির দমক কমে।
জরিনা ওই অবস্থায় আজগরকে বসা দেখে ভাবে, যা থাকে কপালে আজ তাকে কোনওভাবে কর্মকারপট্টির দিকে যেতে দেবে না। নেশার পয়সা নাকি ভূতে জোগায়। যেভাবেই জোগাক, যাই ঘটুক আজ আজগরকে সে আটকাবেই। নাকি জরিনাকে দেখে ইচ্ছে করে এই কাশির দমকটা তুলেছে, যাতে শালসার বোতল ভরে মাল আনতে ওদিকে যেতে পারে।
