আসলে, বৃষ্টি একটা কারণ হয়তো, তবে খানজাহানপুরে ট্রেন লাইনেও সমস্যা হয়েছে। মূলঘর স্টেশনে লোকে লোকারণ্য। ছয় বগিতে উপচানো মানুষ নিয়ে চলছিল ট্রেন, অনেকের গন্তব্য যাত্রাপুর। অবশ্য এই সন্ধ্যার মুখে কয়জনই-বা যাবে যাত্রাপুর। তখন জরিনার খেয়াল হয়, কাল শুক্রবার, ছুটির দিন, খুলনায় অফিস করা মানুষজন সব বাগেরহাটে যাচ্ছিল এই বিকালের ট্রেনে।
মূলঘর স্টেশনে নেমে জরিনা পরিচিত কাউকে খোঁজে। এত মানুষ কিন্তু জরিনার পরিচিত আশেপাশে তখন একজন মানুষও নেই। ট্রেনটা উলটো দিকে কিছুদূর গিয়ে দাঁড়ায়। স্টেশন বৃষ্টি কমলে ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। জরিনা একবার নেমে রাস্তায় গিয়েছিল। ভ্যান পাওয়া যায় একটু পর পর। কিন্তু সবাই বাগেরহাটে যাবে। তাছাড়া জরিনা যে ভ্যানে যাবে, তখন সেই পয়সাও তার কাছে নেই, সুযোগ পেয়ে ভ্যানঅলা ভাড়া বাড়িয়েছে। এক ভ্যানে চারজন করে যাচ্ছে, সেখানে জরিনা একা-একটা মেয়ে মানুষ, রাস্তায় গিয়েও তার যাওয়ার সুযোগ হল না। একদিকে আবার আকাশ কালো করে বৃষ্টি আসে। তখনও যে দিন অবশিষ্ট আছে, তাই এতক্ষণ তো প্রায় বোঝাই যাচ্ছিল না, এখন আবার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসায় চারদিক আরও অন্ধকার হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে স্টেশনে লোক কমেছে। প্ল্যাটফর্মে লোকজন যা ছিল তারা সব ছাউনির নীচে, টিকেট ঘরের সামনে। তার এক কোনায় জরিনা এসে দাঁড়ায়। তার পাশে তখন বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়ানো ঝিলিক। কথায় বোঝা যায় পাশের লোকটা তার স্বামী। কোলের বাচ্চাটা ঘুমিয়ে। কোলে নেয়ার তুলনায় বেশ বড়োসড়ো। জরিনা তাদের দেখে। ঝিলিকের কপালের সিঁদুর বৃষ্টিতে ধুয়ে কিছুটা লেপ্টে গেছে। ঝিলিকের স্বামী জরিনা তাদের কাছে দাঁড়ানো দেখেই কপাল কোঁচকায়। জরিনা সেটা লক্ষ করে। হয়তো দিন হলে, চারদিক একটা অন্ধকার না হয়ে আসলে ঝিলিকের স্বামীর ওই অস্বস্তি জরিনা আরও ভালো বুঝতে পারত।
জরিনাও লোকটার দিকে চোখ বড়ো করে চাইল। ঘরের বউঝির কাছে জরিনার মতো মেয়ে মানুষ ভিড়লেই, এসব লোকের চোখ ছোটো হয়ে আসে, কিন্তু সুযোগ পাইলেই যে গায়ে হাত দেয়, চোখ টেপে কখনও গাও টেপে, তাও তার জানা আছে। এই লোকটিও তাই। জরিনা এসব পাত্তা দেয় না। এমন মানুষ তার অনেক দেখা আছে। কিন্তু বৃষ্টির ছাঁটের কারণেই তো সে তাদের একটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। না হয় এই জায়গায় দাঁড়ানোর তার কোনও দরকার ছিল?
কিন্তু এসব উলটে ঝিলিক তার সঙ্গে কথা কয় নরম গলায়। তার আগে সে তার স্বামীকে বলে ছেলেটাকে একটু কোলে নেওয়ার জন্যে। হাত দুটো ব্যথায় প্রায় বিষ হয়ে গেছে। আর পারছে না। তারপর গলা নামিয়ে জরিনার কাছে জানতে চায়, সে কোথায় যাচ্ছিল।
জরিনা তা বলল। ঝিলিক জানাল, তারাও যাবে যাত্রাপুর, তবে লাউফলা রথের মেলায় নয়, বিষ্ণুপর। সেখানে ঝিলিকের নন্দেজামাই বাড়ি, সে-বাড়িতে কাল ননদের ছেলের মুখেভাতের অনুষ্ঠান। এখন এই বর্ষায়, ট্রেনের এমন অবস্থা হল! তারা যদি না যেতে পারে, তাহলে কি সারারাত এই জায়গায় থাকতে হবে।
এরপর তাদের এই যাওয়া নিয়ে আরও কথা হয়। এমনকি কে কোথায় থাকে, তার স্বামী কী করে এইসব নিয়েও, স্বাভাবিক যে সমস্ত কথা তাদের ভিতর হতে পারে। জরিনা তখনও ঝিলিকের নাম জানে না, ঝিলিকও জানে না জরিনার নাম। কিন্তু পরস্পরের কথা চলতে থাকে। ঝিলিকের স্বামী পাশে ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শোনে। জরিনার কেন যেন একবার একবার মনে হয়, মেয়েটার স্বামীটা একটু গোয়ার আর বলদা কিসিমের। আবার তাও খানিক বাদে তাদের কোনও কথার ভিতরে কথা বললে আর মনে হয় না। আবার, কিছুক্ষণ পরে জরিনার এও মনে হয়, তার সঙ্গে যে কথা বলছে ঝিলিক, তাও পছন্দ করছে না ঝিলিকের স্বামী! ঝিলিক এরপর জানতে চাইল, লাউফলায় সে কোথায় যাবে? জরিনা জানিয়েছে, সে লাউফলা রথের মেলাতেই যাবে। এক ঝুমুর দল এই মেলার কয়দিন থাকবে সে। কথাটা যেন শুনে ফেলে ঝিলিকের স্বামী। যদিও তেমন নীচু গলায় জরিনা বলেনি। জরিনার দিকে তাকাল ঝিলিকের স্বামী। তবে, ঝুমুর দলে থাকা আর অন্যান্য বিষয়ে কিছুই যেন বোঝেনি ঝিলিক। সে জানে, ঝুমুর একপ্রকার গানের দল।
এ সময় বৃষ্টি একটু ধরে আসে। প্রায় নেই, যদিও থাকে তা গাছের পাতার পানি। প্ল্যাটফর্মের থেকে বাইরের রাস্তার দু-পাশই গাছ ছাওয়া। এখান থেকে বৃষ্টি কী পরিমাণে পড়ছে তা বোঝা যায় না, বৃষ্টি থেমে গেলেও, গাছের পাতার পানি পড়ায় মনে হয় এখনও বৃষ্টি আছে। তবু, প্ল্যাটফর্মের চালের টিন থেকে পানি প্রায় পড়ছে না দেখে ঝিলিকের মনে হল, এখন তার স্বামী রাস্তায় গিয়ে ভ্যান ডাকতে পারে। ঝিলিক তার স্বামীকে একটু নীচু গলায় তাই বলল, এহোন যাবা নাকি, বৃষ্টি মনে কয় ছ্যাঁক দেবে। দেহো, এট্টা ভ্যানট্যান পাও নাকি।
দেহি। ঝিলিকের স্বামী বলে, আর-এট্টু ছ্যাঁক দিক।
দেহি না। সন্ধ্যা হইয়ে আইচি–এট্টু পর চাইরদিক অন্ধকার হইয়ে যাবে। পথ তো এহেবারে কম না। আমরা দুইজন মাইয়ে মানুষ, জরিনার দিকে ইঙ্গিত করল, এই দিদিও যাবে আমাগো সাতে। যাও। মানুষ কম না, চালিই ভ্যান পাবা নানে।
প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে আলো জ্বলছে। এরপর রাতে আর মাত্র দুটে ট্রেন আসত দুই দিক থেকে। তা আর আসবে না। ভিড় দ্রুত পাতলা হচ্ছে। যারা এরপরের স্টেশনে যেত তারা হাঁটা শুরু করেছে। আবার উলটো দিকের যেসব যাত্রী খানজাহানপুর থেকে এই ফকিরহাট মূলঘরে আসত, সেসব ভ্যানের কোনও কোনওটা এতক্ষণে প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে দাঁড়াচ্ছে। নিশ্চয়ই দুই দিকের সব স্টেশনেই এ খবর পৌঁছে গেছে, রেল লাইনে সমস্যা। ঝিলিকের স্বামী সে-সবের কিছু বুঝতে পারছে কি না কে জানে?
