বেঙ্গা সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠে তাকাল। ওই ছেলেরা কেউ শুনল কি না! তারপর জরিনার দিকে চেয়ে হাসল। তার মানে ওই ছেলেরা শুনলে তাকে হয়তো বলত, ওই তো তোমার নাম বেঙ্গা, সবাই ডাকে, শুধু আমরা ডাকলেই দোষ?
এই ছোট্টো পার্কটার রাত্রিকালীন একচ্ছত্র সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী এই বেঙ্গা-বেঙ্গি। পুকুরের পাশের বেঞ্চির নীচে আছে চুলো, তার সঙ্গে থাল গেলাস। বৃষ্টি বাদলার দিনে রান্না চাপায় রেড ক্রিসেন্টের ওই দিকের কোনার বারান্দায়। অন্য সময় খোলা আকাশে। খাওয়ার জন্যে পাশের ট্রাফিক ব্যারাকের চাপ কলের পানি। নাওয়ার জন্যে পার্কের পুকুর। পায়খানা রাত্রের বেলা এক কোনা কানাচিতে করে নিলেই হল, এত দালান। আবার পুকুরে তেলাপিয়া আছে, বেঙ্গি তাই ধরে। নদীতে বড়শি বাইলেও মাছ পাওয়া যায়।
যেমন, এখন বেঙ্গি উলটো দিকের জেলখানার পুকুরে তেলাপিয়া ধরছে। উলটো দিকের জেলখানার গার্ডরা কেউ গালমন্দ করলেই খ্যামা দেবে। আবার এই দুজনকে কেউ কিছু বলে না। যা বলার বলে, ওই রহমত পাগলা, যদি কখনও রেড ক্রিসেন্টের বারান্দায় ঘুমাতে আসে। বেঙ্গা বেঙ্গি অবশ্য বৃষ্টি না হলে খোলা আকাশের নীচে ঘুমায়, পুকুরের পাড়ের বেঞ্চিতে। যাতে লাভ এই, কেউ যদি কেউরে সঙ্গে নিয়ে আসে, বেঙ্গা বেঙ্গিরেও দুই-একটা টাকা সাধে। তারা টাকা আর চেয়ে পেলে একটা বিড়ি কি সিগারেট নিয়ে রেড ক্রিসেন্টের বারান্দায় আসে। তখন তারা পাহারাদার।
জরিনার এসব জানা আছে। আজগর বলেছে। আজগরের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক আধবার জরিনা এসেছেও কারও সঙ্গে। আজগর খাওয়ায়, রাখে, কিন্তু আজগরেরও টানাটানি, বান্দর নাচিয়ে আর কয় পয়সা। তাছাড়া একটু পান খেতে কি চুলে তেল দিতে যে পয়সা লাগে সেই পয়সার জন্যে সবসময় আজগরের কাছে হাত পাতা যায়?
আবার বেঙ্গা-বেঙ্গির এও জানা এসব কথা কারুকে বলা যায় না। বলা যাবে না। বললেই লোকসান। মাঝেমধ্যে ভদ্দরলোকের বাড়ির ছেলেপুলেরা আসে, তাদের দেখভাল করা কর্তব্য। দিনের বেলা তারাই যদি এসে তাদের তুলে দেয়, তাহলে তারা থাকবে কোথায়?
বেঙ্গা জানাল, বেঙ্গি ওই পুকুরে মাছ ধরে।
বেঙ্গির সারা শরীর স্পষ্ট। সেখানে দিন শেষের অন্ধকার একটুও নেই। কারণ, বেঙ্গি ক্লাব বিল্ডিংয়ের দিকে পিঠ দিয়ে আর সেখানে পাশের টেনিস লনের ফ্লাড লাইটের আলো। শহরে যত অন্ধকার থাক, ওই জায়গাটুকু খুব আলোকিত। সেখানে বিকেল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত লন টেনিস খেলা হয়। সে আলোয় বেঙ্গির পিঠে আলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেঙ্গিকে পুকুরের পাড়ে দেখে জরিনা তাকে বলে, যাই। দুইজন মানষিরে খুঁজদি আইলাম, পালাম না। আর একদিন দিনেমানে আসপানে।
বেঙ্গা হাসে, না, রাত্তিরেও আইসানে, আমরা তো আছি।
কেউ শুনলে এই কথার ভিতরে কোনও ইঙ্গিত আছে কি না কোনওভাবে বুঝতেও পারবে না। জরিনাও তাই হাসল।
ফিরত পথে, ফাঁকা কোর্ট চত্বর। কিন্তু পাখির ডাকে এখন কান ভারি। একটি দিন শেষ হয়ে আসছে। একদিন এমন সন্ধ্যায় মূলঘর স্টেশনে তার সঙ্গে ঝিলিকের দেখা হয়েছিল।
সেই দেখা হওয়াটাকে আকস্মিক বলা যাবে না। যেন ওই ঘটনাটাই এমন যে, ঝিলিক আর তার স্বামীর সঙ্গে জরিনার দেখা হয়েই যেত। আরও তো কত মানুষ। জরিনা খুলনা থেকে আসছিল। যাত্রাপুর। এক ঝুমুর দলে তখন জরিনা থাকে। যাত্রাপুরে তখন লাটফলার রথের মেলা চলে। জরিনা ঝুমুর গান জানে না। কোনও গানই জানে না। তার গলায় কোনও দিনও গান নেই। একেবারে কর্কশ। এমনকি এই গলায় কোনওদিন তাকে কেউ ভালোমতো একটু মধুর করে কথা কইতেও যেন শোনেনি। যদিও অতটা কর্কশ তার গলা তাও জরিনার মনে হয় না। সেই ঝুমুর দলে গানের মেয়েদের সাহায্য করে। সাজায় কখনও। এই কাজটা ভালো পারে জরিনা। আর, সে-দলের মালিক বললে কোনও মানুষের সঙ্গে এখানে সেখানে ঘণ্টা চুক্তিতে যায়। এমনকি এই দলেও কোনও কোনও মানুষ আসত, কয়েকদিন থাকত। মালিকের নির্দেশমতো জরিনা তাদের সঙ্গেও শুয়েছে। এটা ওসব দলে স্বাভাবিক ঘটনা। তাছাড়া জরিনা তখন যাবেই-বা কোথায়।
কিন্তু সে রূপসা গিয়েছিল দিন তিনেক আগে। আগে থাকতেই জানত লাউফলায় এত তারিখ থেকে ঝুমুর দল যাবে। মালিক তাকে আগেই বলেছিল। সেবার অবশ্য এই লাউফলা রথের মেলাতেই জরিনা প্রথম আজগরকে দেখেছিল। তখন আলাপ পরিচয় সেভাবে হয়নি। কিন্তু প্রথম দিনের দেখা আর আলাপ পরিচয় প্রায় না-হওয়া সেই আজগরের সঙ্গে জরিনা এইভাবে জড়িয়ে যাবে, তাকি সে কোনও দিনও কোনওভাবে জানত। তবে, সেও ঝিলিকের সঙ্গে মূলঘর স্টেশনে দেখা হওয়ার পরের বছরের ঘটনা।
রূপসা থেকে ট্রেনে যাত্রাপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়ে, মূলঘর ক্রসিঙে আসতে জরিনা শোনে ট্রেন আর যাবে না। খানজাহানপুরে লাইনে সমস্যা হয়েছে বৃষ্টিতে। অথচ মাঝখানে স্টেশন ওই একটাই, খানজাহানপুর। খানজাহানপুরের পরেই যাত্রাপুর। তাও ট্রেন খানজাহানপুর পর্যন্ত গেলেও হত, পরের পথটুকু সন্ধ্যাসন্ধি সে যাত্রাপুরে পৌঁছতে পারত। কিন্তু এখান থেকে যাওয়া সম্ভব না। বৃষ্টি বাদলার দিন। রূপসা থেকে ট্রেনে ওঠার সময়ই প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রওনা দিয়েছিল। মানুষ বলে, রথের মেলার সময় বৃষ্টি হবেই। তা বৃষ্টি হবে ভালো কথা, আষাঢ় মাসে তো বৃষ্টি হবেই, কিন্তু সেই বৃষ্টি এমন হওয়া লাগে যে ট্রেন চলতে পারবে না লাইন দিয়ে।
