এখন কদম আলির কাছে ভিড়ল না জরিনা। কদমের উলটো দিকের পন্টুনের একবার চোখ দিল, তারপর বের হয়ে এল লঞ্চঘাট থেকে। জরিনার একবারও মনে হল না, ঘাটে বাঁধা ঢাকার লঞ্চেও তো থাকতে পারে সুকুমার আর ঝিলিক। মনে না হওয়ার কারণও আছে। এই সময়ে কোনওভাবেই তাদের ঢাকার লঞ্চে উঠে বসে থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই।
লঞ্চঘাট থেকে বেরিয়ে, নদীর পাড় ধরে জরিনা ডাকবাংলো ঘাটের দিকে গেল। সেই পথে, যে পথ তার কল্পনায় ছিল যে, ডাকবাংলো ঘাট হয়ে সে যাবে কোর্টের দিকে। এইসমস্ত জায়গা, সবখানেই খুঁজবে তাদের। জরিনার বারবার মনে হয়েছে, আজ দুপুরে আজগর সুকুমারের সাথে কাজটা তেমন ভালো করেনি। এজন্যে জরিনা একটু হলেও মোসলেমকেও দোষ দেয়। বয়স্ক মানুষ মোসলেম, তার উচিত ছিল ঘটনাটার ওই জায়গায় একটা ভালো ফয়সালা করে দেয়া। তা করল না। আবার, সুকুমারও ওই সময় ওইভাবে রাগ দেখিয়ে চলে না-গেলেও পারত।
যাই হোক, যা ঘটার ঘটে গেছে। জরিনা এর একটা ফয়সালা চায়। সুকুমার মানুষটা খারাপ না। খেলা দেখিয়ে পেট চালায়। সেই মানুষটার সঙ্গে খালি খালি আজগর এমন করবে কেন? তাছাড়া এই জায়গায় এসেছে বেশিদিন হয়নি, আবার কবে চলে যায়, কয়দিনের জন্যে এই জায়গায় এক-একজন আসে, কিন্তু আজগর বান্দরঅলা তো বহুদিন ধরে এই জায়গায়, সে এইরম না করলেও পারত!
এসব ভাবে। যদিও জরিনার মনের তলানিতে ঘটনাটি একটু অন্য। সে কারণ, ওই ঝিলিক। জরিনা জানে না, ঝিলিকের সঙ্গে সুকুমারের সম্পর্ক কী? কিন্তু ঝিলিককে চেনে সে। ভালো মতোই চেনে। যদিও এখনও সুকুমারের সঙ্গে ঝিলিক থেকে থাকে, তাহলে অনেকদিন বাদে তাদের আবার এক জায়গায় দেখা হবে। দুপুরে বলতে গেলে এক পলক দেখেছিল, কোর্টের কোনার ওই হোটেলে, সেখানে ঢুকতে ঢুকতেই বেরিয়ে এসেছিল জরিনা। ঝিলিকের সঙ্গে ভালোমতো কথাও হয়নি। তাছাড়া জরিনা ওই হোটেলে প্রায় ঢোকেও না, যদি উকিল পেশকার মহুরিরা তাকে বের করে দেয়। একদিন এক উড়ে মালি আর তার বউ ঢুকেছিল, তাই নিয়ে দোকান মালিকের কী গালমন্দ, জরিনা তখন কাছেই দাঁড়িয়ে। তখন ঝিলিককে দেখে সে ঢুকেও ছিল, মোসলেম একটু এগিয়ে, কিন্তু ওই এক পলকের দেখার সেই মুহূর্তে টাইপিস্টদের বড়ো একচালা ঘরখানার সামইে তো চলছিল আজগর আর সুকুমারের কাজিয়া। তখন কি সে জানত, একটু বাদে ঝিলিক এসে সুকুমারের পাশে দাঁড়াবে আর তার প্রায় পরক্ষণেই তারা দুজন ওই জায়গা ছেড়ে হাঁটা দেবে।
তবে, এখন এমন না যে ঝিলিককে জরিনার দরকার। কিন্তু কতদিন বাদে দেখা। ভালোমন্দ কয়ডা কথা কইত। সেই যে মূলঘর স্টেশনে একবার দেখা, তারপর আর কতদিন দেখা নেই। কোথায় ছিল এতকাল জরিনা ঝিলিকের সঙ্গে দেখা হওয়ার সেই অতীতকে ভেবে নিতে পারে। ভেবে নিতে পারে, সেই দুর্যোগের দিন ঝিলিক আর তার স্বামী তাকে কীভাবে যাত্রাপুর পৌঁছে দিয়েছিল। আজকের একটা ছোটো বাঁধাবাধিতে সেই কথাগুলো আবার মনে করা হল না। কিন্তু মনে করবে কী করে, জরিনা কি জানত ঝিলিক চেনে সুকুমাররে, আর ওই জায়গায় ঝিলিক আসা মাত্রই সুকুমার ওইভাবে রওনা দেবে রাগ হয়ে। আর তারা সবাই, এমনকি মোসলেমও, অসহায়ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে তাই দেখবে। দেখেছে ভালো কথা, একবারও সুকুমারকে ডাক দেবে না? আহা, এতদিন বাদে দেখা ঝিলিকের সঙ্গে, ভালোমন্দ কয়ডা কথাও বলা হল না!
ডাক বাংলোর পরে লাইব্রেরি বিল্ডিং রেখে বাঁয়ের সুরু রাস্তা ধরে জরিনা উকিল বারের মাঠের দিকে আসে। রেজিস্ট্রি অফিসের ছোট্ট লাল দালান আর ডানে ট্রাফিক ব্যারাক ফেলে, ক্লাব আর জেলখানার দিকে এগোয়। ট্রেজারির ঘণ্টায় পর পর ছয়টা বাড়ি পড়ল, তাতে জরিনার এইসমস্ত ভাবনায় খানিকক্ষণের জন্যে ছেদ পড়ে। আলো ধরে এসেছে। আরও একটা দিন শেষ! একটু বাদেই সন্ধ্যা হবে। যদিও এই কোর্ট চত্বরে আর পার্ক এলাকায় সন্ধ্যাটা সারা শহরের চেয়ে অনেক ভালো বোঝা যায়। কোর্ট চত্বরের চারদিকে বড়ো বড়ো গাছ। আছে কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ, মেঘনিশ আর মেহগনি। বট বা অশখও কয়েকটা। অনেক উঁচু। নারকেল গাছ কোথাও কোথাও প্রায় লাইন ধরে। একমাত্র মেহগনি বাদে সব গাছেই পাখি। নীচের পথ, পিচ ও কংক্রিটের রাস্তা–সবই পাখির গুয়ে প্রায় তলানো। পথচারী হাঁটে সেই গুয়ের দাগ দেখে। সন্ধ্যার আগে আগে প্রতিদিন নদীর ওপার থেকে পাখিরা ফেরে। কিচির মিচির কলকাকলিতে পুরো এলাকা মুখর।
জরিনা হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারল, সেটা এখনও শুরু হয়নি। তার মানে আরও কিছুক্ষণ সময় আছে সুকুমারকে খোঁজার। কিন্তু আজগর যদি এতক্ষণে উঠে থাকে। যদি উঠে থাকে উঠবে। কাজ কী? দরকারে একলা একলা চা খাবে। যদি মনে হয়, জরিনার জন্যে তার বার চাওয়ার দরকার আছে, তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে। জরিনা এখনই তো ফিরবে। যাবে কোথায়? আছে কোনও জায়গায় দুই চোখ যেদিকে যায় চলে যাওয়ার?
এদিকে জরিনাই-বা আর যাবে কত দূর। সামনে স্বাধীনতা উদ্যান, আগেকার পার্ক, এখানে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। রেড ক্রিসেন্টের বারান্দার একপাশে সে এই পার্কের স্থায়ী বাসিন্দা বেঙ্গাকে বসে থাকতে দেখে। তার কাছে জানতে চায়, বেজি কোথায়? জানতে চেয়ে বোঝে এখনই জরিনার একটা দবড়ানি খাওয়া লাগবে। বেঙ্গার যেমন একটা নাম আছে, হাত পা বাঁকা বলে, আশেপাশের ছেলে ছোঁকড়ারা ডাকে বেঙ্গা, সেই থেকে বেঙ্গার সঙ্গী বেঙ্গি। কিন্তু বেঙ্গির নাম যে সুফিয়া এটা মনে থাকে না জরিনারও। সবাই ডাকে ওই নামে, এখন তাই ডাকল সেও।
