হীরুকে পুড়িয়ে গঙ্গাচান করে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল, স্যার। পোড়ানোর টাকা তো ছিল না। ওকে ফুটপাথে ফেলে লোকের কাছ থেকে ভিক্ষে করে টাকা তুলতে হয়েছে। বেলা যত বেড়েছে ওর শরীরটা তত ফুলে ফেঁপে উঠেছে, ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি ভনভন করতে শুরু করেছে। কিন্তু কী করব, স্যার..কী বলছেন? আপনার কাছে আসতে পারতাম? না, স্যার, ছিঃ, তা হলে আপনার চরিত্রে যে কালি লাগত! সে কি প্রাণ থাকতে আমি করতে পারি? জানেন, স্যার, এখানে আসার আগে দুটো ঘণ্টা মাঠে-ঘাঠে বেড়িয়েছি। বস্তির ঝোঁপড়ায় আর ফিরতে পারিনি। মনটা কেমন হু হু করে উঠেছে। হাজার হলেও বউটা আমার খারাপ ছিল না, স্যার। কিন্তু আপনিও তো কম ভালো লোক নন। তাই তো হঠাৎ খেয়াল হওয়ায় ছুটে এলুম আপনার কাছে। আপনাকে সাবধান করতে। এগারোটা বোধহয় বেজে এল স্যার। ওই তো! আপনার বসবার ঘরের দামি দেওয়ালঘড়িতে ঢং ঢং শব্দ শুরু হয়েছে। শুনুন স্যার, শুনুন! এক, দুই, তিন…চার; জানেন, স্যার, হীরু বলেছিল, ঘরের বাতিগুলো দপ করে নিভে গেলে বুঝবে আমি…শুনুন, শুনুনু!..ছয়…সাত…আট– কী হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে, স্যার। জানলা-দরজার পাল্লাগুলো ঠাস ঠাস করে বাড়ি খাচ্ছে ঝড় উঠল বুঝি?নয়–দশ–এগারো–এই যা। কী বলছেন স্যার, লোডশেডিং? আপনি এত বড় লেখাপড়া-জানা লোক হয়ে এই ভুলটা করলেন, স্যার? দেখছেন না, আশপাশের সবকটা বাড়িতেই আলো জ্বলছে! শুধু আপনার বাড়িতেই।
আসুন, এদিকেই নরকের দরজা
এবার এদিকে আসুন..দেখবেন, মাথার দিকে খেয়াল রাখবেন, নইলে ঝুলে থাকা পাথরে যে কোনও সময় চোট পাবেন। বুঝতেই তো পারছেন, ১৭০০ সালের দুর্গ এর চেয়ে আর কত ভদ্র হবে! সিঁড়ির ধাপগুলো নড়বড়ে হলেও তেমন ভয় নেই, কাঠগুলো দিব্যি মজবুত আছে। আমার আটবছরের চাকরিতে এ-সিঁড়ি ভেঙে কেউ কখনও পড়ে যায়নি। আসুন–ধীরে-ধীরে নেমে আসুন আপনারা। হ্যাঁ, এই যে–এটাই শেষ কুয়ো, যেখানে বিশ্বাসঘাতিনী নাফিসা বেগমকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন বাহাদুর শাহ্। না, না, পুরো ইতিহাস আমি কী করে জানব? সবই আমাদের শোনা কথা। লোকমুখে যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে। আর, এই যে বিশাল পাথরে বাঁধানো উঠোনটা দেখছেন, এখানেই বিকেলে বেড়াতেন বেগমরা। যাতে বাইরের কেউ তাদের দেখতে না-পায়, সেইজন্যে চারধারে রয়েছে পনেরো ফুট উঁচু পাথরের পাঁচিল। কী বলছেন, হারেম? উঁহু, এটাকে আপনারা দুর্গও বলতে পারেন, আবার ফষ্টিনষ্টির কারখানাও বলতে পারেন। ব্যস, এই সব–আর দেখানোর কিছু নেই। কারও কোনও প্রশ্ন থাকলে বলুন। নেই? তা হলে আপনারা এবার আস্তে-আস্তে ফিরে যান। যান, যান, কোনও ভয় নেই; যে-পথ দিয়ে এসেছেন, সেই পথ ধরেই ফিরে যান। এটা তো আর নবাব বাদশাদের ভুলভুলাইয়া নয়, বেরোতে কোনও অসুবিধেই হবে না।
এ কী স্যার, আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন যে? কী বলছেন, আমি সবকিছু আপনাদের দেখাইনি? তাই কি কখনও হয়? এই দেখানোটাই যে আমার চাকরি! আপনারা যদি স্যাটিসফায়েড না হন, তা হলে কালই মিস্টার সেনগুপ্ত আমার চাকরি খেয়ে দেবেন। এ-দুর্গের দেখাশোনার ভার ওঁর ওপরেই আছে কিনা। কুয়ো? কুয়োটা তো আপনারা দেখলেন, ওই তো! কী বলছেন? ওটা নয়? অন্য আর-একটা কুয়ো? যেখানে–যেখান তিতু সরকার, মানে তিতির সরকার নামে কচি মেয়েটা সুইসাইড করেছিল?
শ-শ-শ-শ! আস্তে, স্যার, আস্তে বলুন। দেখছেন তো, এখনও জনাকয়েক ট্যুরিস্ট ওপাশটায় ঘোরাফেরা করছে। তা ছাড়া, মিস্টার সেনগুপ্ত যদি একবার এসব কথা শুনতে পান, তা হলে আর রক্ষে থাকবে না। তিনি চান না, দশবছর আগেকার ওই কেস নিয়ে কেউ আর কোনওরকম ঘাঁটাঘাঁটি করুক।
হ্যাঁ, কুয়োটা আমি চিনি। কিন্তু ওই যে বললাম, মিস্টার সেনগুপ্তের বারণ আছে। না, স্যার, তা আমি পারি না। তা হলে আমার চাকরিটাই চলে যাবে।…আচ্ছা আপনি যখন এত করে বলছেন– তা ছাড়া আপনার কাছ থেকে বকশিশ নেওয়ার পর তো আর আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারি না। কুয়োটা আপনি সত্যিই দেখতে চান? কিন্তু হঠাৎ একুয়ো দেখার সাধ হল কেন বলুন তো? ও, মেয়েটা মারা যাওয়ার পর যেসব রিপোর্টার এসেছিল, আপনি তাদের মধ্যে ছিলেন? তাই বলুন! কী যেন নাম বললেন মেয়েটার, তিতির সরকার?
না, তখন এ-চাকরি আমি করতাম না। কিন্তু আর-সবাইয়ের মতো খবরের কাগজগুলো খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়েছিলাম। তা হলে স্যার আপনি একমিনিট ওয়েট করুন, আমি অন্য ট্যুরিস্টদের বেরোনোর রাস্তাটা দেখিয়ে দিই। তা ছাড়া পাঁচটা প্রায় বাজে, বন্ধ করার সময়ও হয়ে গেছে…।
নিন, এবার বলুন–এখন আর কোনও ভয় নেই। ওঃ, সারাটা দিন যা ধকল গেছে! শেষ দলটাকে বের করে দিয়ে এবার নিশ্চিন্তি! না, আর কেউ এখান আসবে না। বাইরের জং ধরা ভারী দরজাটায় আমি খিল এঁটে দিয়ে এসেছি। না, না, বাইরের কোনও শব্দই এখানে শোনা যায় না, আর সেইজন্যেই আমাদের কথাও বাইরের কোনও প্রাণীর কানে যাবে না–অবশ্য নিশাচর পাচাঁদের কথা আলাদা। এই অন্ধকার ঠাসা দুর্গেই ওদের রাজত্ব। তা ছাড়া সন্ধেও তো হয়ে এল।
আপনি ওই কুয়োটা তা হলে দেখতে চান? যেখানে তিতির সরকার নামে মেয়েটা ডুবে মারা গিয়েছিল? কিন্তু কাজটা করা আমার ঠিক হচ্ছে না। মিস্টার সেনগুপ্ত যদি একবার জানতে পারেন, তাহলে ভীষণ রেগে যাবেন। না, আপনি ঠিকই বলেছেন, তাঁকে জানানোরই-বা দরকার কী? হাঃহাঃহাঃ…।
