আমি ভাবছিলাম, আমার কথায় দীপেশ আর নন্দিনী হয়তো হো-হো করে হেসে উঠবে। কিন্তু না, ওরা কেউ হাসল না আমার থিয়োরি শুনে। নন্দিনী একবার চিন্তিত মুখে তাকাল দীপেশের দিকে। দীপেশ গম্ভীরভাবে আমাকে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখল। তারপর জিগ্যেস করল, আর কী কী মনে হয় তোর?
এইজন্যেই দীপেশের জবাব নেই। ও আর-একজনের মনের অবস্থা সবসময় ঠিক-ঠিক বুঝতে পারে। এইজন্যেই কারও কাছের মানুষ হয়ে উঠতে ওর এতটুকু দেরি হয় না।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, আমার আরও কী মনে হয় জানিস! ওই লোকটা নির্ঘাত কোনও বদ মতলবে ঘুরঘুর করছে।
কী মতলব?
সেটাই তো এখনও বুঝতে পারছি না।
তারপর কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
একসময় দীপেশ বলল, সন্দীপ, তুই লোকটাকে যেমন লক্ষ রাখছিস সেরকম লক্ষ রাখ। এটা নিয়ে এক্ষুনি থানা-পুলিশ করা ঠিক হবে না। ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে থাকাই ভালো। আমি আজ চলি, নন্দিনী, তোরা একটু সাবধানে থাকিস।
দীপেশ চলে যাওয়ার পর সুখীকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনতে পাঠালাম। নন্দিনীকে একা পেয়ে জাপটে ধরে দুটো চুমু খেয়ে বললাম, শুনলি তো, এখন থেকে তোকে সাবধানে থাকতে হবে।
নন্দিনী অদ্ভুত হেসে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, এখন না, রাতে। তারপর চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।
আমি টিভিটা অফ করে দিয়ে চলে এলাম শোওয়ার ঘরে। প্যাকেটের শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালাম। আয়নার পরদা সরিয়ে দিয়ে ঠান্ডা কাচে হাত দিলাম। এটা আসলে দরজা! ভাবা যায়! ওই লোকটা কোথায় গেল?
আয়না লক্ষ করে কয়েকবার সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ে দিলাম। তারপর আয়নার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ে চাপা গলায় জিগ্যেস করলাম, আয়না, তুই সত্যি করে বল, কাকে তুই লুকিয়ে রেখেছিস।
আয়না কোনও উত্তর দিল না।
শুধু আমার প্রতিবিম্ব আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
.
০৩.
আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। তবে আমি সেটা জানতে পেরেছি এটা নন্দিনী বা দীপেশ– কাউকে বুঝতে দিইনি।
সন্ধের পর একটা ফোন এল। আমিই ফোনটা ধরলাম। তারপর হ্যালো বলা সত্ত্বেও ও প্রান্ত থেকে কোনও উত্তর নেই। তবে মনোযোগ দিয়ে কান পেতে শুনতে পেলাম ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
নন্দিনী বাথরুমে গা ধুতে ঢুকেছে। সুতরাং আরও কয়েকবার চেঁচিয়ে হ্যালো বলে ফোন রেখে দিতে যাচ্ছি, শুনতে পেলাম খটাস করে বাথরুমের দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দ। তাকিয়ে দেখি, ভেজা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নন্দিনী এগিয়ে আসছে।
দাও তো, আমি একবার দেখি।
নন্দিনীকে রিসিভারটা দিয়ে শোওয়ার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। তারপর জলে ভেজা নন্দিনীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলাম। ও ছোট-ছোট আদুরে শব্দের ফাঁকে ফকে ফোনে কথা বলতে লাগল। আমি আদর করতে করতে ওর কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম।
হ্যালো, নন্দিনী বলছি। হ্যাঁ, বলো। এই তো, ঘরেই রয়েছে। না, ডক্টর বাসুকে ফোন করিনি। পরশুদিন একেবারে ওকে নিয়ে যাব। তুমি কী করছ এখন? আমি? আমি এই তো গা ধুয়ে বেরোলাম। ইয়ারকি কোরো না। তুমি কবে আসছ? আচ্ছা। রেখে দিই তা হলে।
ফোন রেখে দিল নন্দিনী। ওর উ, আঃ– শব্দগুলো এবার জোরে হতে লাগল। ও আমাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যেসব আলগা আপত্তি করছিল সেগুলো যে আসলে কোনও আপত্তিই নয় তা এই তিন বছরে আমি ভালো করে জেনে গেছি।
সুতরাং ভিজে শাড়িটা ওর গা থেকে খসিয়ে দিলাম। তারপর ওকে নিয়ে গেলাম বিছানায় কাছে। ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ, আর পরদা ঢাকা আয়নার আবছাভাবেও কাউকে নজরে পড়ছে। না। তা হলে ফুলশয্যা হতে আর বাধা কী!
আদর-ভালোবাসার দমকে আয়নার দিকে তাকানোর কথা খেয়াল ছিল না। কিন্তু সবকিছুর শেষে ক্লান্ত দেহে যখন শুয়ে আছি, তখনই লোকটাকে দেখতে পেলাম। আয়নার বাঁ-দিকের এককোণে ওর বাঁ-চোখ আর চুলের খানিকটা দেখা যাচ্ছে।
আমি বিছানায় উঠে বসতেই লোকটা সরে গেল।
নন্দিনী অবাক চোখে আমাকে একবার দেখল, তারপর বলল, কী হল!
সেই লোকটা।–আমি আয়নার দিকে চোখ রেখেই জবাব দিলাম।
ও–।
নন্দিনী বিছানা ছেড়ে উঠে মেঝেতে পড়ে থাকা ভিজে শাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।
আমি কিছুক্ষণ অলসভাবে শুয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম আমার থিয়োরিটার কথা। লোকটার নিশ্চয়ই কোনও খারাপ মতলব আছে। হয়তো সুযোগ বুঝে ও ওই দরজা পেরিয়ে চলে আসবে আমাদের জগতে। ঢুকে পড়বে আমাদের ফ্ল্যাটে। তারপর সাংঘাতিক কিছু একটা কাণ্ড করে…।
আমার মাথাটা কেমন দপদপ করছিল। বোধহয় টেনশানটা বাড়ছে। নাঃ, একটু রাস্তায় বেরোই, পায়চারি করে মাথাটা হালকা করে আসি।
নন্দিনীকে বলে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। কাছেই একটা মাঠ আছে, সেখানে বসে একটু জিরিয়ে নেব।
ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় গাড়ির হেডলাইটের আলোয় একটা লোককে হঠাৎই দীপেশ বলে মনে হল। আমি চেঁচিয়ে ওকে ডাকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু গাড়িটা চলে যেতেই রাস্তাটা এখন অন্ধকার হয়ে গেল যে, ধন্দে পড়ে গেলাম। বোধহয় দীপেশ না, অন্য লোক। দীপেশকে কাছে। পেলে আমি খুব ভরসা পেতাম। তাই কখনও ওকে কাছছাড়া করতে চাইতাম না। কিন্তু সেসব দিন এখন কোথায়!
খোলা মাঠে ঠান্ডা বাতাসে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে ফিরে চললাম বাড়ির দিকে।
