নন্দিনী টেলিফোনে মিষ্টি করে হ্যালো বলল।
এটা কি সেই টেলিফোন?
মানে, কিছুদিন ধরে একটা ফোন আসছে, সেটা আমি ধরলেই সব চুপচাপ–কেউ কথা বলে না। শুধু দম নেওয়ার ফোঁসফোঁস শব্দ শোনা যায় কয়েক লহমা। আর তারপরই লাইন কেটে যায়।
অথচ নন্দিনী যদি ফোন ধরে তা হলে আর লাইন কাটে না। কখনও সেই ফোনে কথা বলে নন্দিনীর মা, অথবা আমার ছোটপিসি, বা আমেরিকা থেকে নন্দিনীর বড়দা, আর নয়তো দীপেশ।
নন্দিনী টেলিফোনে কথা বলছিল। আমি হাঁ করে ওর কথাগুলো শুনছিলাম। কে ফোন করছে। এখন?
আমার মুখ দেখে নন্দিনী বোধহয় নীরব প্রশ্নটা টের পেল। রিসিভারের মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিশফিশে গলায় বলল, দীপেশ–।
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দীপেশ আমাদের দুজনেরই বন্ধু। ইউনিভার্সিটিতে আমরা তিনজনে একসঙ্গে পড়েছি। দীপেশটা যাচ্ছেতাই নম্বর পেয়ে প্রত্যেক ইয়ারে ফার্স্ট হত। তার ওপর কী দারুণ চেহারা! আমার সঙ্গে তো একেবারে গলায়-গলায় ছিল। একসঙ্গে কত সিনেমা দেখেছি আমরা। তখন নন্দিনীর সঙ্গে আমার অতটা মাখামাখি ছিল না।
পাশ-টাশ করে একটা দারুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে চাকরি নিয়ে দীপেশ স্টেট্স-এ চলে গেল। আমিও চাকরি পেলাম। তার কিছুদিন পর নন্দিনীও চাকরিতে ঢুকল। চাকরি করা অবস্থায় আমাদের প্রেম চলেছিল বছরখানেক। কিন্তু তারপর আর পারা যাচ্ছিল না। নন্দিনীর বাবা একটা ফ্ল্যাট গিফ্ট করতেই সব প্রবলেম সম্ভ হয়ে গেল। নন্দিনী চাকরি ছেড়ে দিল। বলল, সন্দীপ, চাকরির চেয়ে বিয়ে অনেক বেটার। তুই একা চালাতে পারবি না?
আমি খুব পারব বলে ওকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নিয়েছিলাম। আর তারপরই দু গালে প্রচণ্ড চকাৎ-চকাৎ শব্দে দুটো চুমু। নন্দিনী আচমকা বিব্রত হয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল, কী হচ্ছে। কী হচ্ছে!
আমি হেসে বলেছিলাম, সোনা, চুমুতে যখন বিকট শব্দ হয় তখন তাকে বলে হামি।
করিডর ধরে কে যেন এগিয়ে আসছিল। তাই তাড়াহুড়ো করে নন্দিনীকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম।
আমাদের বিয়ের মাসতিনেক পর দীপেশ কলকাতায় ফিরল। তারপর থেকে মাঝে-মাঝেই আসে আমাদের আস্তানায়। ওকে দেখলেই আমার ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। নন্দিনীর সঙ্গে পিরিত করার জন্যে ও আমাকে কম ওসকায়নি। বন্ধুবান্ধব সকলের মাঝে লুকিয়ে আমার পেছনে চিমটি কেটে বলেছিল, জাগো বাঙালি, লড়ে যাও।
নন্দিনী টেলিফোনে খুব হাসছিল। তারপরই খেয়াল করলাম ও দীপেশকে আমার কথা বলছে।
আমি আয়নার দিকে একবার আড়চোখে তাকালাম। না, সেখানে কাউকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু দীপেশকে এক্ষুনি ওই লোকটার কথা বলার দরকার নেই। ও কী মনে করবে কে জানে!
নন্দিনীকে ইশারা করে বারণ করলাম, দীপেশকে এখন যেন কিছু না-বলে।
নন্দিনী আমাকে আশ্বস্ত করে হাসল। তারপর রিসিভার নামিয়ে রাখল। রাখার সময় স্পষ্ট দেখলাম, রিসিভারটা ওর বাঁ-দিকের বুকে ঘষে গেল। রিসিভারটাকে হিংসে হল আমার।
নন্দিনীকে কাছে ডাকতে যাবে, অমনি কলিংবেল বেজে উঠল। ও আমাকে লক্ষ করে জিভ ভেঙাল। বলল, পদ্ম না-এলে আমার কপালে বোধহয় একটি ফোঁটাও বিশ্রাম জুটত না। দীপেশ এলে বলব, তুমি একটুও কথা শোনো না।
নন্দিনী দরজা খুলতে গেল।
আর ঠিক তখনই একটা আবছা ছায়া আয়নার ওপরে আড়াআড়ি সরে গেল যেন।
.
০২.
নন্দিনী অলস ভঙ্গিতে চিত হয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। ঘরের নাইট-ল্যাম্প জ্বলছে। তার নীল আলোয় নন্দিনীর শাড়ির রং ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন লোককে দিব্যি দেখা যাচ্ছে। ওদের মুখ অস্পষ্ট হলেও উদ্দেশ্য মোটেই অস্পষ্ট নয়। ওদের মধ্যে একজন ক্ষিপ্র হাতে খপ করে চেপে ধরল নন্দিনীর শাড়ি। তারপর একটা উল্লাসের হেঁচকি তুলে শাড়িটা টানতে শুরু করল। বিছানায় নন্দিনীর দেহটা সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে, আর শাড়িটা একটু একটু করে খুলে আসছে ওর শরীর থেকে। বাকি তিনজন লোক নন্দিনীর বস্ত্রহরণ চুপচাপ দেখছে। আবছা আলোতেও ওদের চোখে ফুটে ওঠা তৃপ্তি বেশ বোঝা যাচ্ছে।
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। ক্ষিপ্তের মতো চিৎকার করে উঠলাম। সঙ্গে-সঙ্গে ওই চারজন দস্যু চমকে উঠে এপাশ-ওপাশ তাকাল। তারপর এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায় চারজন গায়ে গায়ে মিশে গিয়ে একজন মানুষ হয়ে গেল। এবং সেই লোকটা একছুটে চলে গেল ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার কাছে। আয়নার পরদা সরিয়ে চোখের পলকে ঢুকে গেল আয়নার ভেতরে।
আমার ঘুম ভেঙে গেল।
স্বপ্নের মধ্যেই বোধহয় চিৎকার করে উঠেছিলাম। কারণ, দেখি, নন্দিনী আলুথালু বেশে উঠে বসে আমার বুকে হাত বোলাচ্ছে, মাথায় হাত বোলাচ্ছে, কপালে-গালে ভয়-ভাঙানো চুমু খাচ্ছে।
কী হয়েছে রে? বাজে স্বপ্ন দেখেছিস?–নন্দিনীর গলায় উৎকণ্ঠা।
হ্যাঁ, খুব বাজে স্বপ্ন। বড়-বড় শ্বাস নিতে নিতে আমি বললাম, আয়নার ওই লোকটা তোর শাড়ি ধরে..শাড়ি ধরে…।
থাক, থাক। এখন ঘুমো।
আমাকে একগ্লাস জল দিল ও। ঢকঢক করে জল খেয়ে ওর নরম বুকে মুখ গুঁজে আমি শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকাল থেকে লোকটাকে আর দেখতে পেলাম না। আমি নানা অছিলায় আয়নার কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে লাগলাম। নন্দিনী ঘরকন্নার কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে লক্ষ করছিল। ওর নজর দেখেই বুঝলাম, আমার মতলব ও ধরে ফেলেছে, কিন্তু আমাকে কিছু বলল না।
