হঠাৎই টেবিলে দু-হাতের ভর দিয়ে অফিসার সামনে ঝুঁকে এলেন। আমার মুখের কাছে মুখ এনে বললেন, পারবেন এসব সহ্য করতে?
আমি মিনমিন করে বললাম যে, উনি যা ভাবছেন ঠিক তা নয়। মানে, এটা ঠিক রেপ কেস নয়। বরং অ্যাসাল্ট বা মলেস্টেশান বলা যেতে পারে। আমি সেইরকমই একটা অভিযোগ দায়ের করতে চাই। সোশ্যাল সিকিওরিটির একটা ব্যাপার রয়েছে…।
অফিসার অবাক চোখে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। তারপর হেসে বললেন, আপনি তো আজব লোক মশাই। রেপ-টেপের ব্যাপার কিছু হয়নি আর ফালতু-ফালতু ডায়েরি লিখিয়ে গায়ে কাদা ছেটাতে চাইছেন! আপনি জানেন…।
অফিসার আরও কীসব বলতে লাগলেন, কিন্তু আমার কানে কিছুই ঢুকছিল না। আমি একনজরে অফিসার ভদ্রলোককে দেখছিলাম। ওঁর বাঁ-গালের ওপরে একটা আঁচিল রয়েছে। গায়ের রং কালো। মোটা জংলা গোঁফ। সামনের কোনও দাঁত ভাঙা নেই।
খুব ইচ্ছে করছিল ওঁর গালের আঁচিলটা এক খাবলায় তুলে নিয়ে ঠোঁটের নীচে ডানদিকে বসিয়ে দিই। গোঁফজোড়া উপড়ে নিয়ে সমান দু-ভাগে কেটে বসিয়ে দিই চকচকে দু-চোখের ওপরে সূক্ষ্ম ভুরুর জায়গায়। আর ভারী নোড়ার গুঁতোয় ভেঙে দিই ওপরের পাটির সামনের একটা দাঁত। তারপর শুধু একটা নীল জামা পরিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা।
হঠাৎ দেখি আমার চোখের সামনেই আঁচিলটা গালের ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেল ঠোঁটের নীচে ডানদিকে। গোঁফজোড়া জায়গা ছেড়ে উঠে এল, দুভাগে ভাগ হয়ে বসে গেল ভুরুর ওপরে। একটা অদৃশ্য নোড়া যেন দাঁতের পাটিতে পুঁতো মারল। একটা নীল জামা…।
আমি বললাম, ডায়েরিটা ক্যানসেল করে দিন।
এরপর থানা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
এখন কী করা উচিত? কুসুমের নিরাপত্তার জন্য কিছু একটা আমাকে যে করতেই হবে। আর ওই অত্যাচারের শোধ নিতে চেয়েছিলাম, তাই-বা নেব কেমন করে? শরীরের ভেতরে রক্ত যেন ফুটছে।
অজান্তেই আমার পা-জোড়া এগিয়ে যাচ্ছিল সত্যরঞ্জন চাকলাদারের পার্টি-অফিসের দিকে, কিন্তু আমি জোর করে তাদের থামালাম। রাস্তায় গনগনে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার চোখের সামনে সত্যরঞ্জন চাকলাদারের মুখটা ভেসে উঠছিল । গায়ের রং কালো, চকচকে চোখ, জংলা ভুরু, ঠোঁটের নীচে আঁচিল, ভাঙা দাঁত। আমি জানি, সত্যি-সত্যি যদি ভদ্রলোককে ওরকম দেখতে নাও হয়, আমার স্ত্রীর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা শুনলেই তার মুখের চেহারার রদবদল হবে। শেষ পর্যন্ত ওই একইরকম হয়ে যাবে। এমনকী প্রতিবেশীদের পরামর্শমতো খবরের কাগজের অফিসে গেলেও সেখানকার সাংবাদিক বা সম্পাদকের চেহারাও হয়তো পালটে যাবে একইভাবে। সুতরাং বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।
ফেরার পথে আশ্চর্য হয়ে দেখছিলাম, রাস্তায় প্রত্যেকটি মানুষকে একইরকম দেখতে ও কালো রং, চকচকে চোখ, জংলা ভুরু…।
জানি, বাড়ি ফিরে গিয়ে অন্যান্য ফ্ল্যাটের মানুষগুলোকে যদি দেখতে পাই তা হলে তাদেরও হয়তো একইরকম চেহারা দেখব। সত্যিই কি গোটা শহরের প্রত্যেকটি মানুষ একইরকম দেখতে হয়ে গেছে? এবং গতকাল রাতের ঘটনার জন্য কি আমি, আমরা, প্রত্যেকটি মানুষ, সমানভাবে দায়ী? আমরা প্রত্যেকেই কি সমানভাবে কুসুমের আততায়ী? তাই যদি হয়, তা হলে এখন থেকে শোওয়ার ঘরের ওই ভাঙাচোরা আয়নার মুখোমুখি দাঁড়াতে আমার বেশ ভয় করবে।
আর-একজন কোকিল
নমোসকার। এখোন যেটা লিখবো সেটা বড়দের জননো নয় কিনতু। মানে শুধু ছোটদের জনননা। আমাদের বাংলা বইয়ে পড়েচি–বড়োরা লিখেচে আর ছোটরা–মানে আমরা পড়ছি। বুটু কিনতু অনেক ছোট। আমার চেয়েও ছোট। তাই ওর জননো কে লিখবে। কেউ তো লিখছে না। তাই আমি লিখছি। বুটুর জননো বাংলা বই। ওর পড়ার বই।
অনেকদিন ভেবেছি কি করে বই লেখা যায়। লিখে-লিখে আর ভেবে পারি না। কী যে মুসকিল এই বই লেখা। একটু কঠিন করে লিখতে হবে কিনতু। গলপের বই তো নয় আর। পড়ার বই। সব্বাই বলে গলপের বইয়ের চেয়ে পড়ার বই কঠিন হয় তাই।
আমি গোটা বইটা একা লিখবো না কিনতু। সব বইতে দেখি একেকজন একেকটা পড়ার কঠিন গলপো (ওটাকে কি বলে ঠিক জানি না) লিখেছে। আমিও তাই। সেইরকোম আমি একটা লিখবো। অননোগুলো পাপিয়া, সুমি, কণিকে দিয়ে লেখাবো। তারপর একসংগে বই করে বুটুকে দেবো। আর না পড়তে পারলে বাবার বেতটা নিয়ে মারবো। বাবার মতোন জোরে মারবো না, কিনতু অলপো আস্তে মারবো যাতে ব্যথা লাগবে না মোটেই, কিনতু ভয় পাবে।
নমিতাকে দিয়েও বই লেখাতাম। কিনতু না। ওর সংগে আমার দারুণ ঝগড়া হয়ে গ্যাচে। ঝগড়া হোত না, কিনতু ও-ই আমাকে কালো বলেচে। আর কেউ কিনতু বলেনি। আমাকে মা বলেছিল, যে যাই তাকে তাই বললে খারাপ হোলে রেগে যায়। যেমান ভিকু খোঁড়াকে ল্যাংড়া বললে রেগে গিয়ে আমাদের মারতে আসে। বাবাকে একদিন মা মাতাল বলেছিল। তাই শুনে বাবার কি রাগ। মারতে আসে আর কি মাকে। আমি শুয়ে শুয়ে চোখ পিটপিট করে দেখচিলুম। ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলুম। মাতাল মানে আমি জানি, বুটু জানে না। জানবে কি, ও বাবাকে শুধু বা বলে। আর কাঠের যে ঘোড়াটা মামু দিয়েচিল ওটাকে বলে ঘোরা। আমি ঘোড়া বলি কিনতু। বুটু তো বলবেই। বাচচা তো।
মাতাল মানে আমি পাপিয়াকে জিগগেস করেছিলাম। ও জানে না। আমার মনে হয় বেতাল বলে যে ছোটদের বই আচে (গলপের বই কিনতু) মাতাল মনে হয় তাই। শুধু ব এর জায়গায় ম। মানে বেটাছেলের জায়গায় মেয়েছেলে। তাই বোধহয় ব এর জায়গায় ম। মাতাল মানে বোধহয় তাহোলে মেয়ে বেতাল। কিনতু মা যে বাবাকে মাতাল বোললো বাবা কি মেয়ে? কে জানে!
