রূপান বলল, কেউ না, মা–
লেবেসগিউ লম্বা-লম্বা পা ফেলে চলে যাচ্ছিল। ওর দিকে তাকিয়ে রূপানের খুব ভালো লাগছিল। আজ ওকে রোবটটা অভিনব এক অঙ্ক শিখিয়ে গেল? সমান চিহ্নের ঠিকঠাক ব্যবহার।
আসলে আমরা সবাই সমান।
আমার বাঁ হাতের পাঁচ আঙুল
মৌমিতাকে আমার বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুলের আসল ব্যাপারটা খুলে বলিনি। কারণ, খুলে বলাটা খুব সহজ নয়। কিন্তু ও যে বারবারই আমার বাঁ-হাতের দিকে তাকায় সেটা আমি লক্ষ করেছি। এখনও দেখছি, ও কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আমার বাঁ-হাতের দিকে চেয়ে আছে।
আমি বাঁ-হাতে সবসময় সাদা দস্তানা পরে থাকি। কাপড়ের দস্তানা। ঠাটবাটওলা রেস্তোরাঁয় বেয়ারারা যেমন পরে থাকে। এখনও আমাদের টেবিলের আশেপাশে দু-তিনজন বেয়ারা এরকম সাদা দস্তানা পরে আছে।
মৌমিতাকে আজ ডিনার খাওয়াতে দ্য অর্কিড-এ নিয়ে এসেছিলাম। ই এম বাইপাসের ধারে এই দ্য অর্কিড রেস্তোরাঁটা মন্দ নয়। এখানে জগঝম্প নাচ-গান নেই। তার বদলে শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ। খুব সফট টোনে খুশির মুড তৈরির মিউজিক বাজছে। এসি-র তীব্রতা প্রায় শীত করার মতো। বেশিরভাগ টেবিলই ভরতি থাকলেও কারও কথা শোনা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চয়ই নীচু গলায় কথা বলছে। আমাদেরই মতো।
একটা কথা জিগ্যেস করব? মৌমিতা হঠাৎ মাথার চুল ঝাঁকিয়ে বলল।
করো। আমি জানতাম ও কী জিগ্যেস করবে।
তুমি বাঁ-হাতে সবসময় গ্লাভস পরে থাকো কেন?
গ্লাভস নয়–গ্লাভ বলো… হেসে বললাম আমি, আমি তো শুধু বাঁ-হাতে পরেছি– দু-হাতে পরিনি।
তুমি আনসারটা এড়িয়ে যাচ্ছ। কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বায়নার সুরে ও বলল, বলো না! বলতে কোনও প্রবলেম আছে?
আমার মনটা হঠাৎ কেমন-কেমন হয়ে গেল। প্রবলেম? ভালো কথাই বলেছে মৌমিতা। প্রবলেম নেই আবার!
একহাতে দস্তানা পরে থাকি বলে অনেকের কাছেই আমাকে জবাবদিহি করতে হয়। কাউকে বলি, এটা আমার এক বিচিত্র শখ। কাউকে বলি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময় এই অভ্যেসটা ডেভেলাপ করেছে। আবার কাউকে বা তিতিবিরক্ত হয়ে বলি, আমার বাঁ-হাতে স্কিন ডিজিজ আছে।
কিন্তু আসল ব্যাপারটা যে কী সেটা একজন ছাড়া কাউকে বলিনি–অন্তত এখনও। কৌতূহল থাকাটা দোষের নয়। সুতরাং মৌমিতার কোনও দোষ নেই। ব্যাপারটা ওর জানতে ইচ্ছে করতেই পারে। তাই ওর প্রশ্নের উত্তরে বললাম, মৌ, বলতে কোনো প্রবলেম নেই। তবে..মানে…এর পেছনে একটা ইন্টারেস্টিং স্টোরি আছে…।
ও বড়-বড় চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই? তা হলে বলো প্লিজ…।
রেস্তোরাঁর ছায়া-ছায়া আলোয় আমি ওকে ভালো করে দেখতে চাইলাম।
মৌমিতা। লম্বা স্লিম চেহারা। মাথার একরাশ চুলে সোনালি রঙের ঝিলিক। লম্বাটে ফরসা মুখ। টানা-টানা চোখ। এই চোখে চোখ পড়লে নজর ফেরানো যায় না। চোখা নাক। সামান্য ফোলা দু-ঠোঁট যেন সবসময়েই দুষ্টু হাতছানি দিচ্ছে।
মৌমিতাকে আমি ভালোবাসি। খুব সাধ ওকে নিয়ে বাকি জীবনটা একসঙ্গে থাকব। আমার ভেসে-বেড়ানো দিকশূন্য ছন্নছাড়া জীবনে ও সারথি হয়ে আসুক। আমাকে সামলে নিক। আমার সুখ-দুঃখের শরিক হোক। আমার অভিভাবক হয়ে উঠুক।
মৌমিতাকে এখনও এসব কথা বলিনি। দস্তানার গল্পটা বলার পর বলব। মনে হয় না ও আমাকে ফিরিয়ে দেবে।
আমি বেয়ারাকে ডেকে বিল দিতে বললাম। তারপর মৌ-কে চাপা গলায় বললাম, এখানে নয়–গল্পটা তোমাকে গাড়িতে যেতে-যেতে বলব।
ও খুব খুশি হল। কোল্ড ড্রিঙ্কের খালি গ্লাসটা একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, সোনু, আই লাভ য়ু…।
আমি বললাম, গল্পটা তো এখনও শোনোনি…আগে শোনো…তারপর…।
বিল মিটিয়ে আমরা দুজনে উঠে পড়লাম। রেস্তোরাঁর কাচের দরজার কাছে এসে দেখি বৃষ্টি পড়ছে–তবে তেমন জোরে নয়। আমি আর মৌ হাত ধরাধরি করে ছুট লাগালাম গাড়ি লক্ষ করে।
গাড়িতে গুছিয়ে বসার পর মৌ বলল, বৃষ্টিটা হেভি রোম্যান্টিক–তাই না?
তুমি পাশে থাকলে আমার কাছে মরুভূমিও রোম্যান্টিক লাগবে।
হোয়াও! বলে আমার জামা ধরে টান মারল মৌ। ঠোঁটজোড়া ছুঁচলো করে ছোট্ট ঠোকরানো চুমু খেল গালে।
জানলার কাচ তোলাই ছিল। হালকা করে এসি চালিয়ে দিলাম। তারপর পার্কিং লট থেকে গাড়ি তুলে নিয়ে এলাম বৃষ্টিভেজা রাস্তায়।
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে গেল এপাশ থেকে ওপাশে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকল।
বৃষ্টির জন্যে রাস্তা দেখতে অসুবিধে হচ্ছিল বলে ওয়াইপার চালিয়ে দিলাম। ড্যাশবোর্ডের ঘড়ির দিকে চোখ গেল। আটটা ঊনচল্লিশ।
নাঃ, রাত বেশি হয়নি। ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে মৌ-কে বাড়িতে পৌঁছে দিলেই হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সাইডরোডে ঢুকে পড়লাম। এ-রাস্তাটায় গাড়ি-টাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। দোকানপাটও চোখে পড়ছে না। আলো বলতে রাস্তার দুপাশের ল্যাম্পপোস্টগুলোর সোডিয়াম বাতি।
মৌমিতার দিকে তাকিয়ে বললাম, এই দস্তানার ব্যাপারটা তোমার অনেকদিন ধরেই জানতে ইচ্ছে করছে, তাই না?
হ্যাঁ। য়ু আর স্মার্ট, সোনু। তোমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকেই এটা আমার কাছে একটা বিশাল কিউরিয়োসিটি…। আজ কৌতূহল চাপতে না পেরে তোমাকে স্ট্রেটকাট জিগ্যেস করে ফেলেছি..। হঠাৎ কী ভেবে ও বলল, তুমি কি মাইন্ড করলে, সোনু? তা হলে থাক…।
ওহহো, কী যে বলো! হোয়াই শুড আই মাইন্ড? কথা বলতে-বলতে ঝুঁকে পড়ে ওর মাথায় একটা চুমু খেলাম ও তোমাকে সবকিছু খুলে বলতে পারলে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু আগে থেকেই বলে রাখছি, গল্পটা শুনলে তুমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না।
