ঘুমোলে অংশুমানের সামান্য নাক ডাকে। এখনও তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কৃষ্ণা ঘরে এসেছিল আলনা থেকে ওর একটা শাড়ি নিতে। তখনই ও দেখতে পেল সাপটাকে।
ধবধবে সাদা বালিশের ওপরে সাপটা ঘুরে বেড়াচ্ছে!
অংশুমান চিত হয়ে শুয়ে ছিল। ফলে অতি সহজেই সবুজ লিকলিকে সাপটা বেরিয়ে এসেছে ওর কানের ফুটো দিয়ে। ওটার শরীরের প্রায় ফুটখানেক বালিশের ওপরে দিব্যি নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। তবে এবারেও সেই লেজের দিকটা। বাকি অংশটা লুকিয়ে রয়েছে অংশুমানের শরীরের ভিতরে।
কৃষ্ণার মনে হল, সাপটা যেন কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু লেজের দিক দিয়ে কোনও সরীসৃপ কি কখনও কিছু খুঁজে বেড়ায়।
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কৃষ্ণা। ওর বুকের ভিতরে কেউ যেন নুন আর বরফের হিমমিশ্রণ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ওর চোখের নজর ঝাপসা হয়ে গেল। গোটা ঘরটা উজ্জ্বল সবুজ রঙে ভরে গেল, তার মাঝে-মাঝে হলুদ আর কালো বুটি।
তারপর যে-চিৎকার কৃষ্ণার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল তাকে মানুষের চিৎকার বলা যায় না। সে-চিৎকার কোনও পশু, অথবা পিশাচের।
পরক্ষণেই কৃষ্ণা চেতনা হারিয়ে ফেলেছিল।
অংশুমান চমকে জেগে উঠেছিল। ওর চেষ্টায় মিনিটদশেকের মধ্যেই কৃষ্ণার জ্ঞান ফিরে এসেছিল। কিন্তু এরপর একটি মুহূর্তও ও অংশুমানের ফ্ল্যাটে থাকতে চায়নি।
অংশুমান ওকে অনেক বুঝিয়েছে, অনেক কান্নাকাটি করেছে, কিন্তু কৃষ্ণাকে ও ধরে রাখতে পারেনি। কৃষ্ণা সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে চলে গেছে ওর মায়ের কাছে।
অংশুমানের মনে হয়েছিল কৃষ্ণার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাই ও সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর কথাও বলেছিল, কিন্তু কৃষ্ণা তাতে আগুনের শিখার মতো ফুঁসে উঠেছিল।
লুকিয়ে থাকা একটা সাপ শেষ পর্যন্ত ওদের ভালোবাসার বিয়েটাকে তছনছ করে দিল।
.
গল্প শেষ করে থামল বিনু। ওর মুখে কেমন যেন এক মলিন বিষণ্ণ ছাপ। টিউব লাইটের আলো তেরছাভাবে ওর মুখে এসে পড়েছে। ও এমন এক শূন্য দৃষ্টিতে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন কৃষ্ণা-অংশুমানের ঘটনাটা এখনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
একটা থমথমে অস্বস্তি ঘরের মধ্যে জাঁকিয়ে বসেছিল। সেটা হালকা করার চেষ্টায় আমি বললাম, তোর এই গল্প বিশ্বাস করা যায় না। একেবারে আজগুবি। কারও কান দিয়ে কখনও সাপের লেজ বেরোতে পারে!
বিনু মলিনভাবে হাসল, বলল, বিশ্বাস কর, যা বললাম তার এক ফোঁটাও মিথ্যে নয়। ওই সময়ে কৃষ্ণাকে আমি দেখেছি…ওর চেহারা আধখানা হয়ে গিয়েছিল…ওর দিকে তাকানো যেত না…।
ঠিক তখনই বিনুর কানের দিকে আমার নজর গেল।
ওর বা কোন দিয়ে ধীরে-ধীরে বেরিয়ে এসেছে একটা সরীসৃপের লেজ। লালায় ভেজা কালো হলুদ ডোরাকাটা চকচকে তার দেহ। ওটা কখনও সড়সড় করে বেরিয়ে এসে লম্বায় বাড়ছে, কখনও আবার ঢুকে পড়ছে বিনুর কানের ভিতরে। অথচ বিনু কিছুই টের পাচ্ছে না। আপনমনে বিড়বিড় করে কথা বলে যাচ্ছে।
আমি ভিতু নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে-ভয়ংকর চিৎকার আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল তাকে মানুষের চিৎকার বলে চিনে নেওয়া খুব শক্ত। আমি আঙুল তুলে বিনুর কানের দিকে দেখালাম। একটা জান্তব গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এল আমার মুখ দিয়ে। জড়ানো গলায় কোনওরকমে বললাম, বিনু! সাপ! সাপ!
বিনু নরমভাবে হেসে হাত বাড়াল নিজের বাঁ কানের দিকে। কিন্তু সাপটার লেজের দিকে কি চোখ আছে? ওটা বিনুর হাতের নাগালকে একচুলের জন্যে ফাঁকি দিয়ে নিঃশব্দে সড়সড় করে ঢুকে গেল কানের ভিতরে।
আমি ভয়ার্ত চোখে বিনুর দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তি হয়ে বসে রইলাম। আমার বুকের ভিতরে এক অস্থির কঁপুনি শুরু হল। মাথার ভিতরে যুক্তি-তর্ক-বিজ্ঞান সবকিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল।
বিনু আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তুইও সাপ দেখছিস! আসল ব্যাপারটা কী জানিস? আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা করে সাপ আছে। কারও কারও বেলায় সেটা দেখা যায়, আর অন্যদের বেলায় দেখা যায় না…।
সুখের সংসার ডট কম
ভোরের আলো ফুটেছিল অনেক আগেই, কিন্তু সেটা দেখেও বিছানা ছেড়ে উঠতে চাননি লাবণ্য। কেমন একটা আলসেমি ওঁকে জড়িয়ে ধরেছিল আজ। রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোন তার জন্য একটা ঝিমুনিভাব থাকেই, কিন্তু গত রাতে কয়েকটা স্বপ্ন কেমন একটা বাড়তি ঘুমের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। স্বপ্নের গল্পগুলো মনে নেই, তবে তাতে প্রমথনাথকে যে দেখেছেন, সেটা মনে আছে।
স্বামী প্রমথনাথ চলে গেছেন প্রায় আটবছর। একটা অভাব তার জন্য থাকবেই সেটা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু অন্য আরও যেসব অভাবের গল্প নানানজনের কাছে শোনেন…।
মা, উঠে পড়ুন…অনেক বেলা হয়ে গেছে।
ঘরে ঢুকে পড়েছে মধুমিতা–এ-বাড়ির একমাত্র বউ। মিষ্টি মুখ, স্বভাবও। রোগা তরতরে চেহারা। সবসময় একাজ সে কাজ নিয়ে ছটফট করছে। এখন পুবের জানলাদুটোর পরদা সরিয়ে দিল। তারপর খুলে দিল পুবের ঝুলবারান্দার দরজা।
সঙ্গে-সঙ্গে কত কী যে ঝাঁপিয়ে ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে! পাখির ডাক, ফুলের গন্ধ, হুটোপুটি রোদ্র। প্রমথনাথের এগুলো খুব প্রিয় ছিল। বড় শখ করে পুবের এই বারান্দা তৈরি করেছিলেন। সূর্য উঠলে প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়বে বারান্দায়, এবং সেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যস্তবের মন্ত্র আওড়াবেন প্রমথনাথ।
