কথা থামিয়ে কিছু একটা শোনার প্রত্যাশায় রঘুপতি স্যারের দিকে তাকিয়ে রইল।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত নতুন একটা সিগারেট ধরালেন। কয়েকবার ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, বলরামবাবুর ঘরের জানলায় গ্রিল বসানো আছে নিশ্চয়ই?
রঘুপতি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতে চাইল। তারপর ও সেইজন্যেই তো ক্লোজড রুম প্রবলেম। আর সতীনাথ চৌধুরী ভীষণ পলিটিক্যাল প্রেশার তৈরি করেছেন। তাই তো লালবাজারকে নাক গলাতে হয়েছে। এখন আপনি যা করার করুন। আই ওয়ান্ট দ্য ব্লাডি মার্ডারার।
রঘুপতি কখনওই খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল না। কিন্তু ভীষণ সৎ আর পরিশ্রমী। তাই এসিজি বরাবরই ওকে পছন্দ করতেন, এখনও করেন। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এসিজি একটা অসহায় ভাব খুঁজে পেলেন। ওর মুখের বসন্তের দাগ কিংবা ছোট করে ছাঁটা চুল সেই ভাব লুকোতে পারেনি।
আর রেয়ার কয়েনের ব্যাপারটা? এতক্ষণ চুপ করে শোনার পর জয়দেব সরকার আমতা আমতা করে প্রশ্ন করলেন। জানলা দিয়ে আসা আলো ওঁর কপালের ডান দিকে হাইলাইট তৈরি করেছে।
রঘুপতি অস্পষ্ট একটা শব্দ করে তারপর বলল, ওটা স্পটে গেলেই বুঝতে পারবেন। বডি রিমুভ করে ঘরটা লক করে রাখা হয়েছিল। ঘরের সব জিনিসপত্র যেমন ছিল তেমনই আছে। আমি চাবি নিয়ে এসেছি। আর লোকাল থানাকেও ইনফর্ম করা আছে যে, আমরা স্পটে আজ সকলে যাব। কিউ, গুপ্তাসাব, অব চলে? শেষ প্রশ্নটা চোখ বুজে সিগারেটে টান দেওয়া পাজামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষটিকে লক্ষ্য করে।
চোখ খুললেন এসিজি। বললেন, চলো, যাওয়া যাক। ব্যাপারটা একটু-একটু বোঝা গেল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে অশোকচন্দ্র বললেন, রঘুপতি, একটা ব্যাপার কেমন মজার দ্যাখো। যে-ঘরে ওরা সবাই গায়ের জোরে দরজা ভেঙে ঢুকেছে, সেই ঘর থেকে খুনি পালিয়েছে বুদ্ধির জোরে। হাসলেন বৃদ্ধ থিঙ্কিং মেশিন।
রঘুপতি পালটা হেসে ডান হাতের মাল ফুলিয়ে বলল, এখন তো আমার গায়ের জোর আর আপনার বুদ্ধির জোরদুটো নিয়েই আমরা যাচ্ছি। অব দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজু এ কাতিল মে হ্যায়।
প্রাক্তন ছাত্রের কথা শুনে প্রাক্তন স্যার হো-হো করে হেসে উঠলেন। আর সেই আচমকা হাসিতে তার ঠোঁট থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা খসে পড়ে গেল–তিনি চেষ্টা করেও সেটা সামলাতে পারলেন না।
*
সল্টলেক জায়গাটা কলকাতার কত কাছে, অথচ কত দুরের বলে মনে হয়। কলকাতা শহরের যানজট, গাড়ির হর্নের তীব্র শব্দ, কালো ধোঁয়া, ভিড়, চিৎকার, কিছুই এখানে নেই। তা ছাড়া বাড়িগুলোর দিকে তাকালেই কেমন চোখ জুড়িয়ে যায়।
বলরাম চৌধুরীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ঠিক এই কথাটাই মনে হচ্ছিল এসিজি-র।
প্রকাণ্ড মাপের বাড়ি। নাম চৌধুরী ভিলা। সাদা আর বাদামি রং। বড় লোহার গেটের ওপাশে বড় উঠোন। তার একপাশে সারি-সারি টবে ফুলগাছ। আর বাঁদিকে বেশ বড় মাপের বাগান।
বাড়িতে ঢুকতে-না-ঢুকতেই ফরসা মতন একটা বাচ্চা ছেলে ছুটে এল বাগানের পাশ দিয়ে। তার নাদুসনুদুস চেহারা। মাথায় গামছা দিয়ে তৈরি পাগড়ি। গায়ে মেরুন রঙের পাঞ্জাবি, পায়ে সরু পাজামা, আর কোমরে বেল্ট৷
বাচ্চাটা সাবু! সাবু! বলে চিৎকার করছিল। এসিজিদের দেখামাত্রই চিৎকার করে উঠল, সাবু! জলদি এসো। দেখে যাও কারা এসেছে।
রঘুপতি যাদব অশোকচন্দ্রের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, কুন্তল।
এসিজি ইশারায় ছেলেটাকে কাছে ডাকলেন, জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী?
কুন্তল বেশ স্মার্টভাবে উত্তর দিল, এখন আমি চাচা চৌধুরী।
এসিজি অবাক হয়ে বললেন, চাচা চৌধুরী মানে?
খিলখিল করে হেসে উঠল কুন্তল ও এ মা, চাচা চৌধুরীর নাম জানে না! চাচা চৌধুরীর কমিক্স বই পড়োনি?
এসিজির অতিকষ্টে মনে পড়ল যে, ম্যাগাজিনের স্টলে এই নামে কমিক্স দেখেছেন, এবং সেই চৌধুরী বানানে কোনও উ-কার ছিল না।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখেছি। সাত-তাড়াতাড়ি জবাব দিলেন তিনি।
জানো, চাচা চৌধুরীর বুদ্ধি কম্পিউটারের চেয়েও প্রখর!
এসিজি সায় দিয়ে ঘাড় নাড়লেন।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বাগানের দিক থেকে ছুটে এল আর-একটি ছেলে। বয়েস ষোলো-সতেরো। ময়লা রং। পরনে শুধু একটা হাফ প্যান্ট। পাঁজরা গোনা যাচ্ছে।
হুকুম করুন, চাচা চৌধুরি– বলতে-বলতে ছুটে আসছিল ছেলেটা। কিন্তু তিনজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর কথা আটকে গেল মাঝপথেই।
ও হচ্ছে সাবু– নতুন বালকটির দিকে আঙুল দেখিয়ে গম্ভীরভাবে মন্তব্য করল কুন্তল।
রঘুপতি বিড়বিড় করে বলল, এর নাম বিলু। এ-বাড়িতে ফাইফরমাশের কাজ করে।
অশোকচন্দ্র কুন্তলকে জিগ্যেস করলেন, সবসময় তোমরা এমনই খেলা করো?
না, না। যখন বিলুদার কোনও কাজ থাকে না তখন খেলি।
চাচা চৌধুরী আর সাবু সেজে কী করো?
সারা বাড়ি আর বাগানে ঘুরে-ঘুরে বেড়াই। দেখি কোথাও কোনও বিপদ হচ্ছে কি না। জানো তো, চাচা চৌধুরী সবার খুব উপকার করে। কাউকে ভয় পায় না। আর সাবুর গায়ে এমন জোর যে, উড়ন্ত এরোপ্লেনকে ধরে আছাড় দিতে পারে…।
শেষ কথাটা শুনে বিলু সাদা-সাদা দাঁত বের করে সরল হাসি হাসল।
জয়দেব সরকার একটু বিরক্ত হচ্ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামনে ফেলে রেখে বাচ্চাদের সঙ্গে এই গালগল্প! এ-গল্প তো পরেও করা যেত!
অধৈর্য হয়ে পড়েছিল রঘুপতিও। ও চাপা গলায় বলল, স্যার গপসপ পরে হবে। আগে চলুন, বলরাম চৌধুরীর কামরাটা দেখবেন চলুন।
