সুতরাং, একরকম ব্যর্থ হয়েই, বেলা দেড়টা নাগাদ নেহাদের বাড়িতে ফিরলেন প্রিয়নাথ। তবে ফেরার কাজটা মোটেও সহজ হয়নি। বহু লোককে জিগ্যেস করে নানান গাছ আর বাড়ির নিশানা দেখে অবশেষে ফিরতে পেরেছেন।
কিন্তু আশ্চর্য! নেহাদের বাড়িটা সেই সকালের মতোই একা-একা দাঁড়িয়ে আছে। ওরা এখনও বাড়ি ফেরেনি।
খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা প্রিয়নাথ পথেই সেরে এসেছিলেন। এখন কোনওমতে স্নান সেরে নিয়ে নিজের ঘরে আস্তানা গাড়লেন। নোটবই বের করে তাতে আধঘণ্টা ধরে নানারকম মন্তব্য লিখলেন।
প্রিয়নাথ যখনই কোনও অভিযানে বেরোন তখনই সঙ্গে নেন তার বিশেষ সরঞ্জামের থলে। এবারও সেটা সঙ্গে এনেছেন। তাতে আছে ক্যামেরা, টর্চ, প্রচুর ব্যাটারি, মোমবাতি, মার্কার, থার্মোমিটার, কম্পাস আর পেন্ডুলাম।
হঠাৎ কী মনে হওয়াতে সুটকেস খুলে থলে থেকে পেন্ডুলামটা বের করে নিলেন। সুতো ধরে ঝুলিয়ে ওটাকে দোলাতে লাগলেন। দুলুনিটা সামান্য এলোমেলো হচ্ছে বলে প্রিয়নাথের মনে হল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। ঠান্ডা বাতাসে গায়ে কাঁটা দিল।
প্রিয়নাথ পেন্ডুলামটা রেখে দিলেন। দরজা বন্ধ করে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লেন খাঁটিয়ায়। মনে-মনে ঠিক করলেন, এখানে দু-একদিনের বেশি আর থাকবেন না। সুনীতের ভয় পাওয়ার রহস্যের কাছে হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁকে হার মানতে হবে।
.
সন্ধের আঁধার নেমে আসতেই প্রিয়নাথ হ্যারিকেন জ্বেলে নিয়েছেন। মনে-মনে ভেবেছেন, নেহারা যদি নিতান্তই আর না ফেরে তা হলে ওদের রান্নার জায়গা হাতড়ে যা পাবেন তাই দুটো মুখে গুঁজে দিয়ে কোনওরকমে রাতটা কাটিয়ে দেবেন। তারপর ভোর হলেই মহাবীরের চিনিয়ে দেওয়া পথ ধরে সোজা চম্পট।
কিন্তু তার আর দরকার হল না।
সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ নেহাদের কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেলেন প্রিয়নাথ।
বেশ অবাক হয়ে ঘর থেকে বেরোতে যাবেন, তার আগেই চঞ্চল পায়ে নেহা ঘরে এসে ঢুকল।
বাবুজি, ভালো আছেন। ওর মুখে সেই একই নিষ্পাপ হাসি।
তোমরা হুট করে কোথায় চলে গিয়েছিলে!
মাথা নীচু করল নেহা। তারপর অপরাধীর চোখে প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে বলল, বাবুজি, রাগ করবেন না। রোজ আমাদের ওরকম চলে যেতে হয়। রাত পেরোনোর আগেই আমরা চলে যাই…আবার অন্ধেরা নেমে এলে ফিরে আসি।
কোথায় যাও? কী দরকার সেখানে, যে রোজ যেতে হয়! প্রিয়নাথ একটু যেন বিরক্তই হলেন।
আপনার জন্যে চা নিয়ে আসি। এসে সব বলছি–। বেণী দুলিয়ে নেহা চলে গেল।
মিনিট পাঁচেক পরেই নেহা ফিরে এল। হাতে গরম চায়ের গ্লাস।
প্রিয়নাথের হাতে গ্লাসটা দিয়ে কাল রাতের মতোই মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর খানিকটা যেন বিষণ্ণ গলায় বলল, রোজ আমাদের যেতে হয়, বাবুজি। কেন যেতে হয় সেটা..আপনি আজ আমাদের সঙ্গে যাবেন?
নেহার প্রস্তাবটা এত আচমকা এল যে, প্রিয়নাথ সঙ্গে-সঙ্গে কোনও জবাব দিতে পারলেন না।
নেহা আপনমনে বিড়বিড় করে বলে চলল, আমাদের বাড়িতে যেসব মেহমান আসে তাদের আমরা সঙ্গে নিয়ে যাই। আমরা…ওখানে গেলে আপনি ফোটো খিচতে পারবেন। শেষ কথাটা নেহা বেশ উৎফুল্ল ঢঙে বলল। উৎসাহ নিয়ে তাকাল ভূতনাথের দিকে।
প্রিয়নাথের মধ্যে কেমন একটা মরিয়া ভাব জেগে উঠেছিল। তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন,
সুনীতবাবু তোমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন…ছবি তুলতে…।
হ্যাঁ, গিয়েছিলেন। ঘাড় নেড়ে বলল নেহা। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল, ওই বাবুর নাম তো জানি না।
আমি আজ তোমাদের সঙ্গে যাব।
চাটাই ছেড়ে উঠে পড়ল নেহা। খুশির গলায় বলল, যাই, মা আর পিতাজিকে বলে আসি। রাতে আপনার খাওয়া হলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।
খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে গাঢ় আঁধার ও শীতের মধ্যে প্রিয়নাথ যখন ওদের সঙ্গে বেরোলেন তখন রাত সাড়ে নটা।
শীতের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে প্রিয়নাথের চেহারা মাপে প্রায় সুমো যোদ্ধাদের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে। সঙ্গের ঝোলা ব্যাগে ক্যামেরা ছাড়াও নিয়েছেন, টর্চ, টর্চের ব্যাটারি, কম্পাস, থার্মোমিটার আর পেন্ডুলাম।
অন্ধকারে কুয়াশা ভেদ করে আরও অন্ধকার পাঁচটা ছায়া এগোচ্ছিল। সকলের আগে প্রিয়নাথ আর নেহা। পিছনে বাকি তিনজন। কারও মুখে কোনও কথা নেই। যেন শবানুগমনে চলেছে সবাই।
প্রিয়নাথ হঠাৎই হোঁচট খেলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে টর্চ জ্বাললেন। নেহা সঙ্গে-সঙ্গে বলল, আলো নিভিয়ে দিন, বাবুজি। আমি আপনার হাত ধরছি।
অন্ধকারে প্রিয়নাথের হাত ধরল নেহা।
স্পর্শে সম্মোহন করা যায় কি না প্রিয়নাথ জানেন না। আর প্রিয়নাথের যেরকম মন এবং বয়েস তাতে কিশোরী নেহাকে নিয়ে কোনওরকম অন্যায় কল্পনা তাঁর কাছে নেহাতই হাস্যকর। কিন্তু তবুও কোনও এক রহস্যময় কারণে নেহার হাত ছুঁতেই প্রিয়নাথ কেমন এক অলৌকিক ভরসা পেলেন।
আকাশ মেঘলা, চঁদ দেখা যাচ্ছে না। প্রিয়নাথদের ঘিরে রেখেছে গাঢ় কুয়াশার স্তর। বেশি দূর নজর চলে না। ঠান্ডা বাতাস যেন বাতাস নয় বরফ। প্রিয়নাথ জ্যাকেটের ওপরে শাল জড়িয়েছেন। সেটাকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছেন শরীরে। আড়ষ্টভাবে সাবধানে পা ফেলছেন। অথচ নেহার চলা কত সহজ-স্বাভাবিক! এ-পথ নিশ্চয়ই ওর অনেক চেনা।
বেশ কিছুক্ষণ পথ হাঁটার পর প্রিয়নাথের সময়, দিক, সবই গুলিয়ে গেল। অকারণেই একটা ভয় তার মনের ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইল। তিনি লড়াই করে সেটাকে চৌকাঠের বাইরে আটকে রাখলেন।
