তোমার, শুধু তোমার
ঝুমুর
চিঠিটা পড়ার পর সুপ্রতিম কিছুক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে বসে রইল। ঝুমুরকে ঘিরে এলোমেলো চিন্তা ছুটোছুটি করতে লাগল ওর মাথার ভেতরে। মেয়েটি কেমন যেন অস্বাভাবিকভাবে নাছোড়বান্দা। তা ছাড়া চিঠির কোনও-কোনও জায়গায় কি পাগলামির লক্ষণ ফুটে বেরোচ্ছে? নইলে সুস্থ কোনও মেয়ে হলে প্রথম চিঠির এড়িয়ে যাওয়া উত্তরেই তো সব বুঝতে পারত, আর তার ভালোবাসার অসুখটাও সেরে যেত।
ঝুমুর বাড়িতে ফোন করতে পারে ভেবে সুপ্রতিম একটু ভয়ও পেল। যদি ও সত্যি পাগল এবং নাছোড়বান্দা হয় তা হলে তো ফোন করে করে জ্বালিয়ে মারবে! তখন হয়তো পুলিশে খবর দেওয়া ছাড়া গতি থাকবে না। আর পুলিশে খবর দিলেই তো যত ঝামেলা! বাজে পাবলিসিটি!
আচ্ছা, ও যদি টেলিফোন ডিরেক্টরিতে সুপ্রতিমের ঠিকানা জেনে বাড়িতে এসে হাজির হয়! তা হলে তো আবার সেই থানা-পুলিশ!
প্রায় দু-দিন নানান দুশ্চিন্তার পর সুপ্রতিমের আশঙ্কা ধীরে-ধীরে কেটে গিয়েছিল। ও নয়নাকে বলে রাখল ঝুমুর চৌধুরী নামের কেউ ফোন করলে নয়না যেন বলে দেয় রং নাম্বার।
পরের দু-দিনে তিনবার ঝুমুরের ফোন এল। রং নাম্বার বলে ওকে কাটাতে পারেনি নয়না। তার মধ্যে দুবার সুপ্রতিম সত্যিই বাড়ি ছিল না। আর একবার নয়না আড়চোখে সুপ্রতিমের দিকে তাকিয়ে ফোনে বলে দিল, উনি তো এখন বাড়ি নেই।
কখন ওঁকে পাওয়া যাবে বলুন তো?
ওঁর তো ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা মতন হবে। আপনি বরং প্রোগ্রাম চলার সময় স্টুডিয়োতে ট্রাই করে দেখুন।
ঠিক আছে। স্টুডিয়োতেই ট্রাই করব। রিসিভার নামিয়ে রেখেছিল ঝুমুর।
নয়না সুপ্রতিমের দিকে ফিরে বলল, মেয়েটার গলাটা যেন পিকিউলিয়ার।
পিকিউলিয়ার মানে? ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করেছে সুপ্রতিম।
কেমন যেন আদুরে, খসখসে।
হো-হো করে হেসে উঠেছে সুপ্রতিম। হাসতে হাসতে বলেছে, আদুরে! খসখসে! মাই গুডনেস। কী বিচিত্র অ্যাডজেটিভ! তুমি সেলাই ছেড়ে সাহিত্য করলে পারতে।
একটু পরে হাসি থামিয়ে সুপ্রতিম সিরিয়াস ঢঙে জানতে চাইল, অ্যাই, মেয়েটার বয়েস কীরকম হবে বলো তো? আঠেরো-উনিশ? নাকি চল্লিশ-বিয়াল্লিশ?
ঠিক বোঝা গেল না। সাতাশ-আটাশ হবে বোধহয়। ইতস্তত করে নয়না বলল।
তারপর থেকেই সুপ্রতিম কেমন এক অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটাতে লাগল। ঝুমুর চৌধুরীর ছবিটা ওর কাছে কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছিল না। এ-ধরনের গায়ে-পড়া প্রেমিকাদের ও বহুবার সামাল দিয়েছে। কিন্তু এই প্রথম ও যেন ঠিক ভরসা পাচ্ছিল না। প্রতিদিনই অনুষ্ঠান শুরু করার পর থেকেই ও স্টুডিয়োতে ঝুমুরের ফোনের জন্য ভয়েভয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
আজ ওর মন বলছে, ফোনটা আসবে। আজ ওদের স্টুডিয়োর ব্যস্ত লাইনে টুক করে ঢুকে পড়বে ঝুমুর।
এবং সুপ্রতিমের আশঙ্কাই সত্যি হল। ঝুমুর যে ফোনটা করেছে সেটা ফোনে সাড়া দেওয়ার পরই ও বুঝতে পারল।
হ্যালো–মুশকিল আসান
সু-সুপ্রতিম! আমি গো…আমি বলছি…ঝুমুর…।
নয়না ঠিকই বলেছিল। খসখসে আদুরে গলা। কেমন যেন ফিশফিশ সুরে কথা বলছে।
নিজেকে শান্ত রেখে পেশাদারি ঢঙে কথা বলল সুপ্রতিম, কাইন্ডলি আপনার পুরো নাম বলুন।
ও-প্রান্তের কণ্ঠস্বর একটু ধাক্কা খেল : আমায়…আমায় চিনতে পারছ না! আমি ঝুমুর চৌধুরী। কলকাতা চোদ্দো থেকে বলছি। কত কষ্ট করে তারপর তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারলাম।
ওদের টেলিফোন-ব্যবস্থাটা এমন যে, সব কথাবার্তাই টিভির দর্শকরা শুনতে পান। সেইজন্যেই সুপ্রতিম বেশ বিব্রত হয়ে পড়ছিল। ও ভাবছিল, কন্ট্রোল প্যানেলের একটা সুইচ টিপে টেলিফোনের কথাবার্তা শোনানোর ব্যবস্থাটা অফ করে দেবে কি না। নাকি রিসিভার নামিয়ে রেখে লাইন কেটে দেবে? কিন্তু পাগল মেয়েটা তো রোজ ফোন করার চেষ্টা করে জ্বালাতন করে মারবে।
এইসব ভাবতে-ভাবতে সুপ্রতিম কষ্ট করে পেশাদারি হাসি ফুটিয়ে তুলল মুখে। তারপর ওর নিজস্ব ঢঙে জানতে চাইল, বলুন ম্যাডাম, কী আপনার সমস্যা? মুশকিল আসান নিশ্চয়ই তার সমাধান বাতলে দেবে।
আমার…আমার প্রবলেম তুমি। আমি তোমার সঙ্গে বাড়িতে গিয়ে দেখা করব। যখন..যখন আর কেউ থাকবে না। তোমার ফোন নাম্বার খুঁজে বের করে বাড়িতে তিনবার ফোন করেছিলাম…তোমাকে পাইনি। একটা মেয়ে ফোন ধরে বলে কী, রং নাম্বার। হুঁ, বললেই হল! কে ফোন ধরেছিল? তোমার…তোমার ওয়াইফ?
শেষ প্রশ্নটা দর্শকরা শুনতে পাওয়ার আগেই কন্ট্রোল প্যানেলের সুইচ টিপে কথাবার্তা শোনানোর ব্যবস্থাটা অফ করে দিল সুপ্রতিম। কিন্তু রিসিভার নামিয়ে রাখল না। ঝুমুর চৌধুরী সম্পর্কে একটা কৌতূহল ওর মধ্যে মাথাচাড়া দিল।
হ্যাঁ–আমার বউ নয়না। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। কথাটা বলার সময় আড়চোখে মোনার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল সুপ্রতিম। ওকে হাত নেড়ে ইশারা করল প্রোগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
হুঁ! জানতাম! বিরক্তি ফুটে উঠল ঝুমুরের গলায়। কিন্তু তারপরই ও কেমন অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। খসখসে আদুরে গলার হাসি?
একটু পরে হাসি থামিয়ে চাপা গলায় বলল, কাউকে আমি পরোয়া করি না। কেন জানো? কারণ, আমার ভালোবাসা অন্যরকম। এরকম ভালোবাসা তুমি জীবনে কখনও পাওনি। কবে তোমার বাড়ি যাব বলো? শেষ প্রশ্নটায় যেন কোনও কিশোরীর মিনতি ঝরে পড়ল।
