সানিয়া স্বামীর বাহুতে হাত রেখে নীচু গলায় কীসব বললেন।
ব্রিজেশ চুপচাপ কয়েকবার মাথা নাড়লেন। মনে হল সানিয়ার কথায় সায় দিলেন। তারপর পুলিশের লোকটাকে লক্ষ্য করে শান্ত গলায় বললেন, বলুন, কী জানতে চান।
লোকটা চারপাশে ভিড় জমানো মানুষজনকে আচমকা খেঁকিয়ে উঠল : কী চাই আপনাদের? যান, যান, নিজের নিজের কাজে যান। এখান থেকে ফুটুন। কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা শূন্যে লাঠি নাচিয়েছিল।
ওর ধমকে ভালোই কাজ হল। তা সত্ত্বেও একটু ফাঁকা জায়গায় সরে দাঁড়াল লোকটা ব্রিজেশদেরও ইশারায় ডেকে নিল।
এবার ব্রিজেশের দিকে তাকাল পুলিশ ও একদম শুরু থেকে বলুন। অ্যানিম্যালটাকে প্রথম কখন দেখলেন? তখন ওটা কী করছিল?
ব্রিজেশ এতক্ষণ চুপচাপ থেকে নিজেকে ধাতস্থ করছিলেন। সানিয়ার দিকে একপলক তাকিয়ে প্রাণীটার সঙ্গে ওঁর দেখা হওয়ার ব্যাপারটা খুলে বললেন।
লোকটা চুপচাপ শুনতে লাগল। লাঠি বগলে রেখে ব্রিজেশের স্টেটমেন্ট টুকে নিল। তারপর নোটবই-পেন পকেটে রেখে হাতে হাত ঘষল।
অ্যানিম্যালটা কি আপনাকে অ্যাটাক করতে এসেছিল?
ব্রিজেশ ইতস্তত করে বললেন, না মনে হয়…না।
হুঁ– তা হলে ওটাকে আপনি মারতে গেলেন কেন?
ওটা ওরকম বড় বড় চোখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মানে, না-নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। তাই…।
তাই অ্যাটাক করলেন?
ব্রিজেশ কেমন বিভ্রান্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ। মানে, ওরকমই বলতে পারেন।
চুপচাপ পান চিবাতে লাগল পুলিশ। তারপর শব্দ করে পানের পিক ফেলে বলল, আচ্ছা, দেখুন–এমনও তো হতে পারে, আপনাকে দেখে ওই অ্যানিম্যালটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওটা…।
বাধা দিয়ে ব্রিজেশ বললেন, ওটা দেখতে খুব বীভৎস…।
প্রাণীটার ডেডবডি লক্ষ্য করে তাকালেন ব্রিজেশ। ওটা ঘিরে এখনও লোকজনের ভিড়। সক্কালবেলা এরকম রোমাঞ্চকর দৃশ্য কে ছাড়ে! না, মানুষের পাঁচিল ভেদ করে প্রাণীটাকে দেখা যাচ্ছে না।
পুলিশটা মুচকি হেসে ব্রিজেশকে বলল, আমি যদি বলি, প্রাণীটা আপনার বীভৎস চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
ব্রিজেশ থতোমতো খেয়ে গেলেন। এ আবার কেমন কথা! ব্রিজেশকে দেখতে বীভৎস? আশ্চর্য!
আমাকে বীভৎস দেখতে?
হ্যাঁ হাসল পুলিশঃ ওই প্রাণীটার চোখে। আহা-হা, রাগ করবেন না–এরকম হতেও তো পারে! ফলে জানবেন, আপনার দেখার অ্যাঙ্গেলটাই সব নয়। অন্যদের আঙ্গেলটারও একটা দাম আছে।
সানিয়া ব্রিজেশের কাছ ঘেঁষে এসে স্বামীকে কানে-কানে কী যেন বললেন। ব্রিজেশ হাতের ইশারায় ওঁকে বোঝাতে চাইলেন, ঠিক আছে, দেখছি।
দু-একবার ঢোক গিলে ব্রিজেশ পুলিশটাকে বললেন, দেখুন, যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। এখন ব্যাপারটা কীভাবে মেটানো যায় বলুন।
ভুরু কপালে তুলল পুলিশ ও তার মানে? আমাকে কি আপনি ঘুষ খাওয়ানোর কথা ভাবছেন?
না, না–সে-কথা বলিনি…।
একটা হাত কোমরে রাখল, অন্য হাতে লাঠিটা নাচাল।
কী বলছেন আমি ভালোই বুঝেছি। চমৎকার! একে তো একটা নিরীহ প্রাণীকে বলা নেই কওয়া নেই অ্যাটাক করে খুন করলেন। তার ওপরে একজন সৎ পুলিশকর্মীকে অসৎ করার চেষ্টা করছেন?
সানিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলেন, প্লিজ, অফিসার। ওকে মাফ করে দিন। ও ভুল করে ফেলেছে। প্লিজ!
ব্রিজেশ স্ত্রী-কে প্রায় খিঁচিয়ে উঠলেন, হ্যাভ য়ু গন ক্রেজি, সানি? হোয়াই আর য়ু বেগিং টু আ পেটি কনস্টেবল?
শাট আপ! লোকটা এমনভাবে চিৎকার করে ধমকে উঠল যে, ব্রিজেশের পিলে চমকে গেল। সানিয়ার দিকে তাকিয়ে লোকটা ঠান্ডা গলায় বলল, ম্যাডাম, আপনার ইংলিশ মিডিয়াম স্বামীকে সামলে রাখুন। নইলে, এখানেই ফেলে পেটাতে শুরু করব। পাছায় দু-ডান্ডা দিলে সিধে হয়ে যাবে। কথা বলতে-বলতে লাঠিটা মারাত্মক ভঙ্গিতে উঁচিয়ে ধরল লোকটা। ওর চোখ লাল। মনে হচ্ছে যেন চোখ দিয়ে পান চিবিয়েছে।
ব্রিজেশ সঙ্গে-সঙ্গে আত্মরক্ষার ঢঙে দু-হাত তুলে সরি! সরি! বলে চেঁচিয়ে উঠলেন।
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজের রাগ সামলে নিল পুলিশ। সানিয়াকে দেখে মায়া হল ওর। ব্রিজেশের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, আসলে কী জানেন, আপনাদের মতো প্রাণীদের প্রবলেম হল, যে-জিনিস আপনারা কখনও দেখেননি সেটা আপনাদের শত্রু। আপনাদের চোখে সেটা বীভৎস, ডেঞ্জারাস। তাই তাকে দেখামাত্রই খতম করতে হবে। তক্ষুনি। আরও সহজ করে বলতে হলে, আপনাদের অপছন্দের জিনিসকে আপনারা সহ্য করতে পারেন না।
থু-থু করে পানের পিক ফেলল পুলিশটা। মাথার টুপিটা খুলে নিল। মাথায় হাত বোলাল। তারপর টুপিটা আবার মাথায় বসিয়ে বলল, আমাদের স্বাধীনতার লড়াই লালমুখো ব্রিটিশদের পছন্দ ছিল না। তাই শালারা সেটা ধ্বংস করতে চেয়েছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ কিংবা সিপাহি-বিদ্রোহের বেলায়ও তাই। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা চাওয়ার লড়াই মার্কিন সরকার বা ফরাসি সরকারের পছন্দ ছিল না। তাই কত প্রাণ বেমালুম খরচ হয়ে গেল!
তেমনই আপনি। ওই যে–মরে পড়ে আছে–ওই প্রাণীটা আঙুল তুলে ডেডবডি ঘিরে থাকা জটলার দিকে দেখাল পুলিশ ও ওটা আপনার অপছন্দের ছিল, তাই আপনি ওটাকে সরাসরি খুন করলেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনাকে অনেকেই অপছন্দ করে? যেমন, ওই প্রাণীটা। আপনার অফিস কি ব্যবসায় জড়িয়ে থাকা অনেক লোক। সানিয়ার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে হাসল, বলল, এমনকী আপনার ওয়াইফও হয়তো আপনাকে অপছন্দ করেন।
