ঝুনু বেশ ভয়ের চোখে ভাইকে খানিকক্ষণ দেখল। তারপর সরে পড়ল সেখান থেকে।
সেদিন রাতেও সেই একই ব্যাপার।
রেডিয়োতে গান শোনা পুরন্দরের বরাবরের অভ্যাস। নিজে এককালে সংগীতচর্চা করতেন, হয়তো সেইজন্যই। ট্রানজিস্টর রেডিয়ো হাতে নিয়ে মেজাজে আধুনিক গান শুনতে-শুনতে এঘর ওঘর আর বারান্দা করছিলেন তিনি। বিকুন হঠাৎই বলে উঠল, বাবা, বড় ডার এফেক্ট হচ্ছে।
ডপলার এফেক্ট! পায়চারি থামিয়ে চোখ কপালে তুললেন পুরন্দর।
জানো না, চলতে-চলতে শব্দ করলে সেই শব্দ যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে শোনে, তার মনে হয় শব্দের কম্পাঙ্ক পালটে গেছে।
পুরন্দরের বিষয় ছিল ইকনমিক্স। ডার কী-না কী–এই ব্যাপারটা বোধহয় বিজ্ঞানের। কিন্তু তিনি ধৈর্য না হারিয়ে বিকুনের খুব কাছে এসে মোলায়েম গলায় জিগ্যেস করলেন, ব্যাপারটা আর-একটু খোলসা করে বল তো–ঠিক বুঝলাম না।
বিকুন নড়েচড়ে বসল। বলল, শোনো। তুমি ধরো স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছ। আর দূর থেকে হুইসল বাজিয়ে ট্রেন আসছে। তখন তোমার কানে হুইসলের শব্দটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ শোনাবে। মানে হুইসলের শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে গেছে বলে মনে হবে। আবার এর উলটোটাও হতে পারে। ট্রেন যখন হুইসল বাজিয়ে তোমার কাছ থেকে দূরে চলে যাবে তখন সেই শব্দের তীক্ষ্ণতা অনেক কম মনে হবে। এই ব্যাপারটা প্রথম ব্যাখ্যা করেন অস্ট্রিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী সি. জে. ডলার।
পুরন্দর ছেলের কথা শুনতে-শুনতে রেডিয়োর সুইচ অফ করে দিয়েছিলেন। এবার হাঁ করে নিজের ছেলেকে দেখতে লাগলেন।
বিকুন এতটুকু বিচলিত না হয়ে বলল, এরকম করে তাকিয়ে থেকো না, বাবা, তোমার রেটিনার ক্ষতি হতে পারে। রেটিনার যেসব রড আর কোন রয়েছে…।
পুরন্দর ছেলেকে বাধা দিলেন, থাক, থাক, আর তোকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।
তখন বিকুন বলল, বড় গরম লাগছে। পাখার আর. পি. এম.-টা একটু বাড়িয়ে দেবে, বাবা?
আর. পি. এম.!
রিভোলিউশানস পার মিনি–টসংক্ষেপে আর. পি. এম.। তোমরা যাকে চলতি কথায় স্পিড বলো আর কী!
পাখার স্পিড বাড়িয়ে ফুলস্পিড করে দিলেন পুরন্দর। তারপর মানে-মানে সরে পড়লেন ছেলের কাছ থেকে।
রাতে এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আড়ালে একটু আলোচনা করতে চাইলেন পুরন্দর।
সোমা প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থায় নিজের হেনস্থার কথা জানালেন স্বামীকে। বললেন, আর বোলো না! আজ সকালে বিকুন রান্নাঘরে ঢুকে আমাকে খাবার-দাবারের ক্যালরি, মেটাবলিজম, গ্যাসের দহন, পরিবেশ দূষণ এসব নিয়ে একেবারে নাজেহাল করে ছেড়েছে। তারপর বলে কী, নুনের মধ্যে আছে সোডিয়াম আর ক্লোরিন। নুন নোনতা। আর চিনির মধ্যে আছে কার্বন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন। চিনি মিষ্টি। এরকম তফাত হল কেন? তারপর টাইঅ্যালিন নামে কী একটা জিনিসের নাম করে বলল, ওটা নাকি একটা এনজাইম, আমাদের থুতুর মধ্যে আছে। আবার সেটার বানান নাকি পি অক্ষর দিয়ে শুরু। আমি তখন তরকারিতে হলুদগুঁড়ো দিচ্ছিলাম, বলে কি হলুদের মধ্যে কী কী রাসায়নিক উপাদান আছে বলো তো মা।সোমা কাতর গলায় অনুযোগ করে বললেন, তুমি বলো, এসব আমি কখনও বলতে পারি?
পুরন্দর সিগারেট খাচ্ছিলেন। তাতে হিংস্রভাবে এক লম্বা টান মেরে বললেন, বিকাশ বর্ধন বলেছিলেন, ঠিক তিনদিন এর এফেক্ট থাকবে। তিনদিন শেষ হতে আর কত ঘণ্টা বাকি আছে বলো তো?
সোমা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, প্রায় সাঁইতিরিশ ঘণ্টা!
সাঁইতিরিশ ঘণ্টা! সাঁইতিরিশ ঘণ্টা বিকুনের বুদ্ধিবৃদ্ধির এফেক্ট ঠিকমতো সহ্য করতে পারলে হয়! ভাবলেন পুরন্দর।
.
ব্যাপারটা যে ঝুনুর পক্ষেও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা পরদিন ওর অসহায় অবস্থা দেখেই বোঝা গেল। ও মাকে এসে অভিযোগ জানাল, বিকুনের সঙ্গে এক ঘরে বসে ও আর পড়বে না। বিকুন প্রায় মিনিটে মিনিটে ওকে থামিয়ে দিয়ে কীসব উলটোপালটা বোঝাচ্ছে।
সোমা ঝুনুকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু ঝুনুর তখন শান্ত হওয়ার মতো মনের অবস্থা আর নেই। ও প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল, সব তো মনে নেই…তবুও ওর যে কটা প্রশ্ন মনে আছে শোনো। ওডোমিটার কাকে বলে? ইংল্যান্ডের কোন রাজা ইংরেজি বলতে পারতেন না। জেরান্টোলজিস্টরা কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন? মোটরগাড়ির চাকায় খাঁজ কাটা থাকে কেন? বাংলাভাষায় কোন তিনটে অক্ষরের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি? ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে বিজ্ঞানী স্টিফেন কী যেন…।
সোমা সত্যি-সত্যি কেঁদে ফেললেন। বললেন, এ কী বিপদে পড়লাম বল তো! এ কী সর্বনাশ হল আমাদের!
ঝুনু হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল, আর সর্বনাশ! অপর্ণাদি বলেছেন বিকুন সামনে বসে থাকলে উনি আমাকে আর পড়াবেন না।
অপর্ণাদি ঝুনুর প্রাইভেট টিউটর। সেন্ট্রাল ক্যালকাটা গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা। প্রায় তিনবছর ধরে ঝুনুকে পড়িয়ে আসছেন।
সোমা কান্না থামিয়ে চোখ বড় বড় করে জিগ্যেস করলেন, সে কী! অপর্ণাদিকে বিকুন আবার কী করেছে?
কী আবার, ওই আই. কিউ.-র ওভারডোজ! বিরক্তভাবে বলল ঝুনু।
সোমা দুশ্চিন্তায় চোখ বুজে ফেললেন। বোধহয় ভগবানের নাম-টাম নেওয়ার চেষ্টা করলেন। সত্যি, শেষ পর্যন্ত কী যে হবে কে জানে! ছেলেটা এ দু-দিনে একটাও ছবি আঁকতে বসেনি, এক লাইনও কবিতা আওড়ায়নি। বারান্দায় একটিবারও যায়নি গাছপালা বা পাখি দেখতে। তা ছাড়া, বিকেলে আজ আর খেলতে বেরোয়নি। কাল সন্ধের মুখে বাড়ি ফিরে এসে গম্ভীর গলায় মাকে বলেছে, আমি আর টিটো, তাতন, চুনির সঙ্গে খেলব না। ওরা আমার সঙ্গে খেলতে চাইছে না।
