একটু আগে বাথরুমে গেলে না?
ও..হ্যাঁ…। বিশ্বনাথবাবু স্বস্তির সুরে কহিলেন, ঠিকই বলেছিস, চাঁদু, আমার খেয়াল ছিল ।
কথা শেষ করিয়া তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন।
আমাদের বিস্ময় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছিল। চন্দ্রমোহন ও বিশ্বনাথবাবুর কথোপকথন কেমন অদ্ভুত হেঁয়ালি মিশ্রিত, রহস্যময়।
রহস্যের গভীরতা দ্বিগুণ করিয়া বিশ্বনাথবাবু আমার স্ত্রীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আপনি আমার সঙ্গে চলুন। হয়তো হারটা খুঁজে বের করে দিতে পারব।
মালতীকে লইয়া ঘর ছাড়িবার পূর্বে বিশ্বনাথবাবু আমাকে প্রশ্ন করিলেন, এখানে কাছাকাছি কোথাও পুকুর আছে?
আমি বললাম, বাড়ির ঠিক পেছনেই একটা ছোট ডোবা আছে।
যাক, তা হলে বেশি দূর যেতে হবে না। এই কথা বলিয়া বিশ্বনাথবাবু আমার স্ত্রী-কে একটি টর্চ বা লণ্ঠন আনিতে অনুরোধ করিলেন।
মালতী টর্চ লইয়া আসিলে অপর একজন মহিলা সঙ্গীসহ তাহারা দুইজন সীতাহার অনুসন্ধানের কাজে নিষ্ক্রান্ত হইল।
আমি যৎপরোনাস্তি হতভম্ব হইয়া চন্দ্রমোহনের নিকটে আসিয়া পুনরায় আসন গ্রহণ করিলাম। লক্ষ করিলাম, চন্দ্রমোহনের মুখভাবে অপরাধবোধের ছায়া। সে মাথা নীচু করিয়া নীরবে হাতের নখ খুঁটিতেছে। তাহার বন্ধুরা অপ্রস্তুত হইয়া পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করিতেছে। মাধবীকে ঘিরিয়া যে-মধুমক্ষিকার গুঞ্জন শুরু হইয়াছিল, তাহাও এখন স্তব্ধ। সীতাহার-দুর্ঘটনা কম-বেশি সকলকেই আঘাত করিয়াছে।
মিনিট কুড়ি পরে বিশ্বনাথবাবু ফিরিলেন। সঙ্গে মালতী। তাহাকে দেখিয়াই বুঝা যায় অভিযান সফল হইয়াছে। বিশ্বনাথবাবুকে লক্ষ করিয়া সে কহিল, আপনি হাত-পা ধুয়ে নিন। বাথরুমের দেওয়ালের দড়িতে গামছা টাঙানো আছে।
বিশ্বনাথবাবু দরজার নিকট হইতে চন্দ্রমোহনকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, হারটা পাওয়া গেছে, চাঁদু। পুকুরপাড়েই ছিল। আমি হাত-পা ধুয়ে আসছি। তিনি বাথরুম অভিমুখে রওনা হইলেন।
আমি উঠিয়া মালতীর নিকটে আসিলাম। সে অস্ফুট কণ্ঠে যাহা বিবৃত করিল তাহার সারমর্ম এই : টর্চ হাতে করিয়া বিশ্বনাথবাবুই পুকুরপাড়ের সর্বত্র অনুসন্ধান করিয়াছেন। মালতী অত্যন্ত সাহসী। সুতরাং এক মুহূর্তের জন্যও সে ভয় পায় নাই। কিছুক্ষণ অনুসন্ধানের পর একস্থানের মাটি যথেষ্ট আলগা বলিয়া মনে হওয়ায় মালতীর হাতে টর্চ দিয়া বিশ্বনাথবাবু স্বয়ং মাটি খুঁড়িতে শুরু করেন। আপনমনে শুধু একবার উচ্চারণ করেন, জানতাম, এখানেই এনে লুকোবে।
অতঃপর অল্প সময়ের মধ্যেই সীতাহার স্বমহিমায় প্রকাশিত হইয়া পড়ে এবং তাহারা ফিরিয়া আসে।
এমন সময়, যাঁহাকে লইয়া আলোচনা, তিনি উপস্থিত হইলেন। বিশ্বনাথবাবুকে দেখিয়া সকলের কৌতূহল সীমা ছাড়াইবার উপক্রম করিল। মালতী চলিয়া যাইতেছিল, বিশ্বনাথবাবু তাহাকে ডাকিলেন, গম্ভীর স্বরে কহিলেন, মালতীদেবী, যাবেন না। আসুন, এ-ঘরে বসুনকথা আছে।
তাহার স্বরে এমন কোনও প্রচ্ছন্ন জাদু ছিল, যাহাতে মালতী নীরবে সেই আদেশ পালন করিল। আমিও ঘরে আসিয়া বসিলাম। বিশ্বনাথবাবু আমার নিকটে বসিলেন। দেখিলাম, তাহার ধবধবে ধুতির শরীরে কাদার ইতস্তত কলঙ্ক লাগিয়াছে। কাশ্মীরি শালটিও পুরাপুরি রক্ষা পায় নাই। যে নীরব প্রশ্ন ও কৌতূহল আমি এ পর্যন্ত সকলের দৃষ্টিতে দেখিয়াছি, সম্ভবত তাহা বিশ্বনাথবাবুর নজরে পড়িল। তিনি উপস্থিত সকলের মুখের উপর পর্যায়ক্রমে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া হঠাৎই মালতীকে লক্ষ করিয়া বলিলেন, মালতীদেবী, হারটা যে আপনি পেয়েছেন, সবাইকে দেখান।
বিস্মিত মালতী শাড়ির আঁচল খুলিয়া হারটি বাহির করিল এবং ঘরে উপস্থিত সকলের নিকট দৃশ্যমান হয় এমনভাবে উহা তুলিয়া ধরিল। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হ্যাঁজাকের ছায়া-পরিম্নান আলোয় বিদ্ধ হইয়া সীতাহারটি ঝকমক করিয়া উঠিল।
মালতী হারটি পুনরায় যথাস্থানে বাঁধিয়া রাখিলে বিশ্বনাথবাবু কহিলেন, সমীরবাবু, একমাত্র চঁদুর সম্মান রক্ষার জন্যেই মালতীদেবীকে সীতাহারটা সকলকে দেখাতে অনুরোধ করলাম। তা ছাড়া, এই হার চুরিতে, আর বিশেষ করে তার উদ্ধারে, আপনারা সবাই যে ভীষণ অবাক হয়েছেন, তা বেশ বুঝতে পারছি। বিশ্বনাথবাবু একটু থামিলেন। চন্দ্রমোহনকে কিয়ঙ্কাল নিরীক্ষণ করিলেন। তাহার মুখমণ্ডলে এখন সামান্য স্বস্তির আভাস পাওয়া যাইতেছে। সে নতুন বর, ফলে তাহার সঙ্কট ও লজ্জা সর্বাপেক্ষা অধিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন সেই সঙ্কট ও লজ্জার মেঘ অদৃশ্য হইয়া চতুর্দশীর চাঁদ স্বস্তির ইঙ্গিত বহন করিয়া প্রকাশিত হইয়াছে। বিশ্বনাথবাবু আমাকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, এই চুরি ও তার বিচিত্র আবিষ্কারের পেছনে আরও বিচিত্র এক কাহিনি আছে। কখনও সে কাহিনি কাউকে বলিনি। কিন্তু আজ বলব। কারণ, এর আগে কখনও আজকের মতো এমন অসম্মানজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। আপনারা বরপক্ষের লোকদের চোর ভেবে বসে থাকবেন, এটা চাদুর পক্ষে খুব একটা সম্মানের নয়।
আমি তাহার কথার প্রতিবাদে সৌজন্যমূলক কিছু একটা বলিতে মুখ খুলিতেই বিশ্বনাথবাবু বাধা দিলেন, বিব্রত হওয়ার কিছু নেই, সমীরবাবু। যা সত্যি, তাই বলছি। একটু আগেই চাঁদু বলছিল, আমি নাকি এক মহাপুরুষ– বিশ্বনাথবাবু হাসিলেন, পুনরায় কহিতে লাগিলেন, তা মহাপুরুষ আমি না হতে পারি, কিন্তু ভারতবর্ষের আনাচেকানাচে ঘুরে বহু মহাপুরুষের সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি।
