ক্যানের মতো যন্ত্রটা ঘরের এক কোণে বসিয়ে অন করে দিল নিকি। তারপর পটাপট কয়েকটা বোতাম টিপল। ওটার গায়ে একটা ছোট্ট এলইডি বাতি লাল চোখের মতো দপদপ করে জ্বলতে নিভতে লাগল।
নিকি রাজরীতার দিকে তাকিয়ে হাসল এখন আর কোনও রেডিয়ো সিগনাল এ-ঘরে কাজ করবে না। সব সিগনাল জ্যাম করে দিলাম।
নিকির সঙ্গী টেবিলে আঙুল ঠুকতে-ঠুকতে বলল, একদম চেঁচামেচি করবেন না, ম্যাডাম। করলে আমাদের আর কিছু করার থাকবে না, ডাক্তারদেরও আর কিছু করার থাকবে না। আপনি হয়তো ভাবছেন, এ-ফ্ল্যাটে ঢোকার সময় লুকোনো ভিডিয়ো ক্যামেরায় আমাদের ছবি উঠে গেছে। পরে সেই ছবি দেখে সিকিওরিটি পুলিশ আমাদের খুঁজে বের করবে– বিচ্ছিরিভাবে হাসল : ওসব কিছুই হবে না। যদিও কাল ক্রাইম ডট কম-এ আপনি আমাদের এই ছবিই দেখতে পাবেন। একটু থামল। তারপর তার কারণ কী জানেন? কারণ, আসলে আমরা অন্যরকম দেখতে।
কথা বলতে-বলতেই মাথার টুপি খুলে ফেলল সে। তারপর একে একে পরচুল, চশমা এবং নকল গোঁফ টেবিলে নামিয়ে রাখল।
ন্যাড়া মাথা লোকটিকে এখন সত্যি-সত্যিই একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছিল।
নিকি তখন ফ্ল্যাটের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কালো বাক্সটা হাতে নিয়ে কীসব খুটখাট করছিল। রাজরীতাদের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ভিকি, আমাকেও কি উইগ-টুইগ সব খুলতে হবে নাকি?
ভিকি বলল, না, না, আর দরকার নেই। ম্যাডাম, বুঝতে পারছেন।
কালো বাক্সটা দরজার কাছে নামিয়ে রেখে তালি দিয়ে হাত ঝাড়ল নিকি? ভিকি, এদিককার কাজ শেষ। এখন দরজার লকটাকে কেউ হাজার চেষ্টা করেও বাইরে থেকে আর খুলতে পারবে না। এবার এ-ফ্ল্যাটে আমাদের রাজ চলবে। দেওয়ালের টিভি পরদার দিকে একপলক তাকিয়ে তারপর ও ওখানে ক্রাইম ডট কম চলুক, আর এখানে আমাদের ফুর্তি ডট কম শুরু হোক। কী বলো, গুরু!
না, না! ফুর্তি ডট কম নয়–ফুর্তি ডট বেশি! ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হাসল ভিকি। তারপর রাজরীতার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল, ম্যাডাম, আপনার হাজব্যান্ড নিশ্চয়ই এখন অফিসে?
হ-হ্যাঁ। কোনওরকমে ঘাড় নাড়ল রাজরীতা। ওর মুখের ভেতরে গিরগিটির চামড়ার তৈরি জিভটা জলের অভাবে ধুকছে।
আমরা অবশ্য কদিন ধরেই আপনার এই একশো তিনতলার ফ্ল্যাটের ওপরে ওয়াচ রেখেছিলাম। এই মালটিস্টোরিড বিল্ডিং-এ আমরা আগেও কাজ করেছি। তবে তখন অন্যরকম মেকাপ নিয়েছিলাম। আপনাকে একদিন সিঁড়িতে দেখার পর থেকেই আমাদের দুজনেরই মাথা ঘুরে গেছে। আপনি যেমন সুইট তেমনই বিউটিফুল। বাগানে গোলাপফুলের জায়গায় আপনাকে দিব্যি সাজিয়ে রাখা যায়।
বিউটিফুল ডট কম! নিকি বলল, রাজরীতার কাছে এসে দাঁড়াল।
না, না, বিউটিফুল ডট বেশি! বলেই হো-হো করে হেসে উঠল ভিকি।
ওদের কথাবার্তা আর হাসির শব্দে দশ-বারো বছরের একটি ছেলে ঘরে এসে ঢুকল। ঢুকেই নিকি আর ভিকিকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল।
আপনার ছেলে?
প্রশ্নটা কে করল রাজরীতা ঠিক খেয়াল করল না। শুধু কোনওরকমে ঘাড় নেড়ে ও জানাল, হ্যাঁ।
ওর বুকের ভেতরে তুমুল হুলস্থুল চলছিল। একটু আগেই কেমন নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবন কাটাচ্ছিল ও! আর এখন, মাত্র পনেরো কুড়ি মিনিটেই, চরম বিপদসীমায় পৌঁছে গেছে!
একটু আগে যখন ও এ-ঘরে টিভি দেখতে এসেছিল তখন ওর মনে শুধু স্বপ্ন ছিল–কোনও দুঃস্বপ্ন ছিল না। ও রিমোটের বোতাম টিপতেই ঘরের পুবদিকের দেওয়ালের খানিকটা অংশ টিভির পরদা হয়ে গিয়েছিল। রঙিন ছবিতে একজন সুন্দরী মেয়ে নানান অনুষ্ঠানের খবর বলছিল, আর এককোণে একটা ইলেকট্রনিক ঘড়ি রিয়েল টাইম জানিয়ে দিচ্ছিল।
ঠিক তিনটে বাজতেই শুরু হল ক্রাইম ডট কম মানে, পশ্চিমবঙ্গের যত খুন-জখম রাহাজানির খবর। রাজরীতা প্রতিদিন নিয়ম করে এই প্রোগ্রামটা দ্যাখে। এই প্রোগ্রামটা প্রতিদিন বিকেল তিনটেয় দেখানো হয়–যাতে ঘরে থাকা মানুষজন সতর্ক হতে পারে, নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারে।
২০২০ সাল নাগাদ ভারতে সাইবারস্পেস বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইন্টারনেট, ই-মেইল, ই-কমার্স, আরও কত কী! তারপর ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি যতই লাফিয়ে-লাফিয়ে এগিয়েছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে জনসংখ্যা আর খুন-জখম-রাহাজানি। এইভাবে দেড়শো বছর পেরোতে-না পেরোতেই পুলিশি ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। ক্রাইম ডট কম প্রোগ্রামে রোজই দু-চারটে পুলিশ খুনের ঘটনা কিংবা পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার ঘটনা থাকে। তাই ব্যাঙের ছাতার মতো যত রাজ্যের সিকিওরিটি কোম্পানি গজিয়ে উঠেছে। তাদের ব্যবসা দিনকেদিন বেড়েই চলেছে। আধুনিক থেকে আরও আধুনিক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
এখন রাস্তায় বেরোলে সবাইকে সিকিওরিটি ভ্যানে করে যাতায়াত করতে হয়। ওগুলোই হল বাসের বিকল্প। এ ছাড়া ট্যাক্সি বা প্রাইভেট কার মানেই আর্মার্ড কার–সবসময় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য তৈরি। সন্ধের অন্ধকার নেমে এলেই লোকজন যার-যার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তখন শুরু হয় বেপরোয়া উচ্চুঙ্খল ক্রিমিনালদের দিন।
ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই এই একই অবস্থা। রোজ কম্পিউটারে ইলেকট্রনিক নিউজপেপার দেখলেই বোঝা যায় আইন-শৃঙ্খলা কী বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে।
ক্রাইম ডট কম দেখতে-দেখতে এসব কথাই ভাবছিল রাজরীতা।
