নয়ন পা বাড়াল বাইরের ঘরের দিকে। যেতে-যেতে বলে গেল, ভয় পাস না। নয়ন সেন এখনও তোর বন্ধুই আছে। তা ছাড়া ওরা তিনজন ফিরুক। আমি ওদের সঙ্গে একটু কথা বলে দেখি।
.
বিকেল পাঁচটায় ঘুম ভাঙলে টের পেলাম, শরীরে অসহ্য ব্যথা। এবং তার সঙ্গে তেজি খিদে। অতি কষ্টে সোজা হয়ে বসলাম। মাথাটা আচমকা ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হল, কেউ যেন লোহার সাঁড়াশি দিয়ে রগের পাশ দুটো চেপে ধরেছে।
শুরুর আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেলে উঠে দাঁড়ালাম। হাত বাড়িয়ে শেলফ থেকে মালের বোতল তুলে নিলাম। অতি সন্তর্পণে বোতলের তরল পদার্থ পরনের জামার এক কোণে সামান্য ঢালোম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন কোনও অ্যাসিডের প্রতিক্রিয়া নজরে পড়ল না, তখন ধীরে ধীরে গলায় উপুড় করে দিলাম বোতলটা। শুকনো জিভের তেতো আস্বাদটা কালী মার্কার কৃপায় কেটে গেল। বোতলটা তাকে ফিরিয়ে রাখতে যেতেই আমার অবসাদে ক্লান্ত হাত কেঁপে উঠল। মেঝেতে ঠিকরে পড়ল বোতলটা। ভেঙে চুরমার হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। বাংলা-র তীব্র গন্ধে খুপরি ঘরটা ভরে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা ঠেলে উঁকি মারল নয়ন। বলল, ও–তুই উঠেছিস। দাঁড়া আসছি– বলেই পলকের মধ্যে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি ক্লান্ত শরীরের ভারসাম্য রাখতে বিছানার ওপরে বসে পড়লাম।
একটু পরে একটা ঠোঙায় করে মুড়ি, পেঁয়াজ, আর গোটাকয়েক তেলেভাজা নিয়ে এল নয়ন। বলল, নে–খেয়ে নে। রাসুকে চা আনতে বলেছি।
আমি ওর দ্বিতীয় কথার অপেক্ষা না করে মুড়ির ঠোঙায় হাত চালাতে শুরু করলাম।
খেতে-খেতে হঠাৎই লক্ষ করলাম, নয়নের জ্বলজ্বলে চোখজোড়া আমার মুখে সেঁটে আছে। আমাকে অবাক চোখে তাকাতে দেখে ও বলল, নাঃ, তুই দেখছি এখনও আমাকে খুব বিশ্বাস করিস, হেম!
কেন?
কারণ, আমার দেওয়া খাবারে তুই সন্দেহ করিসনি।
আমি কোনও জবাব দিলাম না।
নয়ন নিজের মনেই বলে চলল, আমি দুপুরে ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তোকে সরানোর চেষ্টার ব্যাপারটা ওরা তিনজনেই সমানে ডিনাই করছে। কী জানি, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
ওরা কোথায়? খেতে-খেতেই প্রশ্ন করলাম।
বাইরের ঘরে শুধু অবনী রয়েছে। রোশন আর পরাশর বেরিয়েছে।
অবনীকে ডাক।
নয়ন গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে ওকে ডাকল।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই অবনী এবং রাসুর চায়ের দোকানের নুলো ছেলেটা এক ভড় চা নিয়ে খুপরি ঘরে এসে ঢুকল। অবনীর হাতে খবরের কাগজটা।
অবনী চুপচাপ সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। আমি ছোঁড়াটার হাতে পনেরোটা পয়সা দিয়ে চায়ে চুমুক দিলাম। তারপর অবনীর দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, অবনী, আজ সকালে রোশন যখন আমার বুকে ব্যান্ডেজ করে দেয় তখন এ-ঘরে আর কে-কে ছিল?
আমি আর পরাশর।
কেউই ঘর ছেড়ে যায়নি?
পরাশর একবার বাইরে গিয়েছিল ব্যান্ডেজের কাপড় আনতে। ওর দেরি হচ্ছিল বলে আমি রোশনকে তোমার কাছে থাকতে বলে বাইরের ঘরে একবার বিড়ি ধরাতে গিয়েছিলাম। তখনই দেখি পরাশর ফিরে আসছে।
আমি ঘুরে তাকালাম নয়নের দিকে।
ব্যান্ডেজের কেসটা ওদের বলেছিস?
হ্যাঁ, বলেছি কিন্তু…।
কিন্তু ওরা সবাই সেকথা ডিনাই করেছে, তাইতো? আমি ব্যঙ্গভরে হাসলাম।
অবনী রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, আর কিছু জানতে চাও, হেমদা?
আমি নিঃশব্দে ডানহাত ঢুকিয়ে দিলাম বালিশের তলায়। রিভলভারটা পরখ করতে করতে চাপা স্বরে বললাম, হ্যাঁ, জানতে চাই। জানতে চাই তোমাদের মধ্যে কার আয়ু আগামীকাল শেষ হতে চলেছে। আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় বড় অল্প, তাই না অবনী? এবার ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। নয়নের নীরব অনুনয়ের দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। শান্ত স্বরে বললাম, অবনী, তুই আর ওই কুত্তার বাচ্চাদুটো কাল সকালে এখানে হাজির থাকিস। তখনই দেখবি হেম বাঁড়ুয্যের দাবার শেষ চাল! তালুকদার স্টোর্সের ওই বুড়োর জন্যে সাগরের ঢেউ তোদের বুকে আছাড় মারছে, তাই না? এবার ফোট।
একইসঙ্গে আমরা অভিব্যক্তির ইশারা পেয়ে বেরিয়ে গেল অবনী।
আমি ফিরে এসে বসলাম বিছানার। নয়নকে বললাম, ওরা ফিরলে আমাকে খবর দিস। আর শোন, অবনীর কাছ থেকে খবরের কাগজটা আমাকে দিয়ে যাস।
আচ্ছা। উঠে দাঁড়াল নয়ন ও তবে আমি বেশি রাত করব না, হেম। ছোট ছেলেটার একটু জ্বর-জুর মতো হয়েছে। মানুষের মরার চেয়ে বেঁচে থাকাতেই বেশি কষ্ট।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল নয়ন।
একটু পরে নয়নের দিয়ে যাওয়া খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে সেই বিশেষ খবরটা আমি আবার পড়তে লাগলাম। ভাবতে লাগলাম আমার মারকাটারি প্ল্যানের কথা।
.
তৃতীয় দুর্ঘটনাটা একেবারে চরমে পৌঁছোল।
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। খাওয়াদাওয়া সেরে বেশ কিছুক্ষণ হল ঘুমিয়েছি। ঘুমোনোর আগে ওদের তিনজনকে ডেকে আগামীকাল সকালই যে গদ্দারের লুকিয়ে থাকার টাইম লিমিট সেটা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছি। যথারীতি নিজেদের সাফাই দিয়েছে ওরা তিনজনেই। তারপর বাইরের ঘরে শোওয়ার ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে।
এমনিতে ঘুম আমার গভীর। কিন্তু আজ, বিশেষ করে বুকের জ্বালা আর মনের অন্ধ আক্রোশ, এই দুয়ের জন্যে অন্যান্য রাতের মতো সহজে ঘুম আসেনি। অন্ধকারে শুয়ে-শুয়ে ভেবেছি : তিনজনের মধ্যে কে? অবনী? পরাশর? রোশনাল? নাকি যাকে রেখেছি সব সন্দেহের সীমার বাইরে, সেই নয়ন সেনই এ-দুর্ঘটনাগুলোর পরিচালক এবং প্রযোজক?
