রবীন্দ্রলাল অন্তত চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর আগে ইহলোক ছেড়েছেন। তবে তাঁর চার ছেলে এখনও বহাল তবিয়তে লালমহল-এ বাস করেন।
বড় ছেলে শ্যামসুন্দরলাল গতকাল মারা গেছেন। তিনি সবসময় পাখি নিয়ে মেতে থাকেন– মানে, থাকতেন। বাড়ির অনেকটা অংশ খাঁচায়-খাঁচায় ছয়লাপ।
মেজো ছেলে চুনিলাল মণিরত্নের ব্যবসা করেন। দেবদেবীভক্ত ধর্মভীরু মানুষ। অন্য ভাইদের মতো সংসার-ধর্ম করেননি।
সেজ রঙ্গলাল হিসেব মতো বেকার। তবে শোনা গেছে তিনি নাকি টুকটাক সাপ্লাইয়ের কাজ করেন।
আর সকলের ছোট গজেন্দ্রলাল এখনও ঠিক কোনও ব্যবসায় থিতু হয়ে বসতে পারেননি।
ঘটনাটা ঘটেছে গতকাল, দুপুর দুটো নাগাদ।
শ্যামসুন্দরলালের কাছে একটা ফোন এসেছিল। কে ফোন করেছিল সেটা জানা যায়নি। টেলিফোনে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে বলতেই তিনি আচমকা হার্টফেল করে মারা যান।
তার চিৎকারে বাড়ির অনেকে ছুটে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
ব্যাপারটার এমনিতে কোনও জটিলতা ছিল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক মৃত্যু। তা ছাড়া শ্যামসুন্দরলালের বয়েসও হয়েছিল প্রায় বাষট্টি।
কিন্তু গোলমাল বাঁধালেন চুনিলালবাবু। তিনি বললেন যে, প্রায় দু-লাখ টাকা দামের একটা টকটকে লাল চুনি তিনি তাঁর বড়দার কাছে রাখতে দিয়েছিলেন।
সেটার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সেইজন্যই গুপ্তাবকে জরুরি তলব করেছে রঘুপতি। খুঁজে বের করতে হবে চুনিবাবুর চুনি।
রঘুপতির কথা শেষ হতে-না-হতেই এসিজি প্রশ্ন করলেন, শ্যামসুন্দরলালের মারা যাওয়ার ব্যাপারটাকে তুমি খুনের মতো বলছ কেন?
বলছি কি আর সাধে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রঘুপতি। তারপর বলল, ওই হতচ্ছাড়া জেবরাতের জন্যে কদিন ধরেই কোন এক আদমি শ্যামসুন্দরবাবুকে থ্রেট করছিল। তাতে উনি ভয়ও পেয়েছিলেন, আবার খুব এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিলেন। আমার মনে হচ্ছিল, উনি এভাবে মারা না গেলে হয়তো ওই আন্নােন পারসনের হাতে খুন হয়ে যেতেন…।
এসিজি এক ফাঁকে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছিলেন আবার। চশমাটা নাকের ওপরে ঠিক করে বসিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সেই লোকটা কেমন করে জানল যে, চুনিটা শ্যামসুন্দরলালবাবুর কাছে আছে?
ঠোঁট উলটে রঘুপতি বলল, কে জানে! হয়তো কারও কাছ থেকে ইনফরমেশান পেয়েছে।
যখন শ্যামসুন্দর মারা যান তখন চুনিলাল কোথায় ছিলেন?
বাড়িতেই। কথাটা বলে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রঘুপতি কী যেন দেখল। তারপর বলল, স্যার, আমরা লালমহলে এসে গেছি।
বাড়ির সামনে ভাঙাচোরা ট্রাম-রাস্তা। কোথাও কোথাও জল জমে আছে। বাড়ির উলটোদিকে দুটো বিশাল মাপের গোডাউন। তার পিছনেই বোধহয় গঙ্গা।
ড্রাইভারকে গাড়ি পার্ক করতে বলে রঘুপতি এসিজিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, আইয়ে স্যার,–ওয়েলকাম টু লালমহল।
এসিজি প্রাক্তন ছাত্রের ভঙ্গি দেখে সামান্য হাসলেন। তারপর মাথার সাদা চুলে হাত চালিয়ে বললেন, চলো, দেখা যাক তোমার চুনিলালবাবুর চুনি উদ্ধার করা যায় কি না।
কলিংবেল টিপতেই বাড়ির দরজায় একজন বয়স্ক পুরুষ এসে হাজির হলেন। দেখে বনেদি বাড়ির পুরাতন ভৃত্য বলেই মনে হল। রঘুপতি নিজের পরিচয় দিতেই দ্রুত আদর-আপ্যায়ন শুরু হয়ে গেল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে রঘুপতি যাদব নীচু গলায় বলল, ব্যাপারটা লালবাজার পর্যন্ত গড়াত না। তবে চুনিলালবাবুর থোড়াবহত আপার লেভেল কানেকশা আছে। সেইজন্যেই..।
কথা বলতে বলতে ওঁরা চৌকো মাপের বিশাল ঠাকুর-দালানে এসে পড়েছিলেন। তার একপাশে চণ্ডীমণ্ডপ। সেখানে প্রতিমা গড়ার কাজ চলছে। এখন শুধু শেষ তুলির টান আর সাজসজ্জা বাকি।
হঠাৎই ওঁদের সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্যামলা রঙের একজন ভদ্রলোক। তার ডান হাতের তিন আঙুলে রুপো দিয়ে বাঁধানো তিনটে পাথরের আংটি। প্রকট হেসে তিনি বললেন, আগমনের খবর পেয়েছি । তাই রিসিভ করতে এসেছি। অধমের নাম রঙ্গলাল / চুনিটা বেপাত্তা হয়েছে। গতকাল।
এসিজি অবাক হয়ে লালমহলের রঙ্গলালবাবুকে দেখছিলেন।
পরনে ফতুয়া গোছের পাঞ্জাবি আর ধুতি। মাথার মাঝখানে সিঁথি। তেল-চকচকে কোঁকড়ানো চুল। ছোট-ছোট চোখ। কপালের বাঁ-দিকে একটা ছোট আঁচিল। নাকটা সামান্য বড় মাপের। দাড়ি গোঁফ কামানো। মুখে প্রসাধনের সুবাস। আর সদাসঙ্গী আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি।
শ্যামসুন্দরলালবাবু কোন ঘরে মারা গিয়েছিলেন? রঘুপতি জানতে চাইল।
রঙ্গলাল অতিরিক্ত বিনয় প্রকাশ করে বললেন, দোতলায় পাখি ঘরে / ওই ঘরটার ঠিক ওপরে– আঙুল তুলে দূরের কোণে একটা ঘর দেখালেন তিনি।
এসিজি যে কথাটা মনে-মনে ভাবছিলেন সেটাই মুখে প্রকাশ করলেন, আপনি কি সবসময় ছড়া কেটে কথা বলেন?
রঙ্গলালবাবু মাথা সামান্য নীচু করে বললেন, আমি একজন স্বভাবকবি । কবিতায় কথা বলা আমার হবি।
রঘুপতি যে এই উত্তর শুনে ঠোঁট টিপে হাসল সেটা বৃদ্ধ গোয়েন্দার চোখ এড়াল না।
পুজো এবার দেরিতে। তাই রোদ্দুর পড়ে আসছে তাড়াতাড়ি। উঠোন থেকেও রোদ সরে যাচ্ছে পুবের দিকে।
মাথার ওপরে কয়েকটা পায়রা ঝটপট করছিল। শানবাঁধানো উঠোনে নানা জায়গায় ওদের অপকীর্তির ছাপ।
ওঁরা তিনজনে উঠোন পেরিয়ে এগোলেন দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে। তখনই কোথা থেকে ছুটে এল বছর ন-দশের একটা ছোট্ট মেয়ে। হাঁফাতে-হাঁফাতে রঙ্গলালবাবুকে লক্ষ্য করে বলল, জেঠু, মেজো-জেঠু বলেছে ওঁদের পাখিঘরে নিয়ে বসাতে।
