এখন তাড়াতাড়ি চলুন, ঘুমে আমার চোখ ঢুলে আসছে।
আমারও– কথাটা বলেই আমি অবাক হলাম। আমার ঘুম পাচ্ছে। অথচ স্লিপ সার্কিট আমি অন করিনি। ব্যাপারটা ডক্টর অভিজিৎ মজুমদারকে জানাতে হবে। আমার স্বাভাবিকভাবে ঘুম পাচ্ছে!
গাড়ির কাছে এসে আমি পকেট থেকে রিমোট ইউনিট বের করলাম। বোতাম টিপতেই গাড়ির দরজা খুলে গেল। চোখ পড়ল আকাশের দিকে। চারদিক ফরসা হয়ে আসছে।
শর্বরীর কথা মনে পড়ল। বুকপকেটে হাত রাখতেই ভিজিটিং কার্ডটা টের পেলাম। শরীদের বাড়িতে একদিন যাব। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার দুঃখকষ্টের অন্ধকার রাতগুলো একদিন যেন শেষ হয়ে যায়।
উনিশ বিষ
ইমেইলটার হেডিং দেখেই ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল পীতাম্বরের। এরকম খেলা কখনও আবার হয় নাকি! কী অদ্ভুত নাম : আলট্রানিড পয়জন গেম!
পীতাম্বরের ইমেইল আইডি-তে প্রচুর আজব মেইল আসে। যেমন, নামিবিয়ার কোনও ব্যাঙ্কে বেওয়ারিশ দেড় মিলিয়ন ডলার পড়ে আছে। সেই ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পীতাম্বরকে মেইল করে জানাচ্ছেন, টাকাটা তিনি পীতাম্বরের নামে ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করে দেবেন। এর জন্য কাগজপত্র যা-যা দরকার সবই তিনি তৈরি করবেন। পীতাম্বরকে শুধু বাড়ির ঠিকানা আর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ডিটেইল্স জানাতে হবে। তারপর, টাকাটা দেশের বাইরে নিশ্চিন্তে পাঠিয়ে দেওয়ার পর, তিনি ইন্ডিয়াতে এসে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকাটা ভাগাভাগি করে নেবেন।
আবার এমন মেইল-ও আসে যাতে এক সুন্দরী বিদেশিনীর ফটোগ্রাফ ও অন্যান্য তথ্য রয়েছে। তিনি ভারতীয় পাত্র খুঁজছেন। পাত্রের বয়েস তিরিশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে হলেও আপত্তি নেই। আর বিপত্নীক কিংবা ডিভোর্সি হলেও চলবে।
পীতাম্বরের চেহারা ছোটখাটো। মাথায় বড়সড় টাক। বয়েস বাহান্ন পেরিয়েছে। কিন্তু হলে হবে কী। মেয়েটির ছবি বেশ লোভ জাগায়। সঙ্গে-সঙ্গে মনে পড়ে গেল স্ত্রী পদ্মাবতীর কথা। পদ্মাবতী…। পদ্মাবতীর ব্যাপারটা আগে ভাবতে হবে।
আজব বিয়ের প্রস্তাব ছাড়া সাংঘাতিক ডিসকাউন্টে নানান সফ্টওয়্যার কেনার প্রস্তাবও আসে ইমেইল-এ। আবার পুরুষত্বকে তেজি করে তোলার বিচিত্র সব পদ্ধতির খোঁজখবরও পাঠায় নানান কোম্পানি।
সাধারণত এসব মেইল পীতাম্বর খোলেন না। তাই এগুলো ইনবক্স-এ না এসে বাল্ক এ জমা হয়। যদি বাক-এর কোনও মেইল-এর টাই পীতাম্বরের কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হয় তবেই তিনি সেই মেইলটা খোলেন।
যেমন এই আলট্রানিউ পয়জন গেম।
আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোনও মেইল-এ সাড়া দেননি পীতাম্বর। কিন্তু এই পয়জন গেম-এর মেইলটা দেখে মনে হল, এটা খুলে একটু নেড়েচেড়ে দেখলে হয়।
কিন্তু ঠিক তখনই পদ্মাবতীর ডাক এল।
এ-ডাক নিশির ডাক। অথবা তার চেয়েও বেশি।
সুতরাং সঙ্গে-সঙ্গে ইয়াহু থেকে সাইন আউট করলেন পীতাম্বর। চেয়ার পিছনে ঠেলে উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতেই চেঁচিয়ে বললেন, যাই।
বয়েস পঞ্চাশ পেরোলেও পীতাম্বরের সব ইন্দ্রিয় এখনও দিব্যি টগবগে। ফলে যে-ক্ষিপ্রতায় তিনি পদ্মাবতীর ডাক লক্ষ্য করে শব্দভেদী বাণের মতো ছুটে গেলেন সেটা অবাক করার মতো।
পদ্মাবতী বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। ওর গায়ে গোলাপি নাইটি জাতীয় যে-বস্তুটি চাপানো রয়েছে সেটা বোধহয় কাচের তৈরি। অথবা, গোলাপি রং-টা পদ্মাবতীর গায়ের রং-ও হতে পারে।
বউকে অচেনা পুরুষের চোখ দিয়ে দেখতে চাইলেন পীতাম্বর। সত্যি, ওর সারা শরীরে শুধুই মারকাটারি বক্ররেখা। ওর দিকে তাকানোমাত্রই দুটো জিনিসের কথা মনে পড়ে : সুকুমার রায়ের খাই খাই কবিতা, আর আবার খাব সন্দেশের কথা।
কিন্তু পীতাম্বর তো আর অচেনা পুরুষ নন! তিনবছর আগে তাই ছিলেন। সুতরাং এখন পদ্মাবতীর দিকে তাকালে ও-দুটো জিনিসের কথা ওঁর আর মনে পড়ে না। বরং মনে পড়ে কবিতায় পড়া ডাকিনী যোগিনী এল কত নাগিনী… লাইনটা। কিন্তু তা সত্ত্বেও পদ্মাবতীর নেশার টান এড়াতে পারেন না পীতাম্বর। কী করে যেন তিরিশের এই মেয়েটা বাহান্নর পীতাম্বরকে এখনও বশ করে রাখতে পারছে। শুধু মাঝে-মাঝে ভেতরে-ভেতরে উথলে ওঠা প্রচণ্ড বিদ্রোহে ফেটে পড়তে চান পীতাম্বর–কিন্তু ওই পর্যন্তই। কোন এক ম্যাজিকে এই মায়াবী মেয়েটা ওঁকে সামলে নেয়–যেমন, এখন।
স্বামীকে কাছে ডেকে পদ্মাবতী যেভাবে হামলে পড়ে তাকে আদর করতে শুরু করল তাতে মেনকাও লজ্জা পাবে। পীতাম্বর অবাক হয়ে কাঠ কাঠ অবস্থায় আদর খাচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন কতক্ষণ ব্যালান্স রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন।
পদ্মাবতীর আদরের কোনও সীমানা নেই। তা ছাড়া কতরকম কলাকৌশল যে ও জানে। ওর পাল্লায় পড়লে চিতায় ওঠা পুরুষও জেগে উঠবে। পীতাম্বরের মনে হচ্ছিল, ব্যাপারটা ঠিক স্বামী-স্ত্রীর আদর নয়, পদ্মাবতী কোনও ব্লু-ফিল্ম-এর শুটিং-এ শট দিচ্ছে।
সে যা দেয় দিক–মনের অনিচ্ছাসত্ত্বেও পীতাম্বরের শরীর অনেকক্ষণ আগেই জেগে উঠেছিল। পদ্মাবতী তাকে মেঝেতে পেড়ে ফেলল। তারপর প্রবল ঝটাপটি করে ডাকিনী-যোগিনীর মতো পীতাম্বরকে কাবু করে বলতে গেলে ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিল।
একটু পরে পদ্মাবতী উঠে দাঁড়ালেও পীতাম্বর তুলোঠাসা পুতুলের মতো এলোমেলো হাত-পা ছড়িয়ে মেঝেতে পড়ে রইলেন। বড়-বড় শ্বাস নিয়ে হাঁপাতে লাগলেন। তৃপ্তিতে ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু এখনই অফিসে বেরোতে হবে কামাই করা যাবে না। তাই জোরে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে পদ্মাবতীর ঘোর কাটালেন পীতাম্বর। শরীরটা আধপাক গড়িয়ে খানিকটা হামাগুড়ি দিয়ে হাতে পায়ে ভর দিয়ে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
