হ্যাঁ, আপনাদের আমার প্রয়োজন হবে।
থানা-ইনচার্জ রসময় ঘোষালকে সকলে চিনতেন না। কেউ কেউ যাঁরা চিনতেন, তাঁরাই বোধ হয় ইতিমধ্যে পাশাপাশি যাঁরা জানতেন না তাঁদের ফিসফিস করে জানিয়ে দিয়েছিলেন রসময় ঘোষালের সত্যিকারের পরিচয়টা। এবং কিরীটীকে রসময়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দেখে তার সত্যিকারের পরিচয়টা না জেনেই বোধ হয় তাকেও ঐ পর্যায়ে ফেলে ওদের দুজনার সম্পর্কেই হঠাৎ যেন সকলে বেশ একটু চঞ্চল হয়ে ওঠে।
আকস্মিক মৃত্যুর ব্যাপারে প্রথমটায় সকলে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যে মুহূর্তে তারা বুঝতে পারলে এর মধ্যে থানা-পুলিশও উপস্থিত, সমস্ত ঘটনার চেহারাটাই যেন বদলে গেল। প্রথমটায় যে গুরুত্ব এতক্ষণ আকস্মিকতার মধ্যে ঠিক প্রকাশ পায়নি, থানা ও পুলিশের পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে সেই গুরুত্ব যেন সহসা সুস্পষ্ট ও কঠিন হয়ে দেখা দিল। আকস্মিক বিমূঢ়তার মধ্যে ফুটে উঠল একটা ভয়-ব্যাকুল চাঞ্চল্য। সকলেই ভিতরে ভিতরে অবিলম্বে স্থানত্যাগের জন্য যেন চঞ্চল ও ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
যুগপৎ নিঃশব্দে উপস্থিত সকলেরই মুখের দিকে তাকিয়ে কিরীটী নিঃসংশয়ে ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারে। মৃদু হেসে যেন সকলকেই সাহস দেয়, আপনাদের ব্যস্ত হবার বা ভয় পাবার কোন কারণ নেই। সামান্য দু-চারটে প্রশ্ন প্রয়োজনমত আপনাদের কাউকে কাউকে উনি রসময়বাবু ও আমি জিজ্ঞাসা করব মাত্র। তার পরই আপনারা যে যার গৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন। কিছুক্ষণের জন্য বাইরের বারান্দায় আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। আমরা বেশীক্ষণ সময় নেব না। কেবল মিস গুহ, আপনি ঘরে থাকুন।
দেখতে দেখতে ঘর খালি হয়ে গেল।
ঘরের মধ্যে এখন আমি, কিরীটী, থানা-ইনচার্জ রসময় ঘোষাল, শতদলবাবু ও মিস গুহ।
মিস গুহ, মনে হচ্ছে আপনিই বোধ হয় সর্বপ্রথম আমাদের মধ্যে ঐ মৃতদেহ দেখেছেন?
কিরীটীর প্রশ্নে মিস গুহ কিরীটীর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে বোবাদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, কোন জবাব দেন না। মৃতদেহ দেখার পর আকস্মিক ভাবে যে চাঞ্চল্য তরুণীর মনের মধ্যে জেগেছিল, তার কিছুমাত্র যেন এখন আর অবশিষ্ট নেই। একেবারে স্তব্ধ। বোবা হয়ে গিয়েছেন যেন তিনি।
আপনি নীচে এসেছিলেন কেন?
জলপিপাসা পেয়েছিল তাই এধারে এসেছিলাম। কিন্তু ঘরে ঢুকেই, মিস গুহ আবার মৃতদেহের দিকে দৃষ্টিপাত করে চুপ করে গেলেন।
কিরীটী বারেকের জন্য তার মণিবন্ধে বাঁধা হাতঘড়ির দিকে তাকাল। পরে মৃদু কণ্ঠে বললে, তা এখন ঠিক নটা বেজে দশ মিনিট। আপনি তাহলে পৌনে নটা নাগাদ এ ঘরে এসেছিলেন!
তাই হবে।
সে সময় এ ঘরে আর কেউ ছিল না?
না।
নামবার সময় বাইরের বারান্দায় বা সিঁড়িতেও আর কারো সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?
না।
আপনি জল খেতে নামবার আগে আগাগোড়া ছাদেই ছিলেন? একবারের জন্যও নীচে নামেননি?
না।
অতঃপর কিরীটী একে একে সকলকেই ডেকে তাদের গত এক ঘণ্টার গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করতে লাগল।
নবম জনকে প্রশ্ন করা হল। মধ্যবয়েসী একজন ভদ্রমহিলা। তিনি জবাবে বললেন, রাত তখন আটটা আন্দাজ হবে, তিনি এ বাড়িতে আসেন। আসতে তাঁর একটু দেরিই হয়েছিল। এখানকার স্থানীয় স্কুলের তিনি একজন মিসট্রেস। নাম মালিনী সেন। মিস। অবিবাহিতা।
মিস সেন বললেন, সিঁড়ি দিয়ে সবে দোতলার বারান্দায় উঠেছি, হঠাৎ এখন মনে পড়ছে, দেখেছিলাম যেন—উনি ও আর একজন পুরুষ এই ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিম্নকণ্ঠে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু আমি তখন তাঁদের বিশেষ লক্ষ্য করিনি। সোজা উপরে ছাদে উঠে যাই।
মিস সেনের কথা মুহূর্তের জন্য লক্ষ্য করলাম শতদল যেন তাঁর দিকে মুখ তুলে তাকালেন।
সেই পুরুষটি দেখতে কেমন বা তার পরিধানে কী পোশাক ছিল আপনার মনে আছে কি মিস সেন? কিরীটীই প্রশ্ন করে।
ভাল করে ঠিক তো লক্ষ্য করিনি, তবে মনে আছে ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশী হবে না। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। লম্বা ও বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা! পরিধানে বোধ হয় ফুলপ্যাণ্ট ও একটা হাফশার্ট ছিল।
তাঁদের কোন কথাবার্তা আপনার কানে গিয়েছিল?
না। তাঁরা এত আস্তে কথাবার্তা বলছিলেন যে, তাঁদের কোন কথাই আমি শুনতে পাইনি। তাছাড়া ওঁদের দিকে আমি তত নজরও তো দিইনি।
সামান্য ঐ সংবাদটকু ছাড়া আর বিশেষ কোন প্রয়োজনীয় তথ্যের সন্ধানই আর কারো কাছ হতে প্রশ্ন করে পাওয়া গেল না।
হঠাৎ এমন সময় বাইরে হরবিলাসের উচ্চ কণ্ঠস্বর শোনা গেল, শতদল! শতদল!
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হরবিলাস এসে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলেন এবং কক্ষে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ভূপতিত একমাত্র কন্যার মৃতদেহটা জমাট রক্তের মধ্যে দেখে হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে পাষাণের মত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কারো মুখে একটি শব্দ পর্যন্ত নেই। নির্বাক কয়েকটি কঠিন মুহূর্ত।
তারপর হঠাৎ সেই স্তব্ধতা ভঙ্গ হল, সীতা! সীতাকে মেরে ফেলেছে! সীতা নেই! সীতা মারা গিয়েছে!
পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে মৃত কন্যার শিয়রের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন হরবিলাস। নিঃশব্দে একখানি হাত মৃত কন্যার হিমশীতল মাথার ওপরে রেখে বার-দুই কেবল উচ্চারণ করলেন, সীতা! সীতা! সত্যিই তুই মরে গিয়েছিস মা!
সমস্ত কক্ষখানি যেন এক মর্মন্তুদ বেদনায় ঐ কথা কয়টির মধ্যে গুমরে গুমরে হাহাকার করে উঠল।
