নিঃশব্দে হাতখানি মৃত কন্যার মাথার ওপরে বুলোচ্ছেন হরবিলাস। আমরা যেন স্তব্ধ বিমূঢ়। হঠাৎ হরবিলাস কিরীটীর মুখের দিকে তাকালে, কী হবে কিরীটীবাবু! হিরণএখনও কিছু জানে না। অবিনাশ আমাকে খবর দিতেই তাড়াতাড়ি আমি উপরে ছুটে এসেছি। হিরাণ রান্নাঘরে—সে এখনও কিছু জানে না। তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে কতকটা যেন আত্মগত ভাবেই বললেন, জানতাম। আমি জানতাম এ লোভের দণ্ড! লোভের দণ্ড! এত বড় মাশুল দেওয়া আমাদের বাকি ছিল বলেই হিরাণ এ বাড়ি ছেড়ে যেতে চায়নি। কিছুতেই তাকে মত করাতে পারিনি।
বলতে বলতে আচমকা হরবিলাস উঠে দাঁড়ালেন, না, না—এ আমি সহ্য করতে পারছি না। এ আমি সহ্য করতে পারছি না! সীতা! সীতা!
টলতে টলতে হরবিলাস কক্ষ হতে বের হয়ে গেলেন।
১২. একটা বেদনার ঝড়
একটা বেদনার ঝড় তুলে যেন প্রস্থানরত হরবিলাসের কতকটা আত্মোক্তির মত উচ্চারিত কথাগুলো তাঁর পিছনে পিছনে মিলিয়ে গেল চাপা হাহাকারের মতই।
এবং আমাদের বিমূঢ় ভাবটা কাটবার আগে আচমকা জ্ঞান হারিয়ে শতদলের শিথিল দেহটা চেয়ারের উপরেই ঢলে পড়ল। আমার আগেই কিরীটী ক্ষিপ্রগতিতে শতদলের দিকে এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠিতভাবে বললো, শতদলবাবু হঠাৎ বোধ হয় জ্ঞান হারিয়েছেন সুব্রত। আয়, ধর। ওঁকে ঐ সোফাটায় শুইয়ে দিই—
আমি ও কিরীটী দুজনে ধরাধরি করে শতদলের জ্ঞানহীন দেহটা কোনমতে পাশের সোফাটায় শুইয়ে দিলাম। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে তখন শতদলের। চোখ দুটো বোজা। মুখটা ফ্যাকাশে বিবর্ণ। ঘরের কোণে রক্ষিত কুজো থেকে একটা গ্লাসে করে জল নিয়ে শতদলের চোখেমুখে জলের ছিটে দিতে লাগলাম।
কয়েক মিনিট শুশ্রুষা করবার পরই শতদল চোখ মেলে তাকাল। লম্বা একটা নিঃশ্বাস টেনে নিল।
শুয়ে থাকুন শতদলবাবু। একটু বিশ্রাম নিন। আমিই বলি বাধা দিয়ে।
ইতিমধ্যে কিরীটী শতদলের শয়নকক্ষ হতে একটা সাদা চাদর এনে মৃতদেহটা ঢেকে দিয়েছিল। চোখের সামনেই রক্তাক্ত বীভৎস মৃতদেহটা যেন ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছিল।
কিছুক্ষণ আগেও যাকে ছাতের ওপরে শতদলের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি, তারই নিষ্প্রাণ রক্তাক্ত দেহটা সামনে ঐ মেঝেতে পড়ে আছে।
সামান্য এই দু-ঘণ্টা সময়ের মধ্যে কখনই বা সে নিচে নেমে এল, আর কার হাতেই বা এমন নিষ্ঠুরভাবে নিহত হল? ঘুর্ণাবর্তের মতই প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে।
আর কখনই বা তাকে হত্যা করা হল? নিরীহ ঐ মেয়েটির পৈশাচিক হত্যার মূলে কী মোটিভ (উদ্দেশ্য) আছে? ছাতের উপর থেকে অলক্ষ্যে অলঙ্ঘ্য মত্যুই যেন ওকে টেনে নিয়ে এসেছিল নিচে। কিন্তু হত্যা করলে কে? কে? হত্যাকারী কে?
শরীরটার মধ্যে কেমন যেন অস্থির-অস্থির করছে! শতদল ক্ষীণকণ্ঠে বললে।
সুব্রত, শতদলবাবুকে ওঁর ঘরে বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দাও। কিরীটী আমাকে সম্বোধন করে বলে।
না, না, আমি একা থাকতে পারব না। অস্থির উদ্বেগাকুল কণ্ঠে বলে ওঠে শতদল এখানেই আমি থাকব। শতদলের সমস্ত মুখখানা যেন ভয়ে পাঁশটে হয়ে গিয়েছে, অভাবনীয় আকস্মিক আঘাতটা যেন খুবই লেগেছে।
তাহলে সোফাটার ওপরে ভাল করে শুয়ে পড়ুন। কিরীটী স্নিগ্ধকণ্ঠে বলে।
একজন ডাক্তারকে ডাকলে হত না? কথাটা আমিই বলি।
সুব্রত মন্দ কথা বলেনি। কোন জানা-শোনা ভাল ডাক্তার আছে আপনার মিঃ ঘোষাল? প্রশ্ন করে কিরীটী।
আছেন। ডাঃ আদিত্য চ্যাটার্জী। সব চাইতে তাঁরই এখানে ভাল প্র্যাকটিস। ছোটখাটো একটা নার্সিং হোম মতও তাঁর আছে।
তাঁকে একটা খবর দেওয়া যায় না?
বিপিন গেটের বাইরে plain dress-এ পাহারায় আছে, তাকেই আমি বলে আসছি। মিঃ ঘোষাল বলেন।
সুব্রত, মিঃ ঘোষালের সঙ্গে যা।
কিরীটীর মুখের দিকে তাকালাম। বুঝলাম একাকী শতদলের সঙ্গে ও কিছুক্ষণ থাকতে চায়। আমিও আর দ্বিধা না করে ঘোষালের দিকে তাকিয়ে বললাম, চলুন মিঃ ঘোষাল।
সিঁড়ির ঠিক শেষ ধাপের পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল অবিনাশ—এ বাড়ির পুরাতন ভৃত্য।
সিঁড়ির আলোর খানিকটা অবিনাশের মুখের একাংশে তির্যকভাবে এসে পড়েছে। আমাদের দেখে অবিনাশ তাড়াতাড়ি সরে গেল। মনে হল অবিনাশ আমাদের সান্নিধ্য থেকে যেন পালিয়ে গেল। অভ্যাগতের দল সকলেই চলে গিয়েছেন।
সমস্ত বাড়িটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ভৌতিক স্তব্ধতা যেন থমথম করছে।
টানা বারান্দার মাঝামাঝি আসতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। সামনে ঘরের খোলা দরজার সামনেই ইনভ্যালিড চেয়ারটার উপরে নিশ্চল পাথরের মত বসে আছেন হিরণ্ময়ী দেবী। বারান্দায় ঝুলন্ত বাতির আলো ওঁর ওপর এসে পড়েছে। সমস্ত মুখখানা ফ্যাকাশে বিবর্ণ। প্রাণের চিহ্ন পর্যন্ত যেন সে চোখে-মুখে নেই। হাত দুটি শ্লথভাবে কোলের ওপরে ন্যস্ত। তাঁর নিত্যসহচর উলের বল ও বুননটা কোলের ওপরে নেই।
আমাদের দুজনের পদশব্দেও কোনরূপ স্পন্দন জাগল না যেন হিরণ্ময়ী দেবীর মধ্যে। যেমন নিশ্চল পাষাণ-প্রতিমার মত স্তব্ধ-অনড় বসেছিলেন ইনভ্যালিড চেয়ারটার ওপর, ঠিক তেমনই বসে রইলেন। চোখের দৃষ্টি সামনের দিকে নিবদ্ধ।
আরো একটু এগিয়ে গেলাম ইনভ্যালিড চেয়ারে উপবিষ্ট হিরণ্ময়ী দেবীর কাছে।
এবারে নজরে পড়ল দুই চোখের কোল বেয়ে দুটি অশ্রুর ধারা। হিরণ্ময়ী দেবী কাঁদছিলেন। তাঁর চোখে জল।
আমি আর অগ্রসর হলাম না। দেওয়াল ঘেষে একটা থামের আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোন শব্দ না করে কেবল নিঃশব্দে চোখের ইঙ্গিতে ঘোষালকে এগিয়ে যেতে বললাম। ঘোষাল চলে গেলেন বারান্দার অন্য প্রান্তে দ্বারের দিকে।
