না, না—তোমার ঠাণ্ডা লাগবে।
না। আমার গায়ে জামা আছে। নাও-
কতকটা জোর করেই যেন শতদল সীতার গায়ে ডীপ লাল রঙের কাশ্মীরী শালটা নিজের গা হতে খুলে জড়িয়ে দিল।
ঠিক ভিড়ের মধ্যে নয়, ছাদের একেবারে কিনার ঘেষে একধারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছিল সীতা ও শতদল। আমি ওদের থেকে হাততিনেক মাত্র দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম বলেই ওদের পরস্পরের কথাগুলো প্রায় স্পষ্টই শুনতে পেয়েছি। একটু পরেই দেখলাম শতদল ভিতরের দিকে চলে গেল।
ভিড় বাঁচিয়ে ছাদের অন্য দিকে দাঁড়িয়ে কিরীটী ও থানা-ইনচার্জ রসময় ঘোষাল নিম্নকণ্ঠে পরস্পরের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে আলাপ করছে।
বাজি পোড়ানোর ব্যাপারে কিরীটীর যে খুব বেশী মনোযোগ আছে বলে মনে হয় না। আজকের উৎসবে যোগ দিলেও সে যেন উৎসবকে বাঁচিয়ে চলেছে।
অতিথি—বিশেষ করে বিশিষ্ট অতিথিদের প্রতি যে শতদলবাবুর লক্ষ্য আছে বুঝলাম যখন কিছুক্ষণ বাদে ভৃত্য অবিনাশ ট্রেতে করে কেক, বিস্কিট ও ধূমায়িত চা পরিবেশন করে গেল আমাদের।
আরো আধ ঘণ্টাটাক পরে। কালো আকাশ-পটে তখন বিচিত্র বাজির অপূর্ব আলোর খেলা চলেছে।
প্রত্যেকেই আমরা তন্ময় হয়ে একেবারে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। ঐ মুহূর্তে ছাদের উপরে উপস্থিত সকলেরই মনোযোগ ও দৃষ্টি আকাশের দিকে কেন্দ্রীভূত।
হঠাৎ আমরা চমকে উঠলাম একটা মেয়েলী কণ্ঠের আর্ত তীক্ষ্ণ চিৎকারে।
ভয়ার্ত আকুল চিৎকার।
কী হল? ব্যাপার কী? সকলেই পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। সকলের চোখেই একটা প্রশ্ন যেন।
চিৎকারটা এসেছিল কোন দিক থেকে তাও ভালো করে প্রথমটায় বোঝা যায়নি। সকলেই আমরা যেন বিস্ময়ে চকিতে হতভম্ব বিমূঢ়।
ঠিক সেই সময় একটি সুবেশা তরুণী একপ্রকার চেঁচাতে চেঁচাতেই ছাদে এসে দাঁড়ালেন, খুন! খুন হয়েছে!
কথা বলতে বলতে তরুণীটি হাঁপাচ্ছিলেন। ভয়ে আতঙ্কে চোখের মণি দুটো যেন তাঁর ঠিকরে বের হয়ে আসছে।
মুহর্তে চারপাশ হতে সকলে এসে তরুণীটিকে ঘিরে ধরে।
খুন! কোথায় হয়েছে? কে খুন হল? যুগপৎ একসঙ্গে বহু কণ্ঠ হতে প্রশ্ন উত্থিত হল।
হঠাৎ এমন সময় কিরীটীর শান্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, একটু অনুগ্রহ করে আপনারা সরে দাঁড়ান তো। সরুন। পথ ছেড়ে দিন।
তাকিয়ে দেখি, কিরীটী ও তার পাশে থানা-ইনচার্জ রসময় ঘোষাল।
সরুন না! পথ ছাড়ুন না! শতদলের কণ্ঠস্বর।
শতদল মধ্যবর্তী তরুণীর কাছে এগিয়ে যাবার জন্য সকলকে পথ ছেড়ে দেবার মিনতি জানাচ্ছে।
বহু কষ্টে আমরা তরুণীর সম্মুখবর্তী হলাম।
শতদল প্রথমে প্রশ্ন করে, আপনি কে? কে খুন হয়েছে? কোথায়?
তরুণী তখনও হাঁপাচ্ছে। চোখে-মুখে ভয়ার্ত ব্যাকুলতা।
এবারে কিরীটী তরুণীর সামনে এগিয়ে যায়, কোথায় খুন হয়েছে বলুন তো?
নীচের বসবার ঘরে-
কিরীটী বলে, আসুন শতদলবাবু। আপনিও আসুন।
সকলে অতঃপর আমরা দোতলায় নেমে এলাম। অভ্যাগতদের বসবার জন্য দোতলার স্টুডিও-ঘরের পাশের ঘরটা খুলে কতকগুলো চেয়ার ও সোফা ঐদিনের জন্য সাজানো হয়েছিল।
ঐদিনকার উৎসবোপলক্ষে ঝাড়বাতিটাও সন্ধ্যা হতেই জেলে দেওয়া হয়েছিল। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন সর্বাগ্রে তরুণীটি এবং তাঁর ঠিক পশ্চাতে আমি ও কিরীটী।
ঘরের মধ্যে পা দিয়েই চমকে উঠেছিলাম। ঘরের ঠিক মাঝখানে মেঝের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে যে মৃতদেহটি তাকে দেখামাত্রই চিনতে আমার কষ্ট হয়নি।
সীতা!
শতদলের সেই রক্তবর্ণ কাশ্মীরী শালটায় তখনও তার দেহ আবৃত।
পশ্চাৎ হতে পৃষ্ঠদেশে গুলি করা হয়েছে। গায়ের শাল ও জামা ভিজিয়ে রক্তধারা ঘরের মেঝেতে—সেদিনই পরিষ্কার করা পরিচ্ছন্ন মসৃণ পাথরের মেঝেতে ছড়িয়ে জমাট বেধেছে।
মৃতদেহের চোখ দুটো বিস্ফারিত। যেন ভয় ও জিজ্ঞাসার চিহ্ন। হস্ত দুটি প্রসারিত।
স্তব্ধ বিস্ময় যেন আমার বাক্যরোধ করেছিল। মুখটা একপাশে কাত হয়ে আছে। শতদলও আমাদের পাশেই নিশ্চল পাষাণের মত দাঁড়িয়ে নির্বাক। তার সমগ্র মুখখানা জুড়ে একটা অসহায় আতঙ্ক যেন ফুটে উঠেছে। চোখে ভীত প্রশ্নভরা দৃষ্টি।
কিরীটীও স্তব্ধ হয়ে মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে। তার পাশে রসময় ঘোষাল। এবং রসময় ও কিরীটীর কাছ হতে বেশ কিছুটা ব্যবধান বাঁচিয়ে ভীত নর-নারীর দল চিত্রাপিতের মতই নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে গা-ঘেষাঘেষি করে। ঘরের মধ্যে পাথরের মতই জমাট একটা স্তব্ধতা যেন থমথম করছে।
বোধ হয় মিনিট চার-পাঁচ ঐভাবেই কেটে গেল।
কিরীটী এগিয়ে গেল সর্বপ্রথম মৃতদেহের খুব কাছে। ঝুঁকে নীচু হয়ে মৃতের অবশ শিথিল হাতটা তুলে আবার যেমনটি ছিল ঠিক সেইভাবে নামিয়ে রাখলে সন্তর্পণে আলগোছে।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পৃষ্ঠদেশে গুলি করা হয়েছে।
সীতা! সীতা খুন হল! অস্ফুট ভাবে কথাগুলো শতদলের কণ্ঠ হতে উচ্চারিত হল। এবং সঙ্গে সঙ্গে দু হাতে মুখ ঢাকল শতদল।
বসুন শতদলবাবু বসুন। শতদলবাবুকে ধরে বসিয়ে দিলাম একটা চেয়ারের উপর, নার্ভ হারাবেন না।
আপনিই দেখেছিলেন? আপনার নামটা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি? কিরীটী সেই তরুণীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে।
উনি মিস গূহ। এখানকার উকিল শরৎবাবুর মেয়ে। জবাব দিলেন পার্শ্বেই দণ্ডায়মান প্রৌঢ়বয়স্কা একটি ভদ্রমহিলা।
দেখুন! এবারে কিরীটী সমবেত সমস্ত নরনারীকে সম্বোধন করে বললে, আপনারা সকলে এইভাবে এই ঘরে ভিড় করলে তো চলবে না। অবশ্য আপনাদের সকলের সঙ্গেই আমাদের কথা বলার প্রয়োজন হবে—তবে একে একে, পৃথক পৃথক ভাবে। কী বলেন রসময়বাবু? কিরীটী তার বক্তব্য শেষ করলে শেষ মুহূর্তে থানা-ইনচার্জ রসময়বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে।
