কুব্জী মন্থরা বা প্রিয়সখী ললিতা! কিরীটীর শেষোচ্চারিত কথাটারই জের টেনে কী যেন আমি বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কিরীটী আমাকে বাধা দিয়ে নিরস্ত করলে, বড্ড ঘুম পেয়েছে রে। চোখ আর খুলে রাখতে পারছি না।
কথাটা উচ্চারণ করতে করতেই কিরীটী আমাদের নির্দিষ্ট ঘরের দিকে একেবারে এগিয়ে গেল সোজা। বুঝলাম এখন আর কোনরূপ আলোচনা করতে কিরীটীর ইচ্ছে নেই, তাই তার অকস্মাৎ মৌনভাব।
সত্যি-সত্যিই কিরীটী অতঃপর সোজা পায়ের জুতোটা খুলে শয্যার ওপরে চটপট চাদরটা গলা অবধি টেনে নিয়ে টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল।
অগত্যা নিরুপায় আমাকেও গিয়ে বাকি রাতটকুর জন্য শয্যা আশ্রয় নিতে হল। কিন্তু আমার চোখে আর তখন ঘুম নেই। বাকি রাতটুকু আমায় জেগেই কাটাতে হবে। শতদলের ব্যাপারটা ক্রমেই যেন বেশী অস্পষ্ট বলে মনে হচ্ছে। নিজে সেই সন্ধ্যা হতে মনে মনে সব কিছু বিশ্লেষণ করে একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিলাম, নিরালার মূল্য একমাত্র সেই বাড়িটাই নয়, আর কিছু আছে এবং সেইখানেই এ রহস্যের মূল। শতদল ও সীতার কথাগুলো মনে পড়ছে। শতদল বাড়িটা বিক্রি করতে চায় এবং কয়েকজন খরিদ্দারও ইতিমধ্যে জুটেছে এবং আশাতীত মূল্য দিয়ে তারা বাড়িটা ক্রয় করতে চায়। কিন্তু কেন?
তা ছাড়া আরও একটা কথা। কিছুক্ষণ আগে হোটেলের পথে কিরীটী যা বলছিল, হিরণ্ময়ী দেবী নাকি পঙ্গু নন! কী উদ্দেশ্যে তিনি নিজেকে এভাবে পঙ্গু সাজিয়ে রেখেছেন? আর পঙ্গুই যদি তিনি নন—পঙ্গুর অভিনয়ই বা করে যাচ্ছেন কেন? আর কতদিন থেকেই বা এ অভিনয় করছেন? আর ভুখনাও নাকি কালা নয়! ভুখনা শতদলের নিজের চাকর। তার কথা নিশ্চয়ই শতদল জানে। শতদল কি জানে হিরণ্ময়ী দেবীর রহস্য? আশ্চর্য! এও তো বোঝা যায় না, একজন এমনি করে সুস্থ হয়েও দিনের পর দিন রাতের পর রাত পঙ্গুর অভিনয় করে যাচ্ছেন। আর ভুখনাই বা কেন কালা সেজে থাকে!
ইতিপূর্বে আরো কত জটিল রহস্যের মীমাংসা করেছি, কিন্তু এতখানি জটিলতার সম্মুখীন ইতিপূর্বে হয়েছি বলে মনে পড়ে না।
***
কিরীটীর অনুমান যে এত তাড়াতাড়ি সত্যে পরিণত হবে, এমন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় সত্য রূপ নেবে, সত্যিই সেদিন সন্ধ্যাতে ভাবিনি। এবং সত্য কথা বলতে কি, শতদলের ব্যাপারটাকে প্রথম হতেই আমি খুব বেশী একটা গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু কিরীটী বুঝেছিল, তাই বোধ হয় দু-চারবার অবশ্যম্ভাবী সেই সর্বনাশের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
শুধু শতদলের ব্যাপারেই নয়, ইতিপূর্বে আমিও দুচারবার দেখেছি কিরীটীর অদ্ভুত বিশ্লেষণ-শক্তি—অন্ধকারের মধ্যে যেন ভবিষ্যতের পদসঞ্চার সে শুনতে পায়। পঞ্চ অনুভূতির বাইরে তার যে একটা বিচিত্র ষষ্ঠ অনুভূতি, যার সাহায্যে অনেক সময় অসাধ্য সাধন করেছে সে, ভাবতে গেলে যেন বিস্ময়ের অবধি থাকে না। কিরীটী বলে ওটা নাকি তার common sense, স্বাভাবিক বুদ্ধির বিচারশক্তি।
কিন্তু যাক, যে কথা বলছিলাম।
দিন দুই পরের কথা। মেলার উৎসবে ছোট শহরটিতে যেন প্রাণ-চাঞ্চল্যের একটা সাড়া পড়ে গিয়েছে।
রাত্রে বিস্তীর্ণ সমুদ্রের বালুবেলার ওপরে বাজির প্রতিযোগিতা হবে। অ্যামেচার ও পেশাদার বাজিকরদের ভিড়ে সৈকতের নিদিষ্ট স্থানটি গমগম করছে। রাত আটটা হতে বিভিন্ন দলের প্রতিযোগিতা শুরু হবে। নিরালার উন্মুক্ত গেট খুলে দেওয়া হয়েছে বিকাল হতেই। সর্বসাধারণের কাছে আজ অবারিত নিরালার লৌহ-ফটক। আমি, কিরীটী ও স্থানীয় থানা-ইনচার্জ গিয়ে দাঁড়িয়েছি। শতদল সকলকে অভ্যর্থনা করতেই ব্যস্ত। হোটেল হতে রাণু দেবীও এসেছে। আসেননি তার মা মিসেস মিত্র। হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে নাকি ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। দুবেলাই স্থানীয় ডাক্তার চ্যাটার্জী যাতায়াত করছেন হোটেলে।
আজকের রাতের শীতটা বেশ আরামদায়ক। স্থানীয় দু-চারজন অফিসারের স্ত্রী ও কন্যারা এবং স্থানীয় ভদ্রলোকেরাও অনেকে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে বাজি প্রতিযোগিতা দেখতে এসেছেন।
পরিষ্কার আকাশ। ঝকঝক করছে তারাগুলো।
হঠাৎ একটা মিষ্টি হাসির তরঙ্গোচ্ছাসে সামনের দিকে চেয়ে দেখি, সীতা রাণুর সামনে দাঁড়িয়ে উচ্ছসিতভাবে হাসছে।
সীতার এমন হাসিখুশি আনন্দ-রূপ এ কয়দিনের পরিচয়ের মধ্যে এক দিনের জন্যেও দেখিনি।
সীতাকে মানিয়েছেও আজ ভারি চমৎকার। সাদা চওড়া জরির পাড় বসানো কালো জর্জেট শাড়ি, গায়ে সিফনের সাদা ব্লাউজ, মাথার চুল বেণীর আকারে পৃষ্ঠদেশে লম্বমান।
রাত্রি ঠিক আটটার সময় বাজির প্রতিযোগিতা শুরু হল।
বিচিত্র সুন্দর দৃশ্য। কালো আশমানের বুকে লাল নীল সাদা হরেক রঙের আগুনের ফুলকিগুলো যেন আলোর ফুলঝুরি ছড়িয়ে চলেছে। হাউইগুলো সোনালী সর্পিল রেখায় কালো আকাশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যেন এক-একটা অগ্নি-ইঙ্গিত এঁকে চলে যাচ্ছে। মিলিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে।
সকলেই আমরা যেন আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠেছি। হঠাৎ সেই কলগুঞ্জনের মধ্যে শতদলের কণ্ঠস্বর কানে এল।
শতদল সীতাকে বলছে, এই ঠাণ্ডার মধ্যে গরম জামা গায়ে দাওনি কেন সীতা?
ঠাণ্ডা আবার কোথায়!
হঠাৎ ঠাণ্ডা লাগতেই বা কতক্ষণ? যাও, নিচে গিয়ে একটা গরম জামা গায়ে দিয়ে এস।
কিছু হবে না।
না। আমার এই শালটাই না হয় গায়ে দাও।
