তা তো হবারই কথা। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আমার পক্ষেও কোন মতামত দেওয়া তো সম্ভব নয় মিঃ ঘোষাল! তবে আজ সন্ধ্যা থেকেই একটা কথা আমার মনে হচ্ছে মিঃ ঘোষাল যে, শিল্পী রণধীর চৌধুরীর সম্পত্তি কেবল ঐ নিরালা প্রাসাদখানিই নয়—there is something more! Something more!
কী আপনি বলতে চান মিঃ রায়?
আমি নিজেও এখন অন্ধকারেই মিঃ ঘোষাল। কয়েকটা ছিন্ন সুত্র কেবল হাতে এসেছে, ভাসা-ভাসা অস্পষ্ট। হয়তো দু-একদিনের মধ্যেই এমন কোন ঘটনা ঘটবে যার সাহায্যে আমরা কোন একটা সিদ্ধান্তের পথে এগিয়ে যেতে পারব। Matter will take a shape!
কিরীটীর নির্দেশমত ঐ রাত্রেই সাধারণ একজন জেলের ছদ্মবেশে আমাকে হোটেল থেকে বের হতে হল।
রাত্রি তখন বোধ করি এগারটা হবে।
সাগরের কিনার দিয়ে হনহন করে চলেছি নিরালার দিকে। চাঁদ উঠতে এখনো ঘণ্টাখানেক দেরি।
সঙ্গে আমার একটা দড়ির মই, একটা টর্চ ও লোডেড পিস্তল।
নিরালার গেটের কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়ালাম। গেট হতে আমার দুরত্ব তখন প্রায় হাত-কুড়ি হবে।
তারার অল্প আলোয় দেখলাম, পাশাপাশি দুটি ছায়া-মূর্তি গেট খুলে বাইরে বের হয়ে এল।
চট করে রাস্তার ধারে পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করলাম।
ছায়া-মূর্তি দুটো এগিয়ে আসছে। কে? কারা ওরা? অন্ধকারেই তাকিয়ে রইলাম।
১০. এগিয়ে আসছে ছায়া-মূর্তি দুটো
এই দিকে এগিয়ে আসছে ছায়া-মূর্তি দুটো। কাছে—আরো কাছে। ততক্ষণে তাদের অস্পষ্ট কথাবার্তার দু-একটা টুকরো টুকরো শব্দও কানে আসছে।
চমকে উঠলাম এবার, চিনতে পেরেছি ওদের। শতদল ও সীতা। দূরের একটানা সমূদ্রগর্জনকে ছাপিয়েও ওদের মৃদু কথার শব্দতরঙ্গ আমার কানে এসে প্রবেশ করছিল। অন্ধকারে স্পষ্ট না দেখতে পেলেও কণ্ঠস্বরে ওদের চিনেছি। সীতা বলছিল, তুমি জান না শতদল মায়ের দৃষ্টি কী অসম্ভব প্রখর। আমার মনে হয়, ঘুমের মধ্যেও তাঁর দুচোখের দৃষ্টি আমার সমস্ত গতিবিধির ওপরে রেখেছেন। তিনি যদি ঘুর্ণাক্ষরেও জানতে পারেন এত রাত্রে তোমার সঙ্গে আমি বাড়ির বাইরে এসেছি।
সেই জন্যই আরও ‘নিরালা’র বাইরে এলাম। তোমার মার শকুনির মত দৃষ্টি। সত্যি বলছি, আমার গা শিরশির করে। শতদল জবাব দেয়, তাই তো চিঠি লিখে তোমায় এত রাত্রে এই বাইরে ডেকে এনে তোমার সঙ্গে দেখা করবার ব্যবস্থা আমাকে করতে হয়েছে!
কিন্তু আমি যে তোমার চিঠি পেয়ে এত রাত্রে বাইরে আসব ভাবলে কী করে? যদি না আসতাম?
আমি জানতাম তুমি আসবেই, সেই জন্যই চিঠি দিয়েছিলাম। যাক, এই পাথরটার উপরেই এস বসা যাক।
পথের ধারে একটা বড় পাথরের উপর দুজন পাশাপাশি বসল আমার দিকে পিছন ফিরে। এ একপক্ষে ভালই হল। আমি যে পাথরটার আড়ালে আত্মগোপন করে ছিলাম সেই পাথরটা থেকে হাত-তিনেক দুরেই বড় পাথরটার উপরে দুজনে পাশাপাশি বসেছে।
মাথাটা একটু উঁচু করে দেখলাম, পিছন ফিরে সীতা বসে আছে, সাগরবাতাসে তার শাড়ির আঁচলটা ও খোলা চুলের রাশ উড়ছে। সীতার একেবারে গা ঘেষে বসে আছে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে শতদল।
শতদলের কথায় সীতা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর একসময় বলে, সব কিছুর পরেও তুমি কি আশা করেছিলে শতদল যে আমি আসব তোমার চিঠি পেয়ে?
তুমি আমাকে আগাগোড়াই ভুল বুঝেছ সীতা!
সব জায়গায় ভুল করলেও একটা জায়গায় মেয়েমানুষ বড় একটা ভুল করে না। সীতা জবাব দেয়।
মানুষ মাত্রেই ভুল করতে পারে সীতা, তা সে কি মেয়েই হোক বা পুরুষেই হোক। একতরফা তুমি বিচার করেছ।
একতরফা বিচার করেছি! সীতার কণ্ঠে যেন বিস্ময়ের সুর ধনিত হয়ে ওঠে।
নিশ্চয়ই। কেন যে তুমি হঠাৎ আমার ওপরে বিরাগ হয়ে উঠলে সেটা তুমি আমায় জানানো পর্যন্ত কর্তব্যবোধ করলে না!
জলের মতই যেখানে সব কিছু পরিষ্কার, সেখানে গলা উচিয়ে জানাতে যাওয়াটা কি বিড়ম্বনা নয়? কিন্তু কাসুন্দি ঘেটেই বা কি আর লাভ বল?
তাহলে সত্যি-সত্যিই তুমি আমাদের অতীত সম্পর্কটাকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ধুয়ে-মুছে ফেলতে চাও সীতা?
সব দিক দিয়ে এক্ষেত্রে সেটাই তো বাঞ্ছনীয় শতদল। সেতারের একবার তার ছিড়ে গেলে আর কি ছেড়া তার জোড়া লাগালে পূর্বের সেই সুরে বের হয়! তবে কেন আর?
কোন কথাই তাহলে তুমি আর আমার শুনতে চাও না?
মনে মনে আমি সীতার কথা শুনে না হেসে পারি না। এমনই মেয়েদের মন বটে! সমস্ত সম্পর্ক শতদলের সঙ্গে ধুয়ে-মুছে গেছে বলেই বুঝি শতদলের একখানা চিঠি পেয়ে এই নিশুতি রাত্রেও বাড়ির বাইরে আসতে দ্বিধাবোধ করেনি?
শোন সীতা, কি কারণে তুমি হঠাৎ আমাকে আর বিশ্বাস করতে পারছ না। জানি না। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় তো আজকের নয়—গত তিন বৎসর হতে—এই তিন বৎসরেও কি আমাকে তুমি বুঝতে পারনি?
এতদিন তোমাকে আমি বুঝতে পেরেছি বলেই আমার ধারণা ছিল কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার সে জানাটাই ভুল! কিন্তু সে কথা থাক। কি জন্য এত রাত্রে এভাবে চিঠি লিখে তুমি আমাকে এখানে ডেকে এনেছ বল?
আমাকে যখন তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না, তখন সে-কথা তোমার আর শুনেই বা লাভ কী বল? যাক সে কথা,—শতদলের কণ্ঠে সুস্পষ্ট অভিমানের সুর।
এরূপর কিছুক্ষণ দুজনেই স্তব্ধ হয়ে থাকে। কেউ কোন কথা বলে না। অখণ্ড রাত্রির স্তব্ধতা শুধু, অদূরবতী গর্জমান সাগরের কলকল্লোলে পীড়িত হতে থাকে।
