এদের মান-অভিমানের পালাগান কতক্ষণ চলবে কে জানে! কিরীটীর উপরে সত্যিই রাগ ধরছিল। নিজে দিব্যি হোটেলের বিছানায় আরাম করে নাক ডাকাচ্ছে, আর আমাকে এই শীতের রাতে ঠেলে দিয়েছে! কী কুক্ষণেই যে ওর পাল্লায় পড়ে এই জায়গায় মরতে এসেছিলাম! ভেবেছিলাম কয়েকটা নিশ্চিত দিন আরামে কাটিয়ে দিয়ে যাওয়া যাবে সাগর-সিনারি দেখে, তা না, কী এক ঝামেলায়ই না পড়া গিয়েছে! কোথাকার কে এক পাগলা আর্টিস্ট, পাহাড়ের উপরে এক হানাবাড়ি, যত সব ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা, তার মধ্যে মিথ্যে মিথ্যে এমন করে জড়িয়ে পড়বার কি প্রয়োজন ছিল বাপ?
হঠাৎ আবার সীতার কথায় চমক ভাঙল।
তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছ শতদল!
প্রতারণা করেছি? এ-সব তুমি কি বলছ সীতা? শেষ পর্যন্ত তুমি এ কথা বললে যে তোমার সঙ্গে আমি প্রতারণা করেছি!
হ্যাঁ, প্রতারণা। নিশ্চয়ই প্রতারণা বৈকি। আজ বুঝতে পারছি, দিনের পর দিন তুমি আমার সঙ্গে প্রেমের খেলাই খেলে এসেছ। মনের মধ্যে একজনের চিন্তা অহোরাত্র করে বাইরে আর একজনের সঙ্গে তুমি খেলা করেছ। কিন্তু কী এর প্রয়োজন ছিল? আমি তো যেচে তোমার কাছে কোনদিন দাঁড়াইনি। তুমি, শেষের দিকে সীতার কণ্ঠস্বর কান্নায় যেন বুজে আসে। হায় রে! সেই চিরাচরিত ত্রিকোণ রহস্য। শতদল, সীতা ও রাণু। একটি পুরষ, দুটি নারী। সেই চির-পুরাতন চির-নতুন খেলা। সেই পঞ্চশরের একঘেয়ে রসিকতা।
ছি ছি! এতদিন এ কথা তুমি আমাকে বলনি কেন? রাণু-রাণুকে নিয়ে তুমি সন্দেহ করেছ? রাণু তো কুমারেশের বাগদত্তা। ওরা পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসে। আর কুমারেশের সঙ্গে যে আমার কতখানি বন্ধুত্ব তাও নিশ্চয়ই তোমার অজানা নেই!
কুমারেশ? কোন কুমারেশ?
কুমারেশকে চেনো না? কুমারেশ সরকার! অধ্যাপক ডাঃ শ্যামাচরাণু সরকারের একমাত্র ছেলে। মস্ত বড় ধনী। কিন্তু তার চাইতেও তার বড় পরিচয় হচ্ছে এশিয়ার মধ্যে সবচাইতে বড় সাঁতারু। এবারে অলিম্পিকে যার সাঁতারে যোগ দেওয়ার কথা।
ওঃ, তোমার সেই গায়ক কুমারেশ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। সেই কুমারেশ ও রাণু, ওরা পরস্পর পরস্পরকে বহুদিন হতে ভালবাসে। আজ পাঁচ-ছ বছর ওদের আলাপ দুজনের সঙ্গে। ছি ছি! দেখ তো কী একটা মিথ্যা কল্পনায় অনর্থক ব্যস্ত করেছ?
আমি নিজে পুরুষ, শতদলও পুরুষ, তাই শতদলের শেষের কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল শতদলের পরিস্থিতিতে আমি পড়লে আমিও হয়তো ঐরূপই অভিনয় করতাম। ঐ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছিল, মাত্র কয়েক রাত্রি আগে হোটেলের বারে শতদল ও রাণুর কথোপকথন।
তাহলে মিথ্যে তুমি দেরি করছ কেন? মাকে এবারে সব বললেই তো হয়! সীতা অনুরোধ জানায় শতদলকে।
দাঁড়াও, আর কয়েকটা দিন যেতে দাও। অ্যাটর্নীকে আমি চিঠি দিয়েছি, এই বাড়িটা আমি বিক্রি করতে চাই। পেপারে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ের উপরে এই পুরনো বাড়ি কে তোমার কিনবে?
কিনবে কী বলছ! জান, ইতিমধ্যেই দুজন খরিদ্দারের কাছ থেকে অফার পাওয়া গিয়েছে!
অফারই যদি পেয়েছ তো বিক্রি করে দিচ্ছ না কেন?
দাঁড়াও—ভাল দাম না পেলে ছাড়ব কেন?
এইরকম একটা বাড়ির জন্য তুমি ভাল দাম পাবে আশা কর?
নিশ্চয়ই। দাদুর হাতে আঁকা ছবিগুলোরই কি কম দাম! দাদুর মতই পাগল শিল্পী আছে যারা ঐ ছবির collections-এর জন্যই বাড়িটা হয়তো একটা fanatic দাম দিয়েও কিনবে।
কিন্তু কয়েক দিন ধরে যেভাবে তোমার উপর দিয়ে বিপদ যাচ্ছে
সেটাই তো চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে সীতা। ব্যাপারটার মাথা-মুন্ডু কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। প্রথমটায় কিরীটীবাবুর কথা আমি তো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তার পরের ব্যাপারগুলো সত্যিই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। এখন বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছি, কেউ আমার জীবন নিতে যেন বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন? কারও তো আমি কোন ক্ষতি করিনি? আমার তো কোন শত্রু নেই?
বাবা কী বলেন জান?
কী?
এ ঐ মামার প্রেতাত্মা! এ-বাড়ির মায়া আজও তিনি কাটাতে পারেননি তাই–
পাগল! বলতে বলতে শতদল হঠাৎ সীতাকে দুহাতে আরও কাছে টেনে নেয়।
না—আমার সত্যি কিন্তু তাই মনে হয়—
দাদু আমাকে কত ভালবাসতেন তা জান! আর কেউ হলে না-হয় বিশ্বাস করা যেত। দাদু আমার কোন ক্ষতি করবেন এ আমি ভাবতেও পারি না। স্বেচ্ছায় তিনি সব আমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছেন
মা কিন্তু তা বিশ্বাস করেন না।
তা জানি, কিন্তু তাঁর চিঠি আছে—
মা বলেন, ও চিঠির কোন মূল্য নেই—
মূল্য আছে কি না আছে, সেটা কোর্টই স্থির করবে। সেজন্য আমি ভাবি না। তা ছাড়া আমি তো দিদিমাকে বলেছিই, বাড়ি বিক্রি হলে কিছু টাকা তাঁকে দেব—তাঁর কোন প্রাপ্য এ-বাড়ি থেকে নেই তা সত্ত্বেও। কিন্তু তা তিনি চান না। তিনি বলেন এ বাড়িতে তাঁর অর্ধেক অধিকার। তারপর একটু থেমে আবার বলে, বাড়ি বিক্রির টাকা থেকে কিছু যে তাঁকে দেব বলেছি সেও তোমার জন্য সীতা। দাদুর বোন বলে নয়—তোমার মা বলে।
এ তো খুব ভাল প্রস্তাব। মা বুঝি তাতে রাজী নন?
না। এক-একবার কি মনে হয় জান সীতা?
কী?
দিয়ে দিই বাড়িটা তাঁকে। কী হবে মিথ্যে আপনার জনের সঙ্গে ঐ একটা পুরনো বাড়ি নিয়ে গোলমাল করে? শেষ পর্যন্ত বাড়িটা তো আমাদেরই হবে—
কী রকম?
আরে তোমাকে বিয়ে করলে তো আর আমি পর থাকব না! আর তুমি ছাড়া ওঁদের বা আর কে আছে সংসারে? যাক গে চল, অনেক রাত হল-এবারে ওঠা যাক।
