হ্যাঁ।
আজও তালা দেওয়াই তো ছিল?
না, বোধ হয় তালা দেওয়া ছিল না।
ছিল না?
না, এসেও দেখলাম একটু আগে টর্চটা নিতে এসে-ঘরের দরজাটা কেবল ভেজানোই আছে, তালা লাগানো নেই। কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ে, বিকালে বেরবার আগে যেন তালা দিয়েই গিয়েছিলাম। কী জানি, বোধ হয় তালা দিতে ভুলে গিয়েছি!
চাবিটা কোথায় ছিল?
আমার পকেটেই ছিল।
আপনার এ-ঘরের তালার কোন duplicate চাবি তো নেই? কিরীটী আবার প্রশ্ন করে শতদলকে।
আছে, সেও ঐ চাবির রিঙের মধ্যেই।
দেখুন তো, রিঙের মধ্যে চাবিটা আছে কিনা? হ্যাঁ, ঐ সঙ্গে রিং থেকে স্টুডিয়োর ঘরের তালার duplicate চাবিটাও আমাকে খুলে দিন।
কিরীটীর নির্দেশে শতদলবাবু ঘরের কোণে রক্ষিত একটা কাঠের ভারী চেস্ট ড্রয়ারের টানা খুলে তার ভিতর হতে অনেকগুলো চাবির গোছাসমেত একটা রিং বের করলেন। চাবির রিং থেকে প্রথমেই শতদল স্টুডিও-ঘরের তালার ড়ুপলিকেট চাবিটা খুলে কিরীটীকে দিলেন; তারপর এ-ঘরের তালার ডুপ্লিকেট চাবিটা রিঙের চাবির মধ্যে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু রিঙের সমস্ত চাবিগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও প্রয়োজনীয় ডুপ্লিকেট চাবিটা খুঁজে পাওয়া গেল না।
কী হল, চাবিটা নেই? আমি প্রশ্ন করলাম।
আশ্চর্য, সত্যিই চাবিটা তো নেই দেখছি! বুঝতে পারছি না সুব্রতবাবু-পরশু তো যতদূর মনে পড়ছে দেখেছিলাম যেন রিঙের মধ্যে সে চাবিটা ছিল!
যাক, ও নিয়ে আর মিথ্যে ব্যস্ত হবেন না শতদলবাবু। আমি পূর্বেই অনুমান করেছিলাম চাবিটা পাওয়া যাবে না। কথাটা বললে কিরীটীই।
অনুমান করেছিলেন। বিস্মিত সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকান শতদল কিরীটীর মুখের দিকে।
হ্যাঁ। কিরীটীর কণ্ঠ হতে ছোট্ট সংক্ষিপ্ত জবাবটি উচ্চারিত হল।
আমি আপনার কথা তো ঠিক বুঝতে পারলাম না মিঃ রায়।
আপনিই হয়তো দু-চার দিনের মধ্যেই আমার কথার তাৎপর্যটা বুঝতে পারবেন, আমাকে আর কষ্ট করে বলতে হবে না শতদলবাবু। কিন্তু সেকথা থাক, আপনি যে একটু আগে কী একটা চিঠির কথা বলছিলেন, চিঠিটা একটিবার দেখতে পারি কি?
নিশ্চয়ই। শতদলবাবু এগিয়ে গিয়ে ঘরের একটা দেওয়াল-আলমারি খুলে তার ড্রয়ার থেকে একটা সাদা বড় আকারের রঙ ও তুলির সাহায্যে চিত্র-বিচিত্র খাম বের করে এনে কিরীটীর হাতে দিলেন।
কিরীটী শতদলবাবুর হাত হতে খামটা নিয়ে আলোর সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখতে লাগল। আমিও পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
খামটার উপরে রঙের বাহার যেন চিত্র-বিচিত্র হয়ে উঠেছে। মানুষের মুখ হতে শুরু করে পশু-পাখি, ফল-ফল, লতা-পাতা কী যে নেই তার ঠিকানা নেই!
অনেকক্ষণ ধরে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কিরীটী খামের উপরে আঁকা চিত্রগুলি দেখতে লাগল। খামের মুখটা খোলাই ছিল, অতঃপর তার ভিতর হতে একটা ভাঁজ-করা কাগজ টেনে বার করল।
আলোর সামনে ভাঁজ খুলে কাগজটা মেলে ধরল।
একটা চিঠিঃ চিঠির শীর্ষে ব্র্যাকেটের মধ্যে দুই লেখা।
০৯. শেষ নির্দেশ
আমার আত্মীয়দের প্রতি—ইহাই আমার শেষ নির্দেশ (৩)
সজ্ঞানে লিখিয়া যাইতেছি, রণধীর চৌধুরী আমি (০)
আমার যাবতীয় সম্পত্তি ও এই ‘নিরালা’ গৃহখানি আমার (৩)
দৌহিত্র শ্রীমান শতদল বোসকে আমার মত্যুর পর (৫)
বর্তাইবে। কেবলমাত্র সে যেন স্মরাণ রাখে যে আমার স্টুডিওতে (৪)
যে সব আত্মীয়ের ছবিগুলো, যেমন পিতামহ প্রপিতামহের (৬)
সেইগুলো ও অন্যান্য যে সকল পেন্টিং ও ছবি (৩)
এবং ঐ সঙ্গে ঐ কক্ষ-মধ্যস্থিত সমস্ত মূর্তিগলোরও স্বত্ব (২)
বাকি সব বর্তাইবে আমার দৌহিত্র শতদলকুমারে (৩)
শুধু ঐ নয়, আমার শিল্পী-জীবনের নিন্দা ও যশের (২)
উত্তরাধিকারীও একমাত্র সে-ই হইবে (৩)
ইতি–
রণধীর চৌধুরীঃ ৩০৩৫৪৬৩২৩২৩ :
১৮ই ভাদ্র ১৩৫৩
অবাক বিস্ময়েই চিঠিটা বার-দুই আগাগোড়া পড়বার পরও চিঠিটার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। লেখা ছাড়াও চিঠিটার মধ্যে দুপাশে দুখানি মুখের রেখাচিত্র বা স্কেচ আঁকা।
কিরীটীর দিকে আড়চোখে তাকালাম। কিরীটীর সমস্ত চেতনা যেন চিঠিটার মধ্যেই তন্ময় হয়ে গিয়েছে। স্থির নিস্পন্দ ভাবে চিঠিটা আলোর সামনে প্রসারিত করে হাতের মধ্যে ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে।
সহসা শতদলবাবুর কণ্ঠস্বরে কিরীটীর তন্ময়তা ভঙ্গ হল।
দেখলেন তো চিঠিটা পড়ে মিঃ রায়? আমি আপনাকে ঠিক বলেছিলাম কিনা যে, আমিই দাদুর যাবতীয় সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী এবং তাঁর সম্পত্তি বলতে এই নিরালা গৃহটা আর স্টুডিওর মধ্যে একটু আগে যে ছবি ও মূর্তিগুলো দেখে এলেন ঐগুলোই!
হ্যাঁ, অন্ততঃ চিঠিটায় মোটামুটি ভাবে সেই নির্দেশই রয়েছে দেখলাম। অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে যেন কিরীটী শতদলের কথার জবাব দিল।
ঘরের মধ্যে দেরাজের উপর মাঝারি আকারের একটা টাইমস-পীস ছিল, হঠাৎ সেটা রিং-রিং করে বেজে উঠতেই চমকে টাইম-পীসটার দিকে তাকালাম, রাত্রি প্রায় পৌনে নটা।
শতদলও অ্যালার্মের শব্দে চমকে উঠেছিল, এগিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি অ্যালার্মের বোতামটা টিপে অ্যালার্ম বন্ধ করে দিলেন। কিরীটী রণধীর চৌধুরীর লেখা চিঠিটা ভাঁজ করে পুনরায় খামের মধ্যে ভরে রাখতে রাখতে বললে, যদি কিছু মনে না করেন শতদলবাবু এই চিঠিটাও আজকের রাতের মত নিয়ে যেতে চাই আমি। কাল আবার ফিরিয়ে দেব।
