হ্যাঁ। চেয়ে দেখ ছবির ফ্রেমটা একটু যেন peculiar! ব্রোঞ্জ-জাতীয় কোন মেটালের তৈরী। এবং যেমন মজবুত তেমনি ভারি। ওয়াটার-কলার একটা ছবি ও তার কাঁচের ওজন এত বেশী হতে পারে না। ছবিটার যা-কিছু ওজন ওই ফ্রেমটার জন্যই। কথাগুলো বলে সহসা যেন অতঃপর কতকটা স্বগতোক্তির মতই আস্তে আস্তে বললে, কিন্তু কেন?
কী বললি! প্রশ্নটা করলাম আমিই কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে।
ভাবছি ছবির ফ্রেমটার কথাই। বিনা প্রয়োজনে এ জগতে কিছুই তৈরী হয় না, সু। ছবির ফ্রেমটাও নিশ্চয়ই ঐভাবে তৈরী করবার আর্টিস্টের কোন একটা উদ্দেশ্য ছিল।
হয়তো ছবিটাকে মজবুত ও টেকসই করবার জন্যই।
There you are! You are cent per cent right, সু।
বাইরে এমন সময় পদশব্দ শোনা গেল।
অবিনাশ একটা আলো হাতে ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।
হঠাৎ কিরীটী অবিনাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, পায়ে তোমার বুঝি চোট লেগেছে অবিনাশ?
কিরীটীর আচমকা প্রশ্নে অবিনাশ যেন একটু চমকে থতমত খেয়ে বলে, আজ্ঞে?
কেমন একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছ দেখছি কিনা। পায়ে চোট লেগেছে নাকি? বেশ মোলায়েম কণ্ঠে কিরীটী আবার শুধোয়।
আজ্ঞে ঠিক খুঁড়িয়ে নয়, তবে জন্ম হতেই বাঁ পা-টা একটু খাটো কিনা, তাই একটু টেনে চলতে হয় চিরদিনই।
শতদলবাবু এসে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। হাতে তাঁর একটা ভারী পিতলের বড় তালা ও একটা চাবি।
এই নিন তালা কিরীটীবাবু! তালা ও চাবিটা এগিয়ে দিল শতদল কিরীটীর দিকে।
হ্যাঁ, দিন। কিরীটী তালা ও চাবি শতদলবাবুর হাত থেকে নিল, চাবি কি এই একটাই, না duplicate key আছে?
আছে।
সেটা কোথায়?
ও-ঘরে চাবির রিঙে আছে। এনে দেব কি?
না, থাক। চলুন বাইরে যাওয়া যাক।
সকলে আমরা বাইরে এলাম। কিরীটী নিজ হাতে দরজায় তালাচাবি দিয়ে চাবিটা নিজের জামার পকেটে রেখে দিল, এটা আমার কাছেই রইল শতদলবাবু। ডুপ্লিকেট চাবিটাও আমাকে দেবেন।
বেশ তো।
তারপর হঠাৎ যেন কথাটা মনে পড়েছে এইভাবে আলো হাতে দণ্ডায়মান অবিনাশের দিকে ফিরে তাকিয়ে কিরীটী তাকেই প্রশ্নটা করলে, ভাল কথা অবিনাশ, আজ এই কিছুক্ষণ আগে সন্ধ্যার দিকে তুমি যখন আমাদের সদর দরজা খুলে দিতে গিয়েছিলে, বলেছিলে না, বড়বাবু মানে হরবিলাসবাবু, তোমাকে আমাদের আসবার কথাটা জানতে পেরেই সদর দরজাটা খুলতে পাঠিয়েছিলেন
অ্যাজ্ঞে! মৃদুকন্ঠে অবিনাশ জবাব দিল।
আমরা যখন এ-বাড়ির সদরে এসে বাইরে থেকে ঘণ্টার দড়ি নাড়া দিই, তুমি আর তোমার বড়বাবু, কোথায় ছিলে?
আমি রান্নাঘরের দিকে ছিলাম—
আর বড়বাবু?
বড়বাবু রান্নাঘরের সামনে অন্ধকার বারান্দায় পায়চারি করছিলেন।
হুঁ। ভুখনা কোথায় ছিল?
সে তো রান্নাঘরেই ছিল। পূর্ববৎ মৃদুকণ্ঠে অবিনাশ জবাব দেয়, রান্না করছিল বোধ হয়।
হুঁ। আচ্ছা তুমি যেতে পার। আলোটা এইখানেই রেখে যাও।
অবিনাশ কিরীটীর নির্দেশমত হাতের হ্যারিকেনটা বারান্দায় নামিয়ে রেখে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
একদৃষ্টে কিরীটী অবিনাশের গমনপথের দিকে তাকিয়ে ছিল।
এবার আমিও স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম, সত্যিই অবিনাশ যেন তার বাঁ পা-টা একটু টেনেটেনেই চলছে। যতক্ষণ অবিনাশকে দেখা গেল, কিরীটী একদৃষ্টে সেই দিকে তাকিয়ে রইল। ক্ৰমে অবিনাশ সিঁড়ি-পথে নেমে নিচের দিকে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাবার পর কিরীটী শতদলের দিকে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, একটা ব্যাপার কখনো লক্ষ্য করেছেন শতদলবাবু—আপনাদের ঐ পুরনো চাকর অবিনাশের চলাটা একটু defective! মানে চলবার সময় বাঁ পা-টা একটু টেনে টেনে চলে?
কই, না? কখনো লক্ষ্য করিনি তো? শতদল জবাব দেয়।
লক্ষ্য করেননি? আশ্চর্য!
না, সত্যি লক্ষ্য করিনি। তবে সাধারণতঃ ও একটু আস্তেই যেন চলাফেরা করে বলে মনে হয়। শতদল বললে।
চলুন আপনার ঘরে যাওয়া যাক। কিরীটী যেন তার নিজের দিক হতেই উত্থিত ক্ষণপূর্বের প্রশ্নটা অতঃপর এড়িয়ে গিয়ে শতদলবাবুর শয়নকক্ষের দিকে সবাগ্রে পা বাড়াল।
সকলে এসে আমরা কিরীটীর পিছু পিছু শতদলবাবুর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাম। এক কোণে একটা উঁচু, টুলের ওপরে সাদা ডোম-ঢাকা আলো জ্বলছে। সমস্ত ঘরটা কিন্তু তবু সমানভাবে আলেকিত হয়নি। ঘর। আকারে বড় হওয়ার দরুনই বোধ হয় একটিমাত্র আলোয় সমস্ত ঘরটিকে তেমনভাবে আলোকিত করতে পারেনি। ঘরের একটিমাত্র জানালা ছাড়া বাকি সব কয়টি জানালাই বন্ধ। এবং একটিমাত্র ঐ খোলা জানালাপথে হু হু করে সমুদ্রের হাওয়া ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করছিল।
কিরীটী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে সর্বাগ্রে ঐ খোলা জানালাটার দিকে এগিয়ে গেল। আমিও কিরীটীকে অনুসরণ করে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দূরে সম্মুখে দৃষ্টির সামনে যেন একটা দিগন্তপ্রসারী কৃষ্ণ চাদর আর কানে ভেসে আসে একটানা একটা চাপা গর্জন অন্ধকার ভেদ করে। কিরীটীর হাতে তখন শতদলবাবুর দেওয়া পাঁচ সেলের হান্টিং টর্চটা। তারই আলো সম্মুখের দিকে ফেলল কিরীটী।
আলোর রশ্মিটা বহু দূর পর্যন্ত গেল—একেবারে এ-বাড়ির গেট পর্যন্ত।
হাতের আলোটা বার কয়েক কিরীটী নীচে চারিদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল, তারপর আলোটা নিবিয়ে ঘুরে দাঁড়াল এবং শতদলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, আপনি তো বলছিলেন শতদলবাবু এ ঘরটা আপনার অনুপস্থিতিতে তালা দেওয়াই থাকে, তাই না?
