আচমকা কিরীটী ঘুরে দাঁড়াল শতদলের মুখোমুখি হয়ে এবং তার স্বাভাবিক অনুসন্ধানী চাপা অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ছিল না?
না।
মুহূর্তের জন্য কিরীটীর কণ্ঠে যে অনুসন্ধিৎসা জেগে উঠেছিল তার পরবতী প্রশ্নে যেন তার আর লেশমাত্রও অবশিষ্ট রইল না, আপনার সঙ্গে ওঁদের পূর্ব-পরিচয় যদি কিছু না-ই থেকে থাকে, তাহলে হঠাৎই বা হিরন্ময়ী দেবী আপনাকে অপছন্দ করতে যাবেন কেন?
তাহলে কথাটা আপনাকে খুলেই বলি মিঃ রায়, যদিচ কারণটা আমার কাছে একান্তই হাস্যাপদ বলে মনে হয়। হিরন্ময়ী দেবী দাদুর মত্যুর পর আমার এভাবে এখানে আসাটাই যেন পছন্দ করেননি। আমি না এলে দাদুর সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারিণী তো তিনিই হতেন, যদিচ দাদুর সম্পত্তির মধ্যে তো এই বাড়িখানা ও একগাদা ছবি ও মূর্তি। আমার কাছে তো এর কোন মূল্যই নেই আর দাবিও করব না। একা মানুষ, বিয়ে-থাও করিনি, হ্যাঁ। মাইনে পাই প্রফেসারি করে তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত। এ কথা এখানে আসবার পরই ওদের আমি বলেছিলাম, কিন্তু
কিন্তু কী
কিন্তু উনি জবাব দিলেন, যতটুকু তাঁর প্রাপ্য তার এক কড়াক্ৰান্তিও উনি বেশী চান না এই সম্পত্তির!
হুঁ। মনে কিছু করবেন না শতদলবাবু একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল এবং না বলেও পারছি না—
নিশ্চয়ই, বলুন না?
প্রথমে যেদিন সৈকতে আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়, মনে আছে নিশ্চয়ই আপনার, আপনি কথায় কথায় বলেছিলেন, যতদূর আমার মনে পড়ে যে শিল্পী রণধীর চৌধুরীর বিরাট সম্পত্তির শেষ ও একমাত্র অবশিষ্ট তাঁর এই নিরালার ওয়ারিশ আপনি। তাই নয় কি?
কিরীটীর অমন সোজা ও স্পষ্ট অভিযোগে শতদল প্রথমটায় কেমন যেন একটু বিহ্বল হয়েই পড়ে, কিন্তু মুহূর্তে সে বিহ্বলতাটুকু কাটিয়ে হাস্যতরল কণ্ঠে বলে ওঠে, হ্যাঁ বলেছিলামই তো এবং এখনও তাই বলব, কিন্তু ওঁরা সে কথা মানতে চান না।
মানতে চান না কেন? রণধীরবাবুর কোন উইল নেই?
উইল-সেটাকে উইলই বলা চলে, মানে দাদুর লেখা একখানি চিঠি আমার কাছে আছে যেটা অনায়াসে আইনের চোখে উইলের সমপর্যায়ে পড়ে।
ওঃ, তবে সেটা ঠিক উইল নয়?
না। ঠিক উইলের খসড়ায় ফেলে রেজেস্ট্রী করবার বা কোন আইনজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করবারও হয়তো তিনি সময় পাননি, কারণ সেটাকে চিঠিই বলুন বা উইলই বলুন, তাঁর মত্যুর মাত্র দিনসাতেক আগে লেখা–
সেই উইলে কী আছে?
চলুন না আমার ঘরে—ঐ ঘরের দেওয়াল-সিন্দুকেই উইলটা আছে—
যাবখন, তবু বলুন না আপনি কী লেখা আছে সেই চিঠিতে?
বিশেষ কিছুই না, লেখা আছে এই নিরালা ও এ-বাড়ির যাবতীয় সব কিছু আমাকে তিনি দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মৃত্যুর পরে।
বাইরের দালানে এমন সময় অস্পষ্ট পদশব্দ পাওয়া গেল। এবং ঘরের মধ্যস্থিত একমাত্র হ্যারিকেন বাতিটা, হঠাৎ মনে হল, কেমন যেন তার আলোর শিখাটা নিস্তেজ হয়ে আসছে।
আলোটার দিকে দৃষ্টি আমারই প্রথম পড়ল, আলোটায় তেল নেই বলে যেন মনে হচ্ছে শতদলবাবু!
আমার কথায় আকৃষ্ট হয়ে কিরীটী ও শতদল দুজনেই আলোটার দিকে তাকাল।
আলোটা নিস্তেজ হয়ে এসেছে।
পদশব্দটা ঠিক দরজার গোড়ায় এসে থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষবারের মত বার-দুই দপ দপ করে আলোর শিখাটা কেঁপে নিবে গেল হঠাৎ।
অত্যন্ত আকস্মিক ভাবেই যেন আলোর শিখাটা নিবে গেল।
অন্ধকার। নিচ্ছিদ্র অন্ধকার হতে যেন আমাদের সমস্ত দৃষ্টিকে গ্রাস করল।
অন্ধকারে কিরীটীর গলা শোনা গেল, কে? কে ওখানে?
কথার সঙ্গে সঙ্গেই কিরীটীর হস্তধৃত পাঁচ-সেলের হানটিং টর্চের সতীব্র অনুসন্ধানী আলোর রশ্নিটা উন্মুক্ত দ্বারপথে গিয়ে পড়ল।
কে?
চিনতে কষ্ট হল না টর্চের আলোয়। দরজার ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে এ-বাড়ির পুরাতন ভৃত্য অবিনাশ।
আজ্ঞে আমি অবিনাশ! অবিনাশ জবাব দিল, আমায় ডাকছিলেন দাদাবাবু?
হ্যাঁ। কোথায় থাক তোমরা? আলোগুলোতে তেল থাকে কি না থাকে সেদিকেও তোমাদের এতটুকুও নজর নেই, কী কর যে সব সারাদিন বসে বাড়িতে? ঝাঁজালো বিরক্তি-পূর্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন শতদলবাবু।
কেন? আজ দুপুরেও সব বাতিতে তেল ভরে দিয়েছি!
তেল ভরেছ তো বাতি নিবে যায় কি করে? যাও, আর একটা বাতি নিয়ে এস শিগগির করে।
যাই। অবিনাশ নিঃশব্দে চলে গেল।
কিরীটী হস্তধৃত টর্চের আলো ফেলে ঘরের মেঝেটা আবার দেখতে লাগল। যে জায়গায় দেওয়াল থেকে ছবিটা মেঝেতে পড়েছিল তার চারিদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে ইতস্তত।
দেওয়ালের গায়ে যেখানে ছবিটা টাঙানো ছিল কিরীটী সেখানে আলো ফেলল, তারপর আবার ঘরের চারিদিকে অনুসন্ধানী আলো ফেলে মৃদুকঠে বললে, কতকটা যেন আত্মগত ভাবেই, আশ্চর্য! টুলটা দেখছি না–গেল কোথায়?
কী বললেন মিঃ রায়? প্রশ্নটা করলেন শতদলবাবুই।
একটা টুল–
টুল! বিস্মিত কণ্ঠে কথাটা উচ্চারণ করে কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন শতদল।
হ্যাঁ, টুল বা ঐ জাতীয় একটা কিছু– হ্যাঁ ভাল কথা, আপনার কাছে মজবুত তালা আছে শতদলবাবু?
তালা! তা আছে বোধ হয়—
নিয়ে আসুন। ঘরটা তালা দিয়ে রাখতে হবে।
শতদলবাবু ঘর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।
কিরীটী হাতের আলোটা ততক্ষণে ভূপতিত ছবিটির উপরে ফেলেছে এবং আমাকে এবারে লক্ষ্য করে বললে, ছবির ফ্রেমটা কিসের তৈরী বলে মনে হয় সু?
ছবি—মানে ঐ ছবির ফ্রেমটা?
