শতদল ঘর হতে অতঃপর নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল। ঘরের মধ্যে এখন আমরা দুজনই—কিরীটী ও আমি। হ্যারিকেন-বাতির স্বল্প আলোয় কিরীটীর মুখের দিকে তাকালাম।
মুখের রেখায় রেখায় কোন কিছু একটা চিন্তার সুস্পষ্ট আভাস। তার ইতিপূর্বের ধীর মৃদু সংযত কণ্ঠস্বর ও নিস্ক্রিয়তা থেকেই বুঝেছিলাম, ঐ মুহূর্তে গভীর ভাবেই কোন একটা চিন্তা কিরীটীর মাথার মধ্যে পাক খেয়ে চলেছে। এবং ঐ সময়ে সে নিজ হতে স্বেচ্ছায় মুখ না খুললে কারো সাধ্য নেই তাকে কথা বলায়। বুঝতে পারছিলাম ছবিটা অমনি আকস্মিক ভাবে মাটিতে পড়ে গিয়ে ভাঙার ব্যাপারটা সে খুব সহজভাবে নেয়নি। শতদলের ক্ষণপূর্বের জবানিতে জানা গিয়েছে ঘরটা বন্ধ ছিল এবং এ ঘরের চাবিটাও তারই ঘরে ছিল। অথচ দেখা যাচ্ছে ঘরের দরজায় কোন তালা নেই-দরজা খোলা এবং ঘরের মধ্যে ঐ ছবিটা ভগ্ন কাঁচের টুকরোর মধ্যে পড়ে আছে। আরো ভাঙার শব্দটা কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা নিচের তলা থেকেই শুনেছি। ছবিটা আপনা হতেই পড়ে গিয়ে যে ভাঙেনি তারও প্রমাণ পাচ্ছি।
সব কিছু পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এ কথাটা স্বতঃই মনে হচ্ছে, কেউ নিশ্চয়ই এ ঘরে এসেছিল। এবং ছবিটা পাড়তে গিয়ে বা নামাতে গিয়ে দেওয়াল থেকে আচমকা অসাবধানতাবশতঃ তার হাত থেকে হয়তো মাটিতে পড়ে গিয়ে কাচটা ভেঙেছে। খুব সম্ভব সেই কারণেই হয়তো তাকে আচমকা ঘটনাবিপর্যয়ে স্থানত্যাগ করতে হয়েছে।
এক্ষেত্রে তাহলে বক্তব্য হচ্ছে, কেউ না কেউ কিছুক্ষণ আগে এ ছবিটার জন্য এ-ঘরে এসেছিল। যেই আসুক! কিন্তু কেন?
এ ছবিটার প্রয়োজন নিশ্চয় ছিল তার। কিন্তু কেন? কী প্রয়োজন ছিল তার?
ওজনে অত ভারী এবং আকারে অত বড় ছবিটা চট করে কোথায়ও নিয়ে যাওয়া বা লুকোনোও তো সহজ নয়। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, তার ছবিটা সরাবার বা কোথাও নিয়ে যাওয়ার ঠিক প্রয়োজন ছিল না, কেবল হয়তো ছবিটা দেওয়াল হতে নামিয়ে দেখতেই চেয়েছিল সে। কিন্তু ছবিটা দেখবারই যদি প্রয়োজন ছিল তার, দেওয়ালে টাঙানো অবস্থাতেও তো দেখতে পারত? দেওয়াল হতে নামাবার কী প্রয়োজন ছিল?
বাইরে এমন সময় জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। বুঝলাম শতদলবাবু চাবির রিং ও টর্চ নিয়ে এই ঘরেই আসছে।
অনুমান মিথ্যা নয়। শতদলবাবুই ঘরে এসে প্রবেশ করলেন এবং নিঃশব্দে চাবির রিংটা ও পাঁচ-সেলের একটা হান্টিং টর্চ কিরীটীর দিকে এগিয়ে দিলেন।
ডান হাতে চাবির রিংটা ধরে বাম হাতে টর্চটা নিল কিরীটী।
এই রিংয়ের মধ্যেই এই ঘরের তালার চাবিটা ছিল? কিরীটী শতদলকে প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ। দেখুন তো সে চাবিটা আছে কি না? সু বাতিটা একটু তুলে ধর। কিরীটীর নির্দেশমতো বাতিটা আমি তুলে ধরলাম।
চাবির গোছাটা কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে শতদল মৃদুকণ্ঠে বললে, এই তো, চাবিটা রিংয়ের মধ্যেই আছে দেখছি।
একটা বড় আকারের চাবি গোছার ভিতর থেকে আলাদা করে কিরীটীর। সামনে ধরল শতদল।
চাবির রিংটা আপনার ঘরে যে আলমারির ড্রয়ারে ছিল বলছিলেন, সেটা কি চাবি দেওয়াই থাকত শতদলবাবু?
হ্যাঁ। চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলেই তো রিংটা নিয়ে এলাম।
ড্রয়ারের চাবিটা কোথায় ছিল?
আমার পকেটেই ছিল। সর্বদা পকেটেই রাখি।
আপনার ঘরটা কি সাধারণতঃ যখন আপনি থাকেন না, তালা দেওয়া থাকে
না।
কিরীটী অতঃপর টর্চের আলো ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে কী যেন দেখল, এরং ফিরে এসে বললে, তালাটা নেই দেখছি। ভাল কথা, আজ কখন আপনি বাইরে বের হয়েছিলেন? কতক্ষণই বা বাইরে ছিলেন শতদলবাবু?
প্রায় গোটা-চারেকের সময় বাইরে গিয়েছি–
যাওয়ার সময়ও এই ঘরের দরজার সামনে দিয়েই আপনি গিয়েছিলেন, তখন লক্ষ্য করেছিলেন কি, এই ঘরের দরজার তালাটা ছিল কিনা?
না, লক্ষ্য করিনি।
কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?
থানায় গিয়েছিলাম দারোগাবাবুকে গতরাত্রের ব্যাপারটা জানাতে।
দারোগাবাবুর সঙ্গে দেখা হল?
হয়েছে।
হোটেলে কখন গিয়েছিলেন?
থানায় ঘণ্টাখানেক ছিলাম, বোধ করি সাড়ে ছটা নাগাদ হোটেলে পৌঁছাই। সেখানে আপনাদের না পেয়ে বরাবর এখানে ফিরে আসি।
হুঁ। আচ্ছা একটা কথা বলতে পারেন, শতদলবাবু হিরন্ময়ী দেবীরা এখন নিচের মহলে যে ঘরটায় আছেন সেই ঘরের দেওয়ালে পাশাপাশি যে দুটি মহিলার ছবি টাঙানো আছে তাঁরা কারা?
আমি লক্ষ্য করে দেখিনি তো! বিস্মিত দৃষ্টিতে কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে শতদল জবাব দেয়।
দেখেননি? কাল একবার দিনের বেলা ছবি দুটো ভাল করে দেখে আমাকে বলবেন তো, চিনতে পারেন কিনা ছবি দুটো কার? কতকটা যেন নির্দেশের সুরেই কথাগুলো বললে কিরীটী।
কিরীটী প্রস্তাবে শতদল যেন একটু ইতস্ততঃ করে বলে, উনি মানে আপনার ঐ হিরন্ময়ী দেবী, আমাকে ঠিক যেন পছন্দ করেন বলে আমার মনে হয় না মিঃ রায়। কাজেই তাঁর ঘরে যাওয়া–
অবিশ্যি যদি কিছু মনে না করেন—আপনার ওরকম মনে হওয়ার কোন কারণ আছে কি?
থাকলেও অন্ততঃ আমি জানি না মিঃ রায়, কারণ এবারে এখানে আসবার পূর্ব পর্যন্ত ওঁদের সঙ্গে আমার কোন চেনা-পরিচয়ই ছিল না।
হরবিলাসবাবু, হিরন্ময়ী দেবী ও ওঁদের মেয়ে ঐ সীতা—এদের কারও সঙ্গেই পূর্বে আপনার আদৌ কোন পরিচয় ছিল না আপনি বলতে চান শতদলবাবু?
প্রশ্নটার মধ্যে যেন কোন গুরুত্ব নেই, কথার পিঠে কথাপ্রসঙ্গে এসে গিয়েছে এমনি ভাবেই অত্যন্ত শান্ত ও নির্লিপ্ত কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে ইতিমধ্যে হাতের টর্চটা জেলে তার আলোয় কিরীটী ঘরের চতুর্দিকে দেওয়ালে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। শতদল মুহূর্ত কাল চুপ করে থেকে মৃদু সংযত কণ্ঠে জবাব দিল, না।
