সকলে ভিতরে এসে প্রথমে বারান্দা অতিক্রম করে। শতদলবাবুর শয়নঘরের ঠিক পাশের ঘরটির দরজা হাঁ করে খোলা দেখে প্রথমে শতদলবাবুই থেমে বললে, এ কি! ঘরের দরজাটা খোলা কেন?
দরজাটা বন্ধ ছিল সেদিনও দেখেছি, যতদূরে আমার মনে পড়ছে তালাবন্ধই ছিল, না শতদলবাবু? কথাটা বললে কিরীটী।
হ্যাঁ। দাদার স্টুডিও-ঘর। এটা সর্বদা বন্ধই থাকে, আমি এখানে আসা পর্যন্ত,-মৃদুকণ্ঠে শতদল জবাব দেয়, আশ্চর্য! এ দরজায় একটা হবস-এর ভারী তালা লাগানো ছিল—তালাটাই বা কোথায় গেল? পরক্ষণেই ঘরে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে অল্প একটু এগিয়ে শতদল উচ্চকণ্ঠে ডাকল, অবিনাশ? অবিনাশ?
অমনি অবিনাশকে একটা আলো নিয়ে আসতে বলুন তো! কিরীটী কথাটা বললে।
কিন্তু অবিনাশের কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
শতদল সিঁড়ির দু-চারটে ধাপ এগিয়ে গিয়ে আবার উচ্চকণ্ঠে হাঁক দিল, অবিনাশ? ভুখনা?
এবারেও অবিনাশের বা ভুখনার কারোরই কোন সাড়া পাওয়া গেল না নিচের তলা হতে।
উপরে একটা বাতি নিয়ে আয় ভুখনা! তথাপি শতদল চেচিয়ে বললে।
কিছুক্ষণ পরেই সিঁড়িতে ক্ষীণ পদশব্দ পাওয়া গেল এবং দেখা গেল শতদলবাবুর সেই বিচিত্র চেহারার রাঁধুনী বামন একটা হারিকেন হাতে উপরে উঠে আসছে।
হ্যারিকেন বাতিটা হাতে নিতে নিতে শতদল ভুখনার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, অবিনাশ কোথায়?
নিঃশব্দে ভুখনা মাথাটা একবার দোলাল মাত্র, সে জানে না। যা, দেখ অবিনাশ কোথায় আছে, তাকে একবার ডেকে দে। ভুখনা চলে গেল।
সর্বাগ্রে হ্যারিকেন হাতে শতদল এবং পশ্চাতে আমি ও কিরীটী ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকলাম।
হ্যারিকেনের বাতিটার অনুজ্জ্বল আলোয় অকস্মাৎ যেন ঘরের মধ্যে চারিদিক হতে অনেকগুলো চোখের দৃষ্টি একসঙ্গে আমাদের উপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
একসঙ্গে অনেকগুলো চোখের দৃষ্টি আমাদের চারিদিকে হঠাৎ সজীব হয়ে জিজ্ঞাসায় প্রখর হয়ে উঠেছে, কে তোমরা? কি চাও?
ঘরের দেওয়ালে বিরাট সব প্রমাণ-সাইজের কলার ও অয়েলপেন্টিং, নানা আকারের পাথর, প্লাস্টার ও ব্রোঞ্জের প্রতিমূর্তি। মনে হয় একটু আগেও বুঝি ওদের প্রাণ ছিল, হঠাৎ কেউ মন্ত্রোচ্চারণে ওদের বোবা করে দিয়ে গিয়েছে। অনুজ্জ্বল আলোর অপর্যাপ্ত আভা চারিদিককার ছবি ও মূর্তিগুলোর উপরে প্রতিফলিত হয়ে যেন সৃষ্টি করেছে কি এক ঘনীভূত রহস্যের!
কিরীটী শতদলবাবুর হাত হতে হ্যারিকেনটা নিয়ে উঁচু করে চারিদিকে ঘুরিয়ে একবার দেখতেই, সকলেরই আমাদের যুগপৎ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঘরের পূর্বে কোণে মেঝেতে একটা ভারী কারুকার্যখচিত চওড়া বোঞ্জের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি মেঝেতে পড়ে আছে এবং তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাঁচের টুকরো। বোঝা গেল ক্ষণপূর্বে আমরা ঐ ভারী ছবিটারই পড়ে গিয়ে ভাঙ্গার শব্দে নীচে থেকে সচকিত হয়ে উঠেছিলাম। কিরীটী নিঃশব্দে বাতিটা হাতে নিয়ে সর্বাগ্রে সেই দিকে গেল।
ছবিটা উবুড় হয়ে পড়ে আছে।
একটা মোটা তার দিয়ে দেওয়ালের গায়ে বড় একটা পেরেকের সাহায্যে ছবিটা দেওয়ালে টাঙানো ছিল। দেখা গেল ছবির সঙ্গে তারটাও অক্ষতই আছে, দেওয়ালের গায়ে পেরেকটাও ঠিক আছে। তবে ছবিটা এইভাবে মাটিতে খসে পড়ল কী করে?
কিরীটী হ্যারিকেনটা মেঝেতে একপাশে নামিয়ে রেখে নীচু হয়ে মাটি হতে ছবিটা তুলে সোজা করে দাঁড় করাল।
চোগা-চাপকান পরিহিত মাথায় পাগড়ি-আঁটা বিরাট এক পুরুষের প্রতিকৃতি অয়েলকলারে অঙ্কিত। প্রশস্ত ললাট, উন্নত খড়্গের মত নাসিকা, দীর্ঘ আয়ত চক্ষু এবং সেই চক্ষুর দৃষ্টি যেন মনে হয় সজীব এবং অন্তর্ভেদী।
ছবিখানা দুহাতের সাহায্যে একবার মাটি থেকে উঁচু করে কিরীটী বোধ। হয় ছবিটার ওজনটা পরীক্ষা করে আবার নামিয়ে রাখল, বেশ ভারী ছবিখানা! ওজনে অন্ততঃ পনের-ষোল সের হবে!
মৃদু আত্মগত ভাবেই যেন কথাগুলো কতকটা উচ্চারণ করল কিরীটী। তার পরই শতদলের দিকে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, চেনেন শতদলবাবু এ ছবিটা কার?
না। এখানে আসবার পর একদিন মাত্র এ ঘরে ঢুকেছিলাম। এর আগে দু-একবার যা এখানে এসেছি, এই স্টুডিও-ঘরে কখনো প্রবেশ করিনি। দাদু কখনো কাউকে এ ঘরে ঢুকতে দিতেন না।
কেন? প্রশ্নটা করলাম এবারে আমিই।
তিনি ঠিক কারো এই স্টুডিও-ঘরে প্রবেশ করাটা পছন্দ করতেন না। বরাবরই লক্ষ্য করেছি, এই স্টুডিও-ঘরে প্রবেশ সম্পর্কে তাঁর যেন একটা sentiment ছিল। দিবারাত্র এই ঘরের মধ্যেই প্রায় রং-তুলি, ইজেল অথবা ছেনী-বাটালী নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতেন। দীর্ঘকাল ধরে একবেলাই আহার করতেন শুনেছি রাত্রে। এও শুনেছি অনেক রাত্রে নাকি তিনি খাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে যেতেন, এই ঘরের মধ্যে তাঁর রাত কেটে যেত
শিল্পীর সাধনা-ক্ষেত্রই বটে। শিল্পী রণধীর চৌধুরী যেন এখনো এই মূর্তি ও ছবিগুলোর মধ্যেই বেঁচে আছেন। নিভৃত এই কক্ষখানির মধ্যে তিনি আপনাকে যে একান্তভাবে সমর্পণ করেছিলেন এবং যে সমর্পণের ভিতর দিয়ে এই বিস্ময় তিল তিল করে গড়ে উঠেছে তারই সাক্ষ্য যেন কক্ষের চতুর্দিকে।
এই ঘরের চাবিটা?
সেটা তো আমি যে ঘরে থাকি সেই ঘরের আলমারির ড্রয়ারের মধ্যে থাকত একটা রিংয়ে অন্যান্য চাবির সঙ্গে।
দেখুন তো সে রিংয়ে চাবিটা আছে কিনা? কিরীটী শতদলকে অনুরোধ জানায়।
দেখছি, শতদলবাবু ঘর হতে বের হয়ে যাবার আগেই আবার কিরীটী বললে, শতদলবাবু just a minute, ঐ সঙ্গে kindly একটা টর্চও নিয়ে আসবেন।
