আমি? হিরন্ময়ী দেবী হাতের বুনন থামিয়ে তাকালেন কিরীটীর মুখের দিকে।
হ্যাঁ, আপনি!
আমি আর আমার স্বামী দুজনেই প্রায় একসঙ্গে বের হয়ে আসি ঘর থেকে। কতকটা যেন ইতস্তত করেই কথাটা বললেন হিরন্ময়ী দেবী।
হুঁ। হরবিলাসবাবুকে দেখছি না, তিনি কোথায়?
আমাকে খুঁজছিলেন বুঝি, মিঃ রায়? কথাটা কেমন একটা ব্যঙ্গের সুরে উচ্চারণ করতে করতে ঠিক কিরীটীর প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই কতটা যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসবার মতই ঐ মুহূর্তে হরবিলাস ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।
তাঁর আকস্মিক আবির্ভাব ও প্রশ্নের জবাবে মনে হল, কিরীটীর মুহূর্ত আগেকার প্রশ্নটির জন্যই বুঝি এতক্ষণ হরবিলাস ঠিক ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন।
গায়ে কালো রঙের সেই গরম গলাবন্ধ ঝুল-কোট, গলায় ও মাথায় একটা উলেন কম্ফর্টার জড়ানো, মুখ-ভর্তি কাঁচা-পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি—মনে হয় পাঁচ-ছদিন বুঝি ক্ষৌরকর্ম করেননি। হাতে একটা মোটা লাঠি।
ঘরের মধ্যে আমরা সকলেই নির্বাক। কেবল কিরীটী যেন অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে হরবিলাসের দিকে তাকিয়ে। আচমকা যেন ঘরের সমস্ত আবহাওয়াটা থমথমে হয়ে উঠেছে।
অতঃপর ঘরের মধ্যে উপস্থিত নির্বাক সকলের মুখের দিকে নিঃশব্দে বারেকের জন্য নিজের দৃষ্টিটা বুলিয়ে নিয়ে শতদলের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু যেন কর্কশ কণ্ঠেই তাকে সম্বোধন করে হঠাৎ হরবিলাস বলে উঠলেন, তোমার ঐ অবিনাশকে সাবধান করে দিও, শতদলবাবু!
কেন, অবিনাশ আবার তোমার কী করল শুনি? প্রশ্নটা করলে হিরন্ময়ী দেবী তাঁর স্বামীকে। এবং চেয়ে দেখি পূর্ববৎ তিনি আবার তাঁর বুননকার্যে মনোনিবেশ করেছেন।
ক্ষিপ্রগতিতে হাত দুটো বুনন করে চলেছে।
কি করল মানে? হরবিলাসের কণ্ঠস্বরে বেশ একটা সস্পষ্ট বিরক্তি his every movements is suspicious! তোমার দাদার এ বাড়ি তো নয়, যেন একটা কবরখানা, আর ঐ বেটা কখন আচমকা কোন পথে যে এসে সামনে হঠাৎ হাজির হয়! রোজ সন্ধ্যার পরে একা একা এ বাড়ির পিছনে ঐ ভাঙা গোল-ঘরটায় অন্ধকারে ও কি করে বল তো? দেখ শতদলবাবু I am definite he is after something! নিশ্চয় ওর
হরবিলাসের মুখের কথাটা শেষ হল না, হঠাৎ একটা ভারী কোন বস্তু পতনের দুম করে একটা শব্দ ও সেই সঙ্গে রাত্রির স্তব্দতাকে দীৰ্ণবিদীর্ণ করে একটা কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ যেন খানখান হয়ে চারিদিক সচকিত করে তুলল।
০৮. একটা ভারী বস্তু পতনের শব্দ
অতর্কিত সেই কোন একটা ভারী বস্তু পতনের ও ঠিক সেই সঙ্গে সঙ্গে কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দটা ঘরের মধ্যে আমাদের সকলকেই সচকিত করে দিয়ে গেল। কথা বললে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে প্রথমে আমাদের মধ্যে কিরীটীই, কাঁচের কোন জিনিস ভাঙার শব্দ!
তাই তো, শব্দটা উপরের তলা থেকেই এল বলে মনে হল! যাই দেখে আসি কি ভাঙল শতদল ঘর হতে বের হয়ে যেতেই কিরীটীও তাকে অনুসরণ করে আর আমি করি কিরীটীকে। দোতলায় ওঠবার সিঁড়ির দেওয়ালের গায়ে যে ওয়াল-ল্যাম্পটা টিমটিম করে জ্বলছে, তাতে করে সিঁড়িপথের অন্ধকার দূরীভূত হওয়া তো দূরের কথা, দুপাশের দেওয়ালের চাপে পড়ে আরো যেন ঘন হওয়ায় এবং তার মধ্যে আলোর স্বল্পতায় যেন একটা কেমন ছমছমে ভাবের সৃষ্টি করেছে।
সর্বাগ্রে শতদলবাবু তার পশ্চাতে কিরীটী ও সবার শেষে আমি সিঁড়িপথ অতিক্রম করে উপরের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই একটা সাদা কাপড়ে ঢাকা। ছায়ামূর্তি যেন সোঁ করে আমাদের চোখের সামনে দিয়েই বারান্দার শেষপ্রাতের দরজাপথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ব্যাপারটা এত চকিতে, যেন মনে হল, একটা স্বপ্নের মতই ছায়ামূর্তিটি অন্ধকারে বারান্দার ওদিকে মিলিয়ে গেল।
কিরীটী কিন্তু মুহূর্তের জন্যও সময় নষ্ট করেনি, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে যেন একপ্রকার দৌড়েই বারান্দার শেষপ্রান্তে যেদিকে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়েছে ক্ষণপূর্বে সেই ছায়ামূর্তি, সেই দিকে এগিয়ে গেল।
আমিও কতকটা যেন যন্ত্রচালিতের মতোই কিরীটীকে অনুসরণ করলাম।
দরজাটা পার হলেই একটা অপরিসর ছাদের মতো, তিনদিকে তার এক বুক-সমান প্রায় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। কিরীটী দেখি সেই প্রাচীরের উপর দিয়ে ঝুঁকে অন্ধকারে নিচে তাকিয়ে আছে। আমি ওর পাশে এসে দাঁড়ালাম।
নিচে অন্ধকারে বাগানের মধ্যে গাছপালাগুলো নিঃশব্দে ছায়ার মত গা ঘেষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার ছাদ থেকে নিচের বাগানে চট করে কারো পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভবপর না হলেও, প্রাণের দায়ে যে কেউ ঝাপিয়ে পড়বে না এমন কোন কথা নেই। এবং বেকায়দায় নিচে পড়লে গুরতর জখম বা আহত হওয়াও এমন কিছু আশ্চর্য নয়।
ছায়ামূর্তিটা এই ছাদের দিকেই যখন এসেছে এবং স্পষ্ট আমরা যখন সকলেই চোখে দেখেছি এবং এই ছাদ থেকে অন্য কোথাও যাওয়া যখন সম্ভবপর নয়, তখন একমাত্র নিচের ঐ বাগানে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মগোপন করা ছাড়া ছায়ামূর্তিটা আর অন্য কোথায় যেতে পারে?
সু তোর সঙ্গে টর্চ আছে? কিরীটী হঠাৎ প্রশ্ন করে।
না তো! জবাব দিই।
হঠাৎ এমন সময় আমাদের ঠিক পশ্চাতেই শতদলবাবুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমার ঘরে টর্চ আছে মিঃ রায়, এনে দেব?
না, প্রয়োজন নেই। চলুন দেখা যাক কিসের শব্দ হয়েছিল! বলতে বলতে কিরীটীই আবার বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
