চা? না থাক, ধন্যবাদ।
বাইরের দালানে জুতোর মসমস শব্দ শোনা গেল।
ঘরের মধ্যে উপস্থিত সকলেই বোধ হয় ঘরের বাইরে সেই জুতোর শব্দ শুনতে পেয়েছিল। সীতা নিম্নকণ্ঠে বললে, শতদল-ভাগ্নে এল বোধ হয়—
সীতা কথাগুলো বলবার আগেই কিরীটী চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার দিকে অগ্রসর হয়েছিল এবং খোলা দরজাপথে অদৃশ্য হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই তার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, এই যে শতদলবাবু কোথায় গিয়েছিলেন?
কে! কিরীটীবাবু নাকি? আপনি এখানে, আর আমি যে আপনার খোঁজেই হোটেলে গিয়েছিলাম!
কথা বলতে বলতে দুজনে ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করে।
সীতা, চা সব শেষ, না এক কাপ মিলতে পারে? ঘরে প্রবেশ করেই শতদল সীতাকে লক্ষ্য করে কথাটা বলে।
না, আছে বৈকি, দিচ্ছি, বসো। সীতা জবাব দেয়।
হঠাৎ ঐসময় আমার দৃষ্টিটা হিরন্ময়ী দেবীর উপরে গিয়ে পড়তেই দেখি ইতিমধ্যে তাঁর ক্ষিপ্র বুননরত হস্ত দুটি কখন থেমে গিয়েছে এবং তিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে একবার শতদল ও একবার সীতার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, কিন্তু সীতা বা শতদল কারো সেদিকে দৃষ্টি নেই।
সীতা একটা কাপে ততক্ষণে চা ঢালতে শুরু করেছে।
কিরীটীর মুখের দিকে তাকালাম। পুরাতন একটা সংবাদপত্র টেবিলের উপর পড়েছিল, ইতিমধ্যে কখন একসময় টেবিলের উপর থেকে সংবাদপত্রটা টেনে নিয়ে সে গভীর মনোযোগ সহকারে কী যেন পড়ছে। ঘরের মধ্যে যে আমরা আরও চারটি প্রাণী উপস্থিত আছি, ঐ মুহূর্তে সে সম্পর্কে যেন সম্পূর্ণ অচেতন।
চিনি ও দুধ মিশিয়ে চায়ের কাপটা সীতা শতদলের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললে, এই যে
সবেমাত্র শতদল সীতার প্রসারিত করা হতে চায়ের কাপটি হাতে তুলে নিয়েছে, আচমকা কিরীটী কণ্ঠস্বরে আমি যেন চমকে উঠলাম, আপনি একটু বেশী চিনি খান চায়ে, না মিঃ বোস?
চায়ের কাপটা আর ওষ্ঠের নিকটে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হল না, শতদল বিস্মিত প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে তাকাল কিরীটীর মুখের দিকে এবং বললে, চিনি বেশী খাই চায়ে!
হ্যাঁ, দেখলাম যে সীতা দেবী তিন চামচ চিনি দিলেন চায়ে।
হাতে-ধরা সংবাদপত্রটা ভাঁজ করতে করতে হাস্যোদ্দীপ্ত কণ্ঠে প্রত্যুত্তর দেয় কিরীটী, নিশ্চয় সীতা দেবীর ওটা deliberate mistake নয়, কী বলেন সীতা দেবী?
শতদলের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। কেমন একটা অসহায় অপ্রস্তুত ভাব শতদলের চোখে-মুখে। কিন্তু সীতার মুখে ঠিক যেন একটা বিপরীত ভাবের সুস্পষ্ট আভাস। সমস্ত মুখখানা যে তার লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠেছে, ঐ মুহূর্তটিতে ঘরের স্বল্পলোকেও সেটা দৃষ্টিতে এড়ায় না।
অবশ্য চিনি কেউ কেউ চায়ে একটু বেশীই খান এবং আস্বাদনের ব্যাপারটাও যখন বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন, এ বিষয় নিয়ে কোন কথাই চলে না, কি বলেন সীতা দেবী? কথাটা বলে নিজে সঙ্গে সঙ্গে হেসে ঘরের ঐ মূহর্তের আবহাওয়াটাকে যেন কিরীটী লঘু করে দেবার চেষ্টা করল।
হিরন্ময়ী দেবীর দিকে তাকিয়ে দেখি, অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে তাঁর বুননকার্য চলেছে।
শতদল নিজেকে ততক্ষণে সামলে নিয়েছে এবং ব্যাপারটাও যেন আগাগোড়াই একটা কৌতুক ছাড়া কিছু নয়, এইভাবে চায়ের কাপে একটা দীর্ঘ আরামসূচক চুমুক দিয়ে বললে, সত্যিই কি সীতা তুমি আমার চায়ে তিন চামচ চিনি দিয়েছ নাকি?
কেন? এখনো বুঝতে পারেননি নাকি সেটা? হাসতে হাসতে কিরীটী বলে।
হ্যাঁ, সত্যি বড্ড বেশী মিষ্টি হয়ে গেছে চা-টা সীতা, আর একটু লিকার এর মধ্যে ঢেলে দাও
বলতে বলতে শতদল চায়ের কাপটা সীতার দিকে এগিয়ে দিল।
সীতাও টি-পট থেকে আরও খানিকটা লিকার ঢেলে মিল্ক-পট থেকে একটু দুধ ঢেলে চা-টা চামচ দিয়ে নেড়ে দিল।
শুনলাম কাল রাত্রে নাকি আবার এ-বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে, শতদলবাবু! কিরীটী আচমকা প্রশ্নটা করে যেন প্রসঙ্গান্তরে চলে গেল।
হ্যাঁ, সেই জন্যই তো আপনার ওখানে গিয়েছিলাম। এও শুনেছেন বোধ হয়, এবারে সীতার কুকুরটার উপর দিয়েই ফাঁড়াটা আমার গেছে।
শুনলাম। মৃদুকণ্ঠে কিরীটী জবাব দিল, সীতা দেবীর মুখে অবিশ্যি ব্যাপারটা শুনেছি, তাহলেও আপনার মুখ থেকে ব্যাপারটা আর একবার শুনতে চাই, শতদলবাবু।
এবারেও ঘটনাটা অবিশ্যি extremely mysterious রাত তখন প্রায় গোটা বারো কি সাড়ে বারো হবে, সে রাত্রের ঐ ব্যাপারের পর থেকে সত্যি কথা বলতে কি মিঃ রায়, আমি যেন একটু নার্ভাসই হয়ে পড়েছি, রাত্রে ঠিক যেন আর sound sleep হয় না, বিছানায় শুয়েছিলাম বটে তবে ঠিক ঘুমোইনি, একটা তন্দ্রামত ভাব—হঠাৎ সীতার কুকুরের ঘন ঘন ডাকে চমকে উঠে পড়লাম। জামাটা গায়ে চাপিয়ে জুতোটা পায়ে গলিয়ে দরজা খুলে সিঁড়িতে পৌঁছবার আগেই দুড়ুম দুড়ুম দুটো গুলির আওয়াজ পেয়ে থমকে দাঁড়ালাম আর ঠিক সেই সঙ্গে সঙ্গেই যেন বিশ্রী করুণভাবে আর্তনাদ করে উঠলো সীতার কুকুরটা।
আপনি নিচে নেমে এলেন, না? প্রশ্নটা এবার শতদলকে করলাম।
হ্যাঁ, দু-চার মিনিটের জন্য বোধ হয় কেমন একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম, তার পরই তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসি। জবাব দেয় শতদল।
আপনি তখন কোথায় ছিলেন? আচমকা কিরীটী প্রশ্ন করে সীতার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি? আমিও তখন টাইগারের চেচানি শুনে ঘরের বাইরে বের হয়ে এসেছি। জবাব দিল সীতা।
আর আপনি মিসেস ঘোষ?
