তীক্ষ্ণ একটা দৃষ্টি কন্যার গমনপথের দিকে মুহূর্তের জন্য নিক্ষেপ করে হিরণ্ময়ী দেবী আমাদের দিকে আবার ফিরে তাকালেন। ইনভ্যালিড চেয়ারটার হ্যাণ্ডেলের উপরে রক্ষিত দুই হাতের মুষ্টি দুটো মনে হল যেন মুহূর্তের জন্য কঠিন হয়ে আবার শ্লথ হয়ে গেল। এবং এবারে শান্তকণ্ঠে কিরীটীকেই লক্ষ্য করে বললেন, চলুন মিঃ রায়। শতদলের কাছেই বোধ হয় এসেছেন! সে বোধ হয় তো বাড়িতে নেই, ক্ষণপূর্বেই বিরক্তির লেশমাত্রও কণ্ঠস্বরে নেই।
সকলে আবার ভিতরের দিকে অগ্রসর হলাম। অবিনাশ আগে আগে আলো দেখিয়ে চলল। সকলের আগে হিরণ্ময়ী দেবীর চলমান ইনভ্যালিড চেয়ারটার পাশাপাশি হেঁটে চলেছে কিরীটী। পশ্চাতে আমি।
আপনাদের এদিকেই আসছিলাম। পথেই আপনার মেয়ের সঙ্গে দেখা হতে তাঁরই মুখে শুনলাম শতদলবাবু বাড়িতে নেই। কিরীটী এতক্ষণে কথা বললে।
গতরাত্রের ব্যাপার বোধ হয় তাহলে সীতার মুখেই সব শুনেছেন মিঃ রায়?
হ্যাঁ, শুনলাম। মৃদুস্বরে জবাব দেয় কিরীটী।
এর পর আর এ-বাড়িতে বাস করা খুব বিবেচনার কাজ হবে না—আপনি কি বলেন কিরীটীবাবু?
খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন নিশ্চয়ই?
কি বলছেন আপনি মিঃ রায়! এই সেদিন রাত্রে শতদলের ঘরে কে বন্দুক ছুঁড়ল এবং শতদলের মুখেই কালকের রাত্রের ঘটনার পর আজ সকালে শুনলাম ইতিপূর্বেও নাকি তার উপরে আক্রমণ হয়েছিল—
সে তো তাঁর জীবনের ওপরে attempt হয়েছিল! জবাব দিলাম আমি।
কিন্তু কাল রাত্রের ঘটনাটা? সীতার কুকুরটাকে গুলি করেছে! এক বাড়িতে যখন আছি, ওর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘাড়েও বা বিপদ আসতে কতক্ষণ? আমিও ওঁকে আজ স্পষ্টই বলে দিয়েছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ-বাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাব। সুখের চাইতে স্বোয়াস্তি ভালো—কি বলেন মিঃ রায়!
তা তো বটেই। কিরীটী জবাব দেয় মৃদুকণ্ঠে।
আমরা সকলে এসে হরবিলাসবাবুর ঘরেই ঢুকলাম। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতেই নজরে পড়ল হিরণ্ময়ী দেবীর পূর্বেকার ঘরের মত এ ঘরখানির মধ্যেও রুচিসম্মত পরিচ্ছন্নতা। দুদিনের মধ্যেই ঘরখানি তিনি সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিয়েছেন, তবে এ ঘরেও লক্ষ্য করলাম জানালাগুলো প্রায় সবই ভিতর হতে বন্ধ। একটা বদ্ধ বায়ু যেন থমথম করছে।
বসুন, মিঃ রায়। বসুন সুব্রতবাবু।
হিরণ্ময়ী দেবীর আহ্বানে আমরা দুজনে দুখানা খালি চেয়ার টেনে নিয়ে উপবেশন করলম।
ঘরের সিলিং থেকে একটা প্রকাণ্ড গোলাকৃতি সাদা ড়ুমের মধ্যে চারটে মোমবাতি জ্বলছে। এবং তাতেই ঘরটা বেশ পরিষ্কার ভাবেই যেন আলোকিত হয়ে উঠেছে।
ঘরে প্রবেশ করতেই দেওয়ালে টাঙানো কয়েকখানা চিত্র দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। তার মধ্যে গোটা দুই ল্যান্ডস্কেপ এবং বাকি দুটো অল্পবয়সী দুই নারীর অয়েল-পেন্টিং।
দুটি নারী-প্রতিকৃতি একটু নজর দিয়ে দেখলেই মনে হবে দুটি যেন যমজ বোন। মুখের চেহারাও হুবহু, বলতে গেলে প্রায় একই, এমন কি তাকাবার ভঙ্গিটা পর্যন্ত যেন এক। কিরীটীকে কথাটা বলব ভেবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি একদৃষ্টে ঐ ছবি দুখোনার দিকেই তাকিয়ে আছে। ছবি দুটো তাহলে কিরীটীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি!
ট্রেতে করে টি-পট ও অন্যান্য চায়ের সরঞ্জাম হাতে এমন সময় সীতা এসে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করল।
ঘরের মধ্যস্থিত টেবিলের ওপরে চায়ের সরঞ্জাম রেখে সীতা কাপে কাপে চা ঢালতে লাগল।
সহসা কিরীটী হিরণ্ময়ী দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ঐ দেওয়ালের অয়েলপেনন্টিং দুটো কার মিসেস ঘোষ?
কিরীটীর প্রশ্নে যেন চমকে তাকালেন হিরণ্ময়ী দেবী দেওয়ালের গায়ে টাঙানো ছবি দুটোর দিকে।
দেখলে মনে হয় যেন একই জনের দুটি প্রতিকৃতি! কিরীটী আবার মন্তব্য করে।
জানি না ও কার ছবি! মৃদুকণ্ঠে হিরণ্ময়ী দেবী জবাব দিলেন। শতদলবাবুর মা তো আপনার ভাইঝি, তাই না?
কিরীটীর এবারকার প্রশ্নে কিরীটীর মুখের দিকে দৃষ্টিপাত না করেই ইতিমধ্যে অর্ধসমাপ্ত যে উলের বুননটা কোলের মধ্যে ছিল সেটা তুলে নিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রহস্তে বুনতে বুনতে মৃদুকণ্ঠে জবাব দিলেন হিরণ্ময়ী দেবী, হ্যাঁ।
তাঁকে, মানে শতদলবাবুর মাকে আপনি দেখেননি?
খুব ছোট যখন তার তিন বছর বয়স হবে সেই সময় তাকে দেখি, তার পর আর দেখিনি। তার বিবাহের সময়ও আসতে পারিনি—পরে আর দেখাসাক্ষাৎই হয়নি। শতদলের যখন বছর তিনেক বয়স তখনি তো সে মারা যায়। কথাগুলো যেন একটানা সুরে কতকটা বলে গেলেন হিরণ্ময়ী দেবী।
আপনার ভায়েরও ঐ একটিমাত্র মেয়েই ছিলেন, তাই না?
না, দাদার দুই মেয়ে ছিল। বনলতা আর সোমলতা। সোমলতা বনলতার ৪৫ বছরের ছোট, তাকে আমি কোনদিনও দেখিনি
তিনি, মানে বনলতা দেবী চৌধুরী মশায়ের ছোট মেয়ে বেঁচে আছেন কি?
না। সহসা হিরণ্ময়ী দেবীর কণ্ঠস্বরটা যেন রুক্ষ শোনাল। হিরণ্ময়ী দেবীর আকস্মিক কর্কশ কণ্ঠে আমি চমকে ওঁর দিকে না তাকিয়ে পারলাম না।
পূর্বের মতই হিরন্ময়ী দেবীর দৃষ্টি তাঁর হাতের বুননের উপরে নিবদ্ধ এবং তিনি ক্ষিপ্রহস্তে বুননকার্যে রত।
কিরীটীর মুখের দিকে তাকালাম কিন্তু কিছু বোঝা গেল না। সে-মুখে রাগ দ্বেষ বা বিরক্তি কোন কিছুর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। শান্ত ও নির্বিকার। চায়ের কাপটা শেষ হয়ে গিয়েছিল, নিঃশেষিত চায়ের কাপটা সামনের টেবিলের ওপরে নামিয়ে রাখতেই সীতা এগিয়ে এসে কিরীটীকে প্রশ্ন করল, আর চা দেব মিঃ রায়?
